kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

উদ্যমী বাংলাদেশ

মকবুল খামারি

মকবুল হোসেন একজন প্রকৌশলী। জামান প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট কম্পানিতে কাজ করতেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্ম। নূরুল হক বাবুল গিয়েছিলেন দেখতে

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মকবুল খামারি

মকবুল হোসেন ঠিক করলেন চাকরি আর করবেন না। তাঁর মন খারাপ হয়েছে, বাসায় দুধ রেখেছেন; কিন্তু দুধে ভেজাল। ভাবলেন একটি গরুর খামার করবেন। মানুষকে খাঁটি দুধ খাওয়াবেন। জামান প্রপার্টিজের মালিক জামান সাহেবকে (আখতারুজ্জামান) খুলে বললেন সে কথা।  জামান সাহেব বললেন, ‘বেশ ভালো। আমারও একটি ডেইরি ফার্ম আছে। আপনি চাইলে দায়িত্ব নিতে পারেন। অন্তত এ ব্যাপারে ধারণা নিতে পারেন। এ ব্যবসায় ভালো লোক দরকার।’

 

যাত্রা হলো শুরু

এবার জায়গা খুঁজতে বের হলেন মকবুল হোসেন। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাছে ছোলমাইদে একটি জায়গা পেলেন। শেড তৈরি করলেন, চৌবাচ্চা, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ইত্যাদিও। সেটা ২০১৪ সাল। চারটি গাভি কিনলেন। সব মিলিয়ে খরচ হলো সাড়ে আট লাখ টাকা। প্রথম দুই বছর লাভের মুখ দেখেননি। তবে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেন। পরের তিন বছরে সব কিছু পরিকল্পনামাফিক করলেন। এখন তাঁর খামারে প্রায় তিন কোটি টাকার গবাদি পশু রয়েছে। গাভি, ষাঁড়, বলদ ও বাছুরের সংখ্যা ৮৪। এর মধ্যে গাভি ৩৯টি। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আছে ৩৬টি। প্রতিদিন দুধ হয় প্রায় দুই হাজার লিটার। প্রতি লিটার দুধের দাম ধরেন ৮০ টাকা আর আধা লিটারের দাম ৪৪ টাকা। তাঁর কর্মীরা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি প্যাকেটজাত দুধ পৌঁছে দেয়। প্রত্যেক কর্মীর নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্ম লেখা ইউনিফর্ম আছে। বলছিলেন, ‘দুধ দোহন থেকে শুরু করে প্যাকেট করা পর্যন্ত সবটাই নিজে তত্ত্বাবধান করি। আমরা এখানে সব মিলিয়ে ২২ জন লোক তিন দলে ভাগ হয়ে কাজ করি। এক দল ঘাস কাটার কাজ করে, আরেক দল গরু-ছাগল পরিচর্যা করে আর শেষ দলে আছেন বিক্রয়কর্মীরা। আমি একটি আধুনিক খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছি। আমরা দুধ সরবরাহ করি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ছোলমাইদ, ভাটারা, নুরের চালা, নতুন বাজারসহ আশপাশের আরো কিছু জায়গায়। টাকা সংগ্রহ (কালেকশন) করি পরের মাসের ১০ তারিখের মধ্যে। আমরা গোবরও বিক্রি করি। প্রতি বস্তা ২০ টাকা।’

 

ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

‘খামার ব্যবসায় শিক্ষিত লোক নেই বললেই চলে। ব্যবসাই তাঁদের কাছে বড়। দুধে ভেজাল মেশানো তাঁদের কাছে ছেলেখেলা। ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা একবারও চিন্তা করে না। পানি তো মেশায়ই, তারপর গুঁড়া দুধ মেশায়, রাসায়নিকও মেশায়। দেখতে দুধের মতোই লাগে, কিন্তু স্বাদ পাবেন না। শিশুরা এ দুধ খেয়ে কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে ভাবুন। দুধ বেশি পাওয়ার জন্য গাভিকে হরমোন ইনজেকশনও দেওয়া হয়। হার্ট, লিভার, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার বাসার দুধে যখন ভেজাল পেলাম, আমি সন্তানদের মুখের দিকে তাকালাম। খুব কষ্ট পেলাম। ভাবলাম সন্তানদের বাঁচাতে হবে। তাই খামার করতে লেগে গেলাম। বলতে পারেন ভেজালের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে নেমেছি। আমি বাজার থেকে এনে ফিডও খাওয়াই না পশুদের। রাখাল আছে। প্রতিদিন কাঁচা ঘাস কেটে আনে তারা। বিশুদ্ধ পানি খাওয়াই। খড়, ভুসি, খৈল খাওয়াই।’ বলছিলেন মকবুল হোসেন।

 

পড়াশোনা করেছেন

গবাদি পশুর চিকিৎসার কোনো নির্দিষ্ট ডাক্তার নেই নর্থ বেঙ্গল ডেইরির। মকবুল হোসেনের ভেটেরিনারি ডাক্তারদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ভালো নয়, বিশেষ করে সময়মতো ডাক্তার পাওয়াই যায় না। তিনি নিজে ইন্টারনেট, সাময়িকী ও বই পড়ে গবাদি পশুর রোগ সম্পর্কে জেনেছেন। বেশি জেনেছেন রোগের কারণ। তিনি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধেই বেশি আগ্রহী। তবে অনেক রোগের চিকিৎসাপদ্ধতিও জেনেছেন তিনি। সে অনুযায়ী নিজেই ব্যবস্থা নেন। বলছিলেন, ‘খামারের ভেতরটা আমরা পরিষ্কার রাখি সব সময়। মশা আর পোকা-মাকড় প্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে।’ নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মে ফ্রিজিয়ান হলস্টাইন ও জার্সি জাতের গাভি আছে বেশি। মকবুলের খামারটি দুই বিঘা জমির ওপর। ব্যাংকের ঋণ পুরো শোধ হয়নি এখনো। কিন্তু তাঁর চিন্তা কম, কারণ খামারটি দাঁড়িয়ে গেছে। ঋণ শোধ করতে বেশি বেগ পেতে হবে না বলেই মনে করেন। তিনি নতুনদের উদ্দেশে বলেন, সততা থাকলে, ধৈর্য ধরলে আর পরিশ্রম করলে সবখানেই সফল হওয়া যায়।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা