kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

নতুন খবর দিলেন সাজিদ

এর আগে কাগজ দিয়ে পরিবেশবান্ধব কাপ-প্লেট বানিয়েছেন। বিদেশে রপ্তানিও করেছেন। এবার সুপারিগাছের খোল দিয়ে থালা-বাটি বানিয়ে আবার অবাক করলেন কাজী সাজিদুর রহমান। তাঁর সঙ্গে কথা বলে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নতুন খবর দিলেন সাজিদ

ধরা যাক, আপনি একটি নামি রেস্টুরেন্টে গিয়েছেন। স্যুপের ফরমাশ দিয়ে অপেক্ষা করছেন। কিছু পরে ধোঁয়া ওঠা স্যুপ আপনাকে যে পাত্রে পরিবেশন করা হলো তা সিরামিক বা কাচের তৈরি নয়, সুপারির খোলে তৈরি। আপনি অবাক হবেন নির্ঘাত। শৈশব গাঁয়ে কাটলে ফিরে যাবেন সেসব দিনে; যেদিন সুপারিগাছের খোল নিয়ে খেলার সাথিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হতো। সব গল্প আপনার কাছে ফিরে আসবে। ওই খোল দিয়েই তৈরি হচ্ছে থালা, বাটি, ট্রে ইত্যাদি। তাক লাগিয়ে দেওয়া কাজটি করেছেন কাজী সাজিদুর রহমান। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি। এরই মধ্যে দেশে অনুষ্ঠিত এসএমই মেলা, শিল্প মেলা, ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এক্সপোসহ বেশ কয়েকটি মেলায় এগুলো প্রদর্শন করেছেন। এখন দেশের বাইরেও রপ্তানি করার কথা ভাবছেন।

 

দুই বছর আগে শুরু

‘তখন পেপার কাপ নিয়ে কাজ করছিলাম। দুই বছর আগের কথা। অনলাইনে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়েই একদিন দেখলাম আখের ছোবড়া ও সুপারির খোল দিয়ে দারুণ সব থালাবাটি বানানো যায়। এরপর বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করলাম।’ বলছিলেন কাজী সাজিদুর রহমান। এসব পণ্য কিভাবে তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য ২০১৬ সালের শেষের দিকে চীনে গেলেন সাজিদ। সেখানে কয়েকটা কারখানায় ঘুরে ঘুরে দেখলেন। লোকজনের সঙ্গে বিশদ আলাপও করলেন; কিন্তু আখের ছোবড়া থেকে তৈজসপত্র বানানোর যন্ত্র খুবই ব্যয়বহুল। উৎপাদন প্রক্রিয়াও বেশ জটিল। সে তুলনায় সুপারিগাছের খোল দিয়ে পণ্য বানানোর মেশিনের দাম সাধ্যের মধ্যে। ভাবলেন, তাহলে সুপারির খোল দিয়েই শুরু করা যাক। লুৎফর রহমান নামে সাজিদের পরিচিত এক বড় ভাই থাকতেন গাজীপুরে। সাজিদ তাঁকে বললেন, ‘ভাই, আপনার গ্রামে তো সুপারিগাছ আছে। আমার সুপারিগাছের কিছু খোল লাগবে।’

—কী করবেন?

—থালা, বাটি বানাব।

শুনে অবাক বনেছিলেন লুৎফর। তবে একদিন ঠিকই গোটা বিশেক সুপারির খোল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সাজিদের তেজগাঁওয়ের অফিসে। সাজিদ প্রথমে সেই খোলগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেন। শুকানোর পর খোলগুলো দিয়ে কাগজের কাপ বানানোর মেশিনেই প্লেট বানানোর চেষ্টা করলেন। সাজিদ বললেন, ‘কাগজের কাপ তৈরির মেশিনে সুপারিগাছের খোল দিয়ে তৈরি প্লেটগুলো মসৃণ হচ্ছিল না। বুঝলাম, বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে আমাকে নতুন মেশিন আমদানি করতে হবে; কিন্তু সুপারিগাছের খোল দিয়ে তৈরি প্লেটগুলো ফুড গ্রেড (দূষণমুক্ত) করার প্রক্রিয়া বেশ জটিল। তা ছাড়া ঠিকমতো কাঁচামাল পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও সংশয়ে ছিলাম।’ শেষ পর্যন্ত চারটি মেশিন আমদানি করলেন। ঢাকায় কাঁচামাল পাওয়া মুশকিল। তাই নিজের জেলা খুলনা ও পাশের জেলা বাগেরহাটকেই বেছে নিলেন। প্রথমে স্থানীয় কিছু লোককে ঠিক করলেন, যারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুপারিগাছের খোল সংগ্রহ করবে। তারপর সেখান থেকে বাছাইকৃত খোলগুলো কিনে নেন সাজিদ। বলছিলেন, ‘শুরুতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যখন আমরা বলছি, সুপারিগাছের খোল কিনব, লোকজন বিশ্বাসই করতে চায়নি। বলেছে, এটা আবার বিক্রি হয় নাকি?’

২০১৮ সালের শেষের দিকে পরীক্ষামূলকভাবেই উৎপাদন শুরু করলেন সাজিদ। শুরুর দিকে দিনে এক হাজার ৫০০ পিসের মতো প্লেট-বাটি উৎপাদন হতো। এখন সেটা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে। এখন কয়েক ধরনের প্লেট, বাটি, ট্রে, পিরিচ উৎপাদন করছেন। প্লেটগুলো আকারে ৬ ইঞ্চি, ৭ ইঞ্চি এবং ১০ ইঞ্চি ব্যাসের হয়ে থাকে।

সাজিদ বলেন, ‘সুপারিগাছের খোলগুলো প্রথমে ঠাণ্ডা পানিতে ধোয়া হয়। তারপর আবার গরম পানিতে ভালোমতো ধুয়ে পরিষ্কার করি। শুকানোর পর ফুডগ্রেড লিকুইড দিয়ে এটাকে স্বাস্থ্যসম্মত করা হয়। তারপর খোলগুলোকে মেশিনে দিই। একেকটি মেশিন থেকে মিনিটে পাঁচ-সাতটি করে প্লেট বা বাটি উৎপাদন করা যায়।’

 

এবারই প্রথম

চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসএমই মেলায় প্রথমবারের মতো এসব পণ্য প্রদর্শিত হয়। সেখানে বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলামসহ অনেকে সাজিদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে পণ্য তৈরি করার দারুণ এক উদাহরণ।’ গেল মাসে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় অনুষ্ঠিত ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এক্সপোতেও সুপারিগাছের খোলে তৈরি সাজিদের থালা-বাটি প্রশংসা পেয়েছে। এখানে প্রায় ৬০ হাজার পিসের মতো সুপারিগাছের খোলে তৈরি পণ্য বিক্রি করেছিলেন সাজিদ। থালার দাম ছিল ৬ থেকে ১০ টাকা, ট্রে ১২ টাকা, বাটি ছয় টাকা।

এরই মধ্যে কয়েকটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কম্পানি এই প্লেটগুলো ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে। সাজিদের এক বন্ধু কিছুদিন আগে আমেরিকা গিয়েছিলেন। সঙ্গে করে খোলের তৈরি কিছু প্লেটও নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেসব দেখে আমেরিকার একটি চেইন শপ সাজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সব কিছু ঠিক থাকলে হয়তো মাস দুয়েকের মধ্যে আমেরিকায় সুপারির খোলে তৈরি পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন সাজিদ।

সাজিদ বললেন, ‘সুপারিগাছের খোলের যে আর্থিক মূল্য আছে, তা আগে কেউ ভাবেওনি। এখন এটা আয়ের একটা বাড়তি উৎস। বিদেশে পরিবেশবান্ধব এই থালা-বাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমার লক্ষ্য, উদ্যোক্তা তৈরি করা। প্রাথমিকভাবে ২০টি জেলায় কারখানা গড়তে চাই। পণ্যগুলো ব্যাপক হারে বিদেশে রপ্তানি করতে চাই। আরেকটি বিষয়, আমাদের বিজ্ঞানীরা দ্রুত বর্ধনশীল ধান উৎপাদন করেছেন। সুপারিগাছের ক্ষেত্রেও সে রকম কিছু করা যায় কি না সে ব্যাপারেও আলাপ করছি।’

 

ছবি : লুৎফর রহমান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা