kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

এখানে জীবন যেমন

কুমোরপাড়া

ভেলানগর টিআরবি স্ট্যান্ড থেকে বাসে করে পারুলিয়া নামেন রায়হান রাশেদ। তারপর ৩০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে যান কুমোরপাড়ায়। তখন সূর্য হেলে পড়েছিল

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কুমোরপাড়া

ভেতরের রাস্তায় তেমন মানুষ চলাচল নেই। অল্প হাঁটলাম। এক বাড়ির উঠানে সার ধরে অনেক মাটির পাত্র বিছানো। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বলে উঠলেন, ‘কে গো’। দেখলাম এক বয়স্ক লোক। উদোম গা। কোমরে লাল গামছা জড়ানো। কাছে গেলাম। তালপাতায় ছাওয়া দোচালা ঘর। ছয়টি বাঁশের খুঁটির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরে চুলায় মাটির বানানো জিনিসপত্র সাজাচ্ছেন। মানুষটির নাম সুশান্ত পাল। ৬৬ বছর বয়স। জানতে চাইলাম—‘কী করছেন কাকা।’

—‘পইনে (চুলা) জিনিসপত্র দিতেছি। পুড়া দিমু।’

—কিভাবে পুড়বেন?

—পইনের ভেতরে দ্যাখেন দুই হাত গর্ত আছে। গর্তে লাকড়ি দিই। মাটির জিনিসপত্র (রোদে শুকানো) রাখি তার ওপর। সেগুলোর ওপর আবার লাকড়ি। এভাবে চার-পাঁচ ফুট উঁচু একটি টিলা হয়। টিলার চারপাশ গাছের কাঁচা পাতা দিয়ে ঢেকে দিই। তার ওপর দিই খড় (শুকনো ধানগাছ)। সবার শেষে দিই লাল মাটির প্রলেপ। তারপর গর্তে আগুন দিই। তিন ঘণ্টার মতো আগুন জ্বালাই। আগুন নেভানোর ১০-১২ ঘণ্টা পর এগুলো বের করি। তত্ক্ষণে সব ইটের মতো লাল রঙের হয়ে যায়।

 

সেই ছোটবেলা থেকে

সুশান্ত পাল ছেলেবেলা থেকেই কুমোরের কাজ করছেন। বাবার কাছে শিখেছেন। স্কুলে যাননি কখনো। ৫৫ বছর হয়ে গেল। এ দিয়েই সংসার চলে। ছয় মেয়ে, দুই ছেলে তাঁর। চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দুজন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে আর পড়ছে না। তারা বাবাকে সহযোগিতা করে। ছেলেরা অন্য কাজ শিখছে। এসবে আগ্রহ নেই। ‘আমার চৌদ্দগোষ্ঠী এই কাজ করেছে। আমাদের জাতি-পেশা এটা। দাদাকে এই কাজ করতে দেখছি, বাবাকেও দেখছি। তবে আগের মতো কাজ করতে পারি না এখন। শরীর সায় দেয় না। বসে থাকলে আবার অভাব লাগে। অনেক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু রোজগার কম’, বললেন সুশান্ত পাল।

সুশান্ত পাল বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে গেলেন পোয়ানঘরে। পোড়ানোর আগে যে চাকযন্ত্রে জিনিসপত্রের আকৃতি দেওয়া হয়, তা রাখা আছে এ ঘরে। মাটির তৈরি দইয়ের পাতিল, ব্যাংক ইত্যাদি ছড়ানো সেখানে। গোলাকার চাকায় হাত দিলেন সুশান্ত। কিছুক্ষণ চাকা ঘুরালেন। বানিয়ে দেখালেন মাটির ছোট কলস, গ্লাস, ঘটি। তারপর আমরা উঠানে বেরিয়ে এলাম। দোচালা দুটি টিনের ঘরের সম্মুখে বড়সড় উঠান। উঠানজুড়ে শিশুদের খেলার মাটির ছোট কলসি, বালতি, পুতুল, শোবার খাট, বঁটি, পাটা, ঘোড়া, হাতি, দইয়ের পাতিল, কলসি ইত্যাদি রোদে শুকাতে দেওয়া।

সুশান্ত পালের ঘরের বারান্দায় তিনজন নারী কাজ করছেন। তাঁরা তৈরি করছেন দইয়ের ছোট-বড় পাতিল। সুশান্তের স্ত্রী মায়া রানী পাল কুমোরের কাজ করছেন ৩০ বছর হলো। বাবার বাড়িতে টুকটাক করলেও স্বামীর সংসারে পুরোপুরি করছেন। ম্যাট্রিক পাস করা দুই মেয়ে বাবার পিছু পিছু চুলোর দিকে গেলেন। বাবার সঙ্গে হাত লাগালেন। 

 

আরেকটি বাড়িতে

রাস্তার পশ্চিম পাশের বাড়ি যাওয়ার পথে এক কিশোরের দেখা পেলাম। কিশোরের নাম ভবেশ চন্দ্র পাল। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। ঢাকার তাঁতিবাজারে স্বর্ণের দোকানে কাজ করে। সদ্য চুলায় পোড়ানো মাটির তৈজসপত্রের কালো স্তূপ দেখলাম ভবেশদের বাড়ি। ছয় ফুট উঁচু এ স্তূপ। চুলাটি ভবেশের জেঠার। পোড়ামাটির আবরণ সরিয়ে ভবেশ দেখাল লাল রং ধরা বাহারি জিনিসপত্র। কাছাকাছি মাঝবয়সী এক নারীকে (ভবেশের জেঠি) দেখলাম মাটি প্রস্তুত করছেন।  জানালেন, ২৮ বছর ধরে এই কাজ করছেন। স্বামীর সংসারে এসেই শিখেছেন। বড় মেয়ে ঢাকায় আর ছোট মেয়েকে মাধবদীতে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েরা লেখাপড়া শিখেছে। একজন সরকারি চাকরিও করে। ছোট মেয়ের স্বামী ডাক্তার। ছেলেরা পড়ছে। বললেন, ‘এই কাজ করেই ঘর তুলেছি। সন্তানদের পড়াচ্ছি। মাস্টারের খরচ দিচ্ছি। সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ করছি। ছেলেরা এই কাজ করে না। আমার সঙ্গে উল্টো রাগ করে। আমাদের পর বোধ হয় এই কাজ আর আমাদের সন্তানরা করবে না। পাশের বাড়ি দেখিয়ে বললেন—ওদের দুই ছেলে বিদেশ থাকে। এখন কেউ এগুলো করে না।’

ভবেশের জেঠি বললেন, ‘প্রথমে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করি। তারপর টুকরো টুকরো করি। পানি দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখি। মন্থন করে মাটির গুটি মিশিয়ে দিই। গুটি থাকলে পোড়ানোর পর কানা (ছিদ্র) হয়ে যায়।’

 

আশা বলে জমিদার ছিলেন

কুমোরপাড়ায় বসতি কম। এই বসতির বয়স ৩০০ বছর। সেকালে চরসিন্দুর থেকে ছনপাড়া প্র্রায় শত মাইলজুড়ে পালদের বসবাস ছিল বলে জানা যায়। উনিশ শতকে এখানে জমিদার ছিলেন আশা রানী পাল। পাড়ার উত্তরে বড় এক টিলা আছে। দেখতে ছোটখাটো পাহাড়ের মতো। লোকে বলে আশারটেক। আশা রানীর নামেই।

ভবেশের সঙ্গে পথে বের হই। এক লোকের সঙ্গে পরিচয় করে দিল সে। বয়স্ক মানুষ। জীবন পাল নাম। লাঠি ভর করে হাঁটেন। বললেন, ‘এই এলাকা ছিল কুমোরদের। প্রত্যেক বাড়িতেই চুলা ছিল। উত্তরের দিকে লাঠি উঁচিয়ে ধরে বললেন, ওইখানে অনেক বড় একটা পইন ছিল। পাড়ার সবচেয়ে বড় পইন। এখনো কিছু চিহ্ন বাকি আছে।’ ভবেশকে নিয়ে পাকা রাস্তা ধরে সেদিকে চললাম। একটা বৃহৎ টিলা দেখিয়ে ভবেশ বলল, ‘এটাই চুলা। বড় গাছ আর ঘাসবনে ছেয়ে আছে।’ পথিক বুঝবে না—এখানে চুলা ছিল এককালে।

সুশান্ত পালের সঙ্গে আবার দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন, ‘কাজটার মায়ায় পড়ে গেছি। এটা ছাড়া আর কোনো কাজ জানি না। এখন সুবিধা নেই। মাটি পর্যন্ত কিনে আনতে হয়। খরচ বেশি। কষ্টও হয় প্রচুর; কিন্তু তেমন লাভ নেই। জাতি ভাইয়েরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। মনে হয় না, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই কাজ করবে। তবে সরকার একটু নজর দিলে, মানুষ আগ্রহ পাবে।’ উল্লেখ্য, নরসিংদী জেলার পলাশ থানার পারুলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ দেওড়ায় কুমোরপাড়া।                                                  

ছবি : লেখক

মন্তব্য