kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

উদ্যমী বাংলাদেশ

আলমপুরের জোবাইদা

আলমপুরের জোবাইদাকে এখন ক্ষেতলালের লোকও চেনে। শুধু নিজের নয়, আশপাশের নারীদেরও কর্মসংস্থানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আলমগীর চৌধুরী বলছেন পুরো গল্প

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আলমপুরের জোবাইদা

বাবার খুব আদরের মেয়ে ছিলেন। আর দশজন নারীর মতোই স্বপ্ন দেখতেন স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার গড়ার। মাধ্যমিক পার হওয়ার পরই ১৯৮৬ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন; কিন্তু স্বামীর বাড়ি গিয়ে মনে হলো কারাগারে ঢুকে পড়েছেন। না আছে মর্যাদা, না স্বাধীনতা। তবে এর মধ্যেও পড়াশোনাটা চালিয়ে গেলেন। দুটি সন্তানও হলো। বিএ পাস করলেন। সন্তানদের নিয়ে ১৯৯৬ সালে চলে এলেন বাবার বাড়ি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর গ্রামে।

 

ফিরে আসার পর

অসহায় নারীদের পাশে থেকে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে চাইলেন। ২০০২ সালে আলমপুরের আশপাশের আরো কয়েক গ্রামের দরিদ্র গৃহবধূদের নিয়ে একটি সমিতি গড়ে তোলেন। নাম জাগরণী মহিলা সমবায় সমিতি। পাঁচটি উদ্দেশ্য ছিল—বৃদ্ধ অসহায়দের সেবা, নির্যাতিত নারীর কর্মসংস্থান, কন্যাদায়গ্রস্ত মা-বাবাকে কন্যা সম্প্রদানে সহায়তাদান, গর্ভবতী মা ও শিশুর যত্ন এবং অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহযোগিতা প্রদান। ৫০ জন নারী সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল জাগরণীর। সদস্যরা প্রত্যেকে মাসে ১০০ করে টাকা দিত। সদস্যদের কেউ অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে সমিতি কোনো শর্ত ছাড়াই সহযোগিতা দিত। সমিতির নিবন্ধন হয় উপজেলা সমবায় অফিসে। গৃহবধূদের নিয়ে জোবাইদা নকশিকাঁথা, পাপোস ইত্যাদি তৈরি করতে থাকেন। উপজেলাভিত্তিক উন্নয়ন মেলায় স্টল দিয়ে জোবাইদা জাগরণীর পণ্য প্রদর্শন করতেন।

 

জোবাইদার সন্তানেরা

দুই সন্তানের মধ্যে জাকির হাসান বড়। তিনি ঢাকার লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিতে ব্যারিস্টারি পড়ছেন এখন। মেয়ে জাকিয়া সুলতানা বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর হয়েছেন। জোবাইদা দন্ত চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তিনি বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ভাশিলা চৌমুহনীতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলেছেন। বাবার বাড়িতে আর আশ্রিতা নন এখন। নিজের বাড়ি গড়েছেন পাশেই।

 

সমিতির সদস্যরা

সমিতির সহযোগিতা নিয়ে কেউ পালন করছেন হাঁস-মুরগি, কেউবা গরু-ছাগল। কেউ আবার প্রশিক্ষণ নিয়ে নকশিকাঁথা ও দর্জিগিরি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন। জোবাইদা ‘স্বদেশপ্রীতি’ নামে আলাদা একটি নকশিকাঁথা সেলাই প্রকল্প চালু করেছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে এর সদস্য সংগ্রহ করেন। তাঁদের দিয়েই সুন্দর সব নকশিকাঁথা বুনছেন। এগুলো ছয় থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হয়। একটি কাঁথা সেলাই করতে তিন-চারজনের একটি দলের সময় লাগে দুই থেকে আড়াই মাস।

কাঁথা সেলাই থেকে সংসারে সচ্ছলতা আসায় খুব খুশি আলমপুর গ্রামের গৃহবধূ মর্জিনা বেগম। বললেন, ‘আমার সংসারে খুব অভাব ছিল। এখন কাঁথা সেলাই করে কিছু রোজগার হয়। অভাব কিছু মিটে। সংসারে আমরা গুরুত্বও কিছু বেড়েছে।’ মর্জিনা ছাড়াও চম্পা বেগম, বুলি বেগম, দুলালী রাণী, রিতা রাণীসহ প্রায় এক শ নারী কর্মসংস্থানের উপায় খুঁজে পেয়েছেন জোবাইদার মারফত। চম্পা বলছিলেন, ‘সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে নকশিকাঁথা সেলাই করি। তিন-চারজন একসঙ্গে বসে করলে অনেক গল্প করি, আনন্দই লাগে। আবার কিছু টাকা যখন পাই, তখন তো অনেক খুশি লাগে।’

জোবাইদা বেগম বলেন, ‘গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় নারীদের জন্যই ভেবেছিলাম বেশি। নিজের জন্যও প্রয়োজন ছিল। স্বামীর সংসার ছেড়ে আসার পর আর পিছু ফেরার উপায় ছিল না। তাই সব শক্তি নিয়ে জাগরণী আর স্বদেশপ্রীতিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। আজ সফল বলতে পারেন। তবে সরকারি সহযোগিতা মিললে আরো বেশি এগোতে পারব। প্রতিদিনই বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারীরা পরামর্শ নিতে আসেন। আমি সাধ্যমতো তাঁদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা