kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

ফণীর সঙ্গে যুদ্ধ

অনেকবারই ঝড় দেখেছেন। ঝড়ের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ পুরনো। বাঁধের কাছাকাছি বাড়ি। আফদাবউদ্দিন ঝড়ের আগে আগে লোকজন জড়ো করেন বাঁধের ওপর। লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন যেন বাঁধ না ভেঙে যায়। দিনকয় আগে ফণীর সঙ্গেও লড়েছেন। লিখেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফণীর সঙ্গে যুদ্ধ

৬২ বছর বয়স আফদাবউদ্দিন শেখের। নদীর পারে, বাঁধের পাশেই বাড়ি। আগে বাড়ি ছিল নদীর পূর্বপারে। ১৯৬৭ সালে পার ধরে মাটির স্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে বাড়িটি উত্তর পাশে সরিয়ে আনতে হয়। নদীটির নাম কপোতাক্ষ আর বাড়িটি কয়রা উপজেলা সদরের ঘাটাখালীতে। বাড়িটি তাঁকে কয়েকবারই সরাতে হয়েছে। কারণ বাঁধ ভেঙেছে, তারপর আবার নতুনভাবে বাঁধ তৈরি হয়েছে আর বাড়িও সরাতে হয়েছে।

আফদাবউদ্দিন প্রতিদিনই দেখেন মাটির বাঁধে কেমন করে কপোতাক্ষের পানি আছড়ে পড়ে। আরো দেখেন লোভী চিংড়িচাষি কেমন করে বাঁধ কাটেন, বাঁধ ফুটো করেন। ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বাঁধে ভাঙন ধরে। ১৯৮৮ সাল থেকে কপোতাক্ষের ভাঙন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আর বাঁধ রক্ষা করাও এখানকার মানুষের নিয়মিত কাজ। তিনি এ পর্যন্ত ৩৫ বার বাঁধ রক্ষার কাজে অংশ নিয়েছেন। কিভাবে ভেঙে যাওয়া বাঁধ ঠেকিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে হবে, এলাকা বাঁচাতে হবে, তা তাঁর আয়ত্তে।

 

জড়ো করেন অনেককে

বাঁধে ভাঙন দেখা দিলেই তিনি এগিয়ে আসেন। এলাকাবাসীকে জড়ো করেন। অবস্থান নেন নদীর পারে গিয়ে। বিপন্ন বাঁধ রক্ষার কাজে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যদিও বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো), কিন্তু অফিস প্রয়োজনের দিনগুলোতেও বাধা থাকে নিয়ম-নীতিতে। নদীতে স্রোত বেশি হলে, স্রোতের ঢেউ নদীর পারে আছড়ে পড়লে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙন তখনই ঠেকাতে না পারলে ভাঙন বড় হয়। একেবারে ভেঙে গেলে পানিতে জনপদ তলিয়ে যায়, বিপন্ন হয় মানুষের জীবন-জীবিকা।

পাউবো অফিসের অনেক হ্যাপা। কাজের সময়ই ফাইলবন্দি নিয়মগুলো হা হা করে ছুটে আসে। তারপর টাকা বরাদ্দ দেওয়া, ঠিকাদার নিয়োগ ইত্যাদি করতে করতে অনেক সময় লেগে যায়। ঝড়-বাদল তো আর এসবের অপেক্ষায় থাকে না। এ কারণে আফদাবউদ্দিনের মতো মানুষকে এগিয়ে আসতে হয় বাঁধ রক্ষায়।

 

ফণী এলো বলে

বাঁধের মাটিতে ইঁদুরের গর্ত হলে বিপদের গন্ধ পান। আতঙ্কিত হন আবার বাঁধে চিড় ধরবে বলে। এ কারণে ঠিকাদার নিয়োগের তোয়াক্কা না করেই নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে পড়েন।

ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে কয়রা উপজেলা সদরের গোবরা-ঘাটাখালী-হরিণখোলা এলাকার বাঁধের ভাঙন তীব্র হয়। এখানে ভাঙনে বাঁধের বেশ খানিকটা আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝড়ে পড়লে এই ভাঙন আরো তীব্র হবে বলেই আশঙ্কা হয়েছিল। এ কারণে গত শুক্রবার (৩ মে, ফণী আঘাত হানার দিন) তাঁরা বাঁধের ওপর নজর রেখেছেন। ওই রাতে জোয়ারের পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন বৃষ্টি ও বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে, ঘরে বসে থাকতে পারেননি আফদাবউদ্দিন। মাইকে লোক জড়ো করেছেন। এলাকার শতাধিক মানুষ ওই রাতেই বাঁধ রক্ষায় কাজ করেছেন। তিনি বললেন, ‘চারটি পয়েন্ট (জায়গা) ছিল বিপজ্জনক। প্রতিটি পয়েন্টে ২০ জন করে মোট ৮০ জন রাত ১টা পর্যন্ত বাঁধ ঠেকানোর কাজ করে। ভাটা এলে তবে সবাই ঘরে ফেরে। তবু সকালে নদীতীরে গিয়ে দেখা যায় সব কিছু ভেসে গেছে। তখন পাঁচ শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে বাঁধ রক্ষায় নেমে পড়ে। ত্রিপল, প্লাস্টিকের বস্তায় মাটি-বালু ভরে, বাঁশ ও অন্যান্য গাছ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে ভাঙন আটকানোর চেষ্টা করে।’

আফদাবউদ্দিন আরো বলেন, ‘এই বাঁধটি ১৩ ও ১৪/২ নম্বর পোল্ডারভুক্ত। এর ৭ কিলোমিটার থেকে সাড়ে ৯ কিলোমিটার পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধের পূর্বপারে ২০০ পরিবার ছিল। ভাঙনের কবলে পড়ে দেড় শ পরিবার এরই মধ্যে ভিটেছাড়া হয়েছে। ৫০টি পরিবার এখনো কোনোভাবে টিকে আছে। সেই পরিবারের মানুষগুলো এবং আশপাশের এলাকার মানুষগুলো বাঁধ রক্ষায় তাই নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করে। শুক্রবার রাত, শনিবার এবং রবিবারও (৩, ৪ ও ৫ মে) মানুষ এখানকার বাঁধ রক্ষায় কাজ করেছে।’

আফদাবউদ্দিন বলতে থাকেন, ‘আগে বাঁধের পশ্চিমে ১১০০ ফুট দূরে নদী ছিল, এখন নদী ও বাঁধের মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই। তার ওপর কপোতাক্ষের পশ্চিম পারে একটি চর দেখা দিয়েছে। যে কারণে নদীর স্রোত পুরোপুরি পূর্বদিকে আছড়ে পড়ছে।’

আফদাবউদ্দিন শেখ অকৃতদার। পরিবারের বন্ধনে জড়াননি। জড়িয়ে আছেন এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে। যুবক-তরুণেরা তাঁর কাছে বাঁধ সম্পর্কিত যেকোনো তথ্যের জন্য যায়। এলাকার যুবক ইমতিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘বাঁধ রক্ষার কাজ মানেই আফদাব চাচা। এখানকার মাটি নোনা, মাটিরও অভাব, যা-ও পাওয়া যায় তা-ও ঝুরঝুরে, জমাট বাঁধে না, বাঁধ টেকানো খুবই কষ্টের। আফদাব চাচার মতো মানুষ আছে বলেই আমরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করার করার সাহস পাই।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা