kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

বিষাদের গ্রাম

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার দুটি গ্রামের ১২-১৫ জন মানুষ কাজ করত রানা প্লাজায়। তাদের মধ্যে আটজন নিহত হয়। আহত হয়ে বেঁচে থাকা তিনজনকে গত মঙ্গলবার দেখতে গিয়েছিলেন ফরিদুল করিম

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বিষাদের গ্রাম

জরিনা

নওগাঁ থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ। নিয়ামতপুর উপজেলা সদরে পৌঁছাতে ১১টা বেজে গেল। সঙ্গে কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি তসলিম উদ্দিন। নিয়ামতপুর সদর থেকে কুণ্ড ও তল্লা গ্রাম প্রায় ১৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে ভাঙাচোরা সড়ক পাঁচ কিলোমিটার। বাকিটা কাঁচা। বাইক চালাতে চালাতে তসলিম ভাই বললেন, ‘দুর্গম যাত্রা। ঝাঁকুনিতে আমরা দুজনেই কাহিল হয়ে পড়েছি। পৌঁছাতে সত্যি ১২টা বেজে গেল।’

 

রানা প্লাজার দাগ

ঢাকা সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ভাতকুণ্ডু ও তল্লা গ্রামের আটজন নিহত হয়। আহত হয় তিনজন। জরিনা যেমন দুই পা-ই হায়িছেন। অন্যের ওপর ভর করে জীবন চালাতে হচ্ছে তাঁকে। সেদিনের ট্র্যাজেডির কথা মনে করিয়ে দিতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন।

কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমাদের এই ভাতকুণ্ডু গ্রাম ও পাশের তল্লা গ্রামের ১০-১৫ জন নারী-পুরুষ রানা প্লাজায় কাজ করত। আমাদের গ্রামের জাহানারা আর আমি বেঁচে যাই, আর বেঁচে আছে তল্লার সায়মা। আহতদের সিআরপিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; কিন্তু আমি ছিলাম পঙ্গু হাসপাতালে। এটাই আমার দুর্ভাগ্যের কারণ। আমি কোনো টাকা পাইনি। চিকিৎসা শেষ হয়েছে; কিন্তু চিরতরে পা দুটি হারিয়েছি। থাকি বড় বোন জামাইয়ের বাড়িতে। নিহত ও আহত প্রত্যেকের পরিবারকে সরকার ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা এবং কয়েকটি করে গরু দিয়েছে। শুধু ঢাকার ব্র্যাক অফিস আমাকে ৯০ হাজার টাকা দিয়েছিল, তা চিকিৎসা করাতে গিয়েই শেষ হয়েছে। সারা দিন মাদুরের ওপর পড়ে থাকি। কোমর থেকে নিচের অংশ পুরোই অকেজো। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারি না। আমার একটাই মেয়ে। তার বিয়ে দিয়েছি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ঢাকায় কাজ করে। তারা যা সাহায্য পাঠায় তা দিয়ে এক রকম চলি। বেশিদিন ঘর করার সুযোগ পাইনি। স্বামী অনেক দিন আগেই ছেড়ে চলে গেছে। মাথা গোঁজার সামান্য ভিটাও নেই। আমাদের এই গ্রামে গার্মেন্ট শ্রমিক নার্গিস, মাতুয়া ও আরো কয়েকজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। তাঁদের লাশও পায়নি পরিবার।’ জাহানারার সঙ্গেও কথা হলো। তাঁর শরীরে খুব যন্ত্রণা হয়। সরকারের টাকা পেয়ে স্বামী, সন্তানরা ভালোই আছে; কিন্তু তাঁর কষ্ট কমছে না।

 

সায়মা

তল্লায় আছেন সায়মা

পাশের গ্রাম তল্লায় গিয়ে পঙ্গু সায়মাকে দেখলাম হুইলচেয়ারে বসে আছেন। দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘প্রায়ই অসুস্থ থাকি। ওই দিন আমাদের গ্রামের নাঈম, জবা ও তাঁর স্বামী বাবুল, আকলিমা ও তাঁর মেয়ে রুনা এবং সোহরাবের স্ত্রী বিউটি ঘটনাস্থলেই মারা যান। সবার লাশ গ্রামে পৌঁছালেও বিউটির লাশ পাওয়া যায়নি।’

মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল। বেশি ঘোরাঘুরি করতে আর ইচ্ছা হলো না। সূর্যও ততক্ষণে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ভারী মন নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।

 

ছবি : তাসলিম উদ্দিন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা