kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

বাঙালির বিশ্বদর্শন

সমরখন্দ

সৈয়দ আখতারুজ্জামান   

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমরখন্দ

আমাদের গাড়ি ছুটছে বুখারা থেকে সমরখন্দের দিকে। আমাদের তরুণ গাইড আবদুল্লাহ। সামনের সিটে বসা। বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। সঙ্গে আছে বন্ধু স্বনন ও রেবা, ছোট ভাইয়ের বন্ধু কবি পিয়াস মজিদ, বেঙ্গল বইয়ের ফারুকী ভাই আর অভিজ্ঞ বাদল ভাই। আমাদের পাঁচজনের পাঁচমিশালি প্রশ্নে আবদুল্লাহ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। না হয়ে উপায়ও ছিল না। যেকোনো প্রশ্ন করলেই তার উত্তর দিতে চলে যেতে হয় হাজার বছর আগে। তার ওপর স্বননের প্রশ্নগুলো ছিল বেকায়দার—যেমন বলখের যুদ্ধ ঠিক কোন জায়গাটায় হয়েছিল? আমরা তখনো বেশ দূরেই ছিলাম সমরখন্দ থেকে।

ভাবছিলাম বসে বসে। ভালো লাগছিল ভাবতে—এই রাস্তা দিয়ে একসময় ছুটতেন চেঙ্গিস খান, তৈমুর লঙের মতো মানুষ। সূর্য ডুবছে। আশপাশে জ্বলে উঠছে সন্ধ্যাবাতি। গাড়ির জানালায় সরে যাচ্ছে বাজার, রুটি-সবজির দোকান, বাহারি মসজিদ, আকাশচুম্বী মিনার, ধু ধু মাঠ, শস্যক্ষেত, তুলাক্ষেত, রাখাল বালক, মোষের পাল, বাদামি ঘোড়া বা জনমানবহীন প্রান্তর। দেখতে দেখতে একসময় পৌঁছে গেলাম সমরখন্দ।

ততক্ষণে রাত গভীর হয়ে নেমেছে। ভেজা রাস্তা দেখে বুঝলাম বৃষ্টি হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। আলোয় চকচক করছে পথঘাট। সমরখন্দ যে এতটাই জমকালো শহর ভাবনায়ও ছিল না। এক সঙ্গী বলল, ডিনারে যাওয়ার আগে চলো একবার রেগিস্তান স্কয়ারে ঢু মেরে আসি। প্রাচীন সমরখন্দের প্রাণকেন্দ্র বলা যায় রেগিস্তানকে। বিশাল চত্বর; কিন্তু কী কারণে আলো জ্বলছিল না রেগিস্তানে। অন্ধকারে ডুবেছিল হাজার বছরের ইতিহাস। শুধু আকাশছোঁয়া মিনারগুলো বীরদর্পে দাঁড়িয়েছিল। এই রেগিস্তান বানানো হয়েছে ২০০ বছর ধরে। যাহোক আবদুল্লাহ আমাদের এক রুশ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল। আমরা দোতলায় গিয়ে বসলাম। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। আবদুল্লাহ আমাদের শোনাচ্ছিল, সিজিস্তানের রাজার সঙ্গে এক যুদ্ধে তৈমুর কী করে আহত হলেন। সেখান থেকে তাঁর নাম হলো ল্যাংড়া তৈমুর। তারপর তিনি হয়ে উঠলেন তৈমুর লং। বেশ দীর্ঘ যাত্রা। আবদুল্লাহ আবার না ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেই ভয়ে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলাম। নইলে পথ চিনে হোটেলে ফেরার সুযোগ আমাদের হবে না। তবে ফেরার পথে রেবার আবদারেই আবার আমরা রেগিস্তান গেলাম। এবার দেখি আলোয় ভাসছে পুরো চত্বর। উফ! সে কী দৃশ্য! উলুগ বেগ মাদরাসা ও শেরদোর মাদরাসার দেয়ালগুলো দেখাচ্ছে সোনায় মোড়ানো। পরদিন সকালেও প্রথমেই গিয়েছিলাম ওই রেগিস্তানে। ভোরের আলোয় আবার দেখার জন্য। এবার সব মসজিদের ভেতরে ঢুকে ঘুরে দেখলাম। গাইড কত কিছু যে বলল! সে ইতিহাস এখানে বলার আর অবসর নেই।

সমরখন্দে আছে চমকের পর চমক। এক দিনে এ শহরের কিছুই দেখে শেষ করা যায় না। আমরা ছুটলাম ইমাম বুখারি (র.)-এর সমাধি দেখতে। রাস্তার পাশে গাড়ি থেমে গেল। তারপর প্রধান ফটক থেকে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদের ফটক পার হয়ে বিশাল খোলা চত্বর। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে কেউ মোনাজাত করেন, কেউ কোরআন পড়েন, কেউ দোয়া করেন। লোকে বলে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ৭০ হাজার হাদিস মুখস্ত করেছিলেন, যা পরে পরিণত বয়সে তিন লাখে পৌঁছে যায়। আর মোট সংগ্রহ করেছিলেন ছয় লাখ হাদিস। সেখান থেকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন মাত্র সাত হাজার ২৭৫টি হাদিস, যা আমরা এখন সহিহ বুখারি শরিফে পাই। এখানে কোরআন শরিফের একটি দারুণ সংগ্রহশালাও আছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এগুলো উপহার দিয়েছেন। এরপর চললাম তৈমুর লঙের সমাধি দেখতে। একই সঙ্গে বিখ্যাত ও কুখ্যাত, নির্মম আবার দেশপ্রেমিক, ধূর্ত আবার চৌকস—সব মিলে দারুণ এক যোদ্ধার নাম তৈমুর। সারা পৃথিবী জড়ো করেছিলেন সমরখন্দে। সারা জীবন আগলে রেখেছেন এই শহরকে। আর সে জন্যই দুনিয়ার সব বিখ্যাত শহর যখন জরাজীর্ণ, তখনো সমরখন্দ ছিল জমকালো। 

তৈমুর লঙের সমাধির নাম গোর-এ-আমির। এক নীল গম্বুজওয়ালা ভবনের ভেতরে। দুই পাশে দুই উঁচু মিনার। সবই অসাধারণ কারুকার্যখচিত। সমাধি ভবনের প্রবেশপথের সামনে তৈমুর লঙের এক সুবিশাল তৈলচিত্র। তলোয়ার হাতে রাজসিংহাসনে বসে আছেন রাজাধিপতি। তারপর ভেতরে ঢুকে মিলল অনেক কবর। গুনে দেখলাম ৯টি। কোনোটা শ্বেতপাথরের, কোনোটা কালো মর্মর পাথরের। চোখ খুঁজছে শুধু একটা কবর। কোনটা তৈমুর লঙের! গাইড সহায় হলো—দেখিয়ে দিল, মাঝখানের কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো কবরটাই তৈমুর লঙের কবর। তার ঠিক মাথার কাছে তাঁর প্রিয় শিক্ষক মির সায়ীদ বারাকা শায়িত। এখানে আরো শায়িত আছেন তৈমুরের ছেলে শাহরুখ, মিরান শাহ। আছেন বিখ্যাত দার্শনিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ উলুগ বেগ। গাইড তাড়া দিল। যেতে হবে বাইরে। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। এর মধ্যেই আমাদের ছুটতে হবে তাসখন্দের পথে।

মন্তব্য