kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বৈশাখী ধুম

সাজ বাড়ি

কাঠের ছাঁচে ফেলে তৈরি হয় কদমা, বাতাসা। লোকে ডাকে সাজ খাবার। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ভাটারা গ্রামের বণিক পরিবার বংশপরম্পরায় এই খাবার তৈরি করছে। বৈশাখে তারা ব্যস্ত সময় পার করছে। ভাটারা ঘুরে এসেছেন মারুফ হোসেন

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সাজ বাড়ি

কবে বা কে প্রথম এই সাজের খাবার তৈরি করেছেন বলতে পারলেন না ভাটারা গ্রামের ৫০ বছর বয়সী সাজ কারিগর গোবিন্দ বণিক। তবে তাঁর ঠাকুরদা, বাবা, কাকাদের মতো তিনিও একজন সাজ কারিগর। গোবিন্দ জানান, পানির সঙ্গে চিনি বা গুড় মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে প্রথমে ঘন রস তৈরি করা হয়। এই ঘন রসকে বলা হয় পাক। গরম পাক ঢেলে দেওয়া হয় ছাঁচে। কাঠের তৈরি ছাঁচ হাতি, ঘোড়া, মাছ বা পাখির আকৃতির হয়ে থাকে। ঠাণ্ডা হলে তা তুলে নেওয়া হয়। আরো জানান, ৫০ কেজি বস্তার চিনি থেকে প্রায় একই পরিমাণের সাজ পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচসহ প্রতি ৫০ কেজি সাজ তৈরি করতে খরচ হয় ২৭০০ থেকে ২৮০০ টাকা। আর তাঁরা প্রতি ৫০ কেজি বিক্রি করেন ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়। পাইকাররাই বাড়িতে এসে কিনে নিয়ে যান। পাশাপাশি নিজেরাও মেলায় দোকান দিয়ে সাজ বিক্রি করেন।

 

বৈশাখে ব্যস্ততা বেশি

সারা বছরই কমবেশি সাজ তৈরি করলেও পৌষ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত ব্যস্ততা বেশি। এটা মেলার মৌসুম। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় চাপ থাকে বেশি। এ সময় তাদের কাজ করতে হয় গড়ে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা। বাড়ির বউ-ঝি, ছোট-বড় সবাই সাজ তৈরিতে লেগে যায়। রান্নাবান্নার ফাঁকে স্বামীর সঙ্গে যেমন কাজ করছেন নূপুর বণিক। বাদ যায়নি স্কুলপড়ুয়া সুমি বণিকও। সুমি বলল, ‘পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মা-বাবাকে সাহায্য করি। বাবার কাছে শুনেছি, আমার দাদারাও এ কাজ করতেন।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে ২০০ বণিক পরিবার ছিল। বেশির ভাগই সাজ খাবার তৈরি করত। গ্রামটির নামই হয়ে গিয়েছিল সাজের গ্রাম; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের সহযোগীদের অত্যাচারে বেশির ভাগই দেশছাড়া হয়েছে। এখন টিকে আছে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার।

তাপস বণিক চাকরি করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকে। ছুটির সময় তিনিও হাত লাগান সাজ তৈরিতে।

এ বাড়ির সবচেয়ে বেশি বয়স্ক সুরেবালা বণিকের সঙ্গেও কথা হয়।

 

সুরেবালা চোখে ভালো দেখেন না

সুরেবালার বয়স ৭০। তিনি এখন ভালো করে চোখে দেখেন না। বললেন, প্রায় ৫০ বছর আগে বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছি। স্বামীকে ঘোড়া, মাছ, পাখি বা নৌকা আকৃতির সাজ খাবার তৈরি করতে দেখেছি। তখন বারো মাসই এর চাহিদা ছিল। নতুন জামাই বেড়াতে গেলে এসব খাবার কিনে নিয়ে যেত। বাড়িতে অতিথি এলেও এগুলো দিয়েই আপ্যায়ন করত লোকেরা।

গোবিন্দ বণিকের ভাই শ্যামল বণিক বললেন, ‘এখন আধুনিক সব খাবার যেমন—চকোলেট, চিপস, আইক্রিম ইত্যাদি খাবারে ছোটদের আগ্রহ বেশি। অথচ আগের দিনে সাজ খাবারেরই কদর ছিল। তার পরও যদি সরকার আমাদের সুদহীন ঋণ দেয়, তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।’ স্থানীয় বালিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বলেন, ‘এগুলো বাংলার ঐতিহ্য। তাই সরকারের নজর দেওয়া দরকার। আমি এরই মধ্যে ওপর মহলকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য