kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

মইশখালীর মিডা পান

সাধারণত ভারি ভোজের পর লোকে পান খেয়ে হালকা হয়। আমাদের দেশে এমন অনুষ্ঠান কমই হয়, যেখানে পানের ব্যবস্থা রাখা হয় না। আর সেখানে মহেশখালীর পানের চাহিদাই বেশি। কারণ সে পান মিষ্টি। এই পান বিদেশেও রপ্তানি হয়। মো. রেয়াজুল হক সে পানের খবর বলছেন

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




মইশখালীর মিডা পান

শিল্পী সেফালী ঘোষ মহেশখালীর মিষ্টি পান নিয়ে মিষ্টি একটি গান গেয়েছেন—

‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম

মইশখাইল্যা পানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম।’

একটি গান গেয়েছেন শিল্পী কান্তা নন্দীও। সেটির একটি বাক্য এমন ‘মনে করে মইশখালীর মিডা পান খাইতাম।’

এই গানগুলো এখনো বিয়েবাড়ি মাতিয়ে রাখে।

 

বুকানন দেখেছিলেন

ড. ফ্রান্সিস বুকাননের ভ্রমণকাহিনি থেকে জানতে পাই, ২০০ বছরের অধিককাল আগেও মহেশখালীতে পানের চাষ হতো। তিনি ১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বোর্ড অব ট্রেডের নির্দেশে চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা ভ্রমণ করেন। কক্সবাজার ভ্রমণকালে মহেশখালী দ্বীপে পানচাষিদের দেখতে পান। মহেশখালীর উঁচু পাহাড়ি জমি যেখানে পানি জমে না, সেসব জায়গায় তিনি পানের বরজের দেখা পান। বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালার কক্সবাজার সিরিজে মহেশখালীতে তাঁর ভ্রমণের বিবরণ আছে। তিনি লিখেছেন, ‘ভোরবেলা আমি দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত পাহাড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত পরীক্ষার জন্য বের হলাম।... আদিগঞ্জ (বর্তমান গোরকঘাটা) থেকে আনুমানিক এক মাইল পশ্চিমে ডুমসাগাকাতালু নামে পরিচিত একটি উঁচু ভূমি রয়েছে, যার প্রান্ত বৃষ্টির পানি চলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ঢালু এবং যার মাটি অত্যন্ত ভালো। পানির অভাবে এ জমিতে চাষাবাদ হয়নি, তবে তার এক জায়গায় একটি পানের বরজ বা বাগান রয়েছে।’ 

কেন এত স্বাদ 

চট্টগ্রাম সিটি কলেজের হিসাববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার সাদাতের বাড়ি মহেশখালী। মাঝেমধ্যে নিজ এলাকার পানের স্বাদ নেন। তিনি জানান, মহেশখালীর মাটি এবং এখানকার আবহাওয়ার কারণে এই পানের স্বাদ মিষ্টি। কিছুক্ষণ চিবোলে মুখে মিশে যায়। কোনো ঝাল লাগে না। তাই অনেকেই শখের বশে হলেও এই পানের স্বাদ নেন। কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে মহেশখালীর পানের খিলি পান দোকান। আর যাঁরা বোটে বা লঞ্চে করে কক্সবাজার থেকে মহেশখালী যান তাঁরা কয়েক বিড়া মহেশখালীর মিষ্টি পান নিয়ে আসেন। বাড়ি ফিরে বিলি করেন আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। পুরো কক্সবাজার জেলার ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া একই রকম। একসময় মহেশখালীও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মহেশখালী মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়। 

 

আষাঢ় মাসে পানচাষ শুরু

মমতাজুল ইসলাম মহেশখালী কলেজের লাইব্রেরিয়ান। বাড়ি খন্দকারপাড়ায়। তিনি জানান, ছোট মহেশখালী, বড় মহেশখালী, শাপলাপুর, কালারমারছড়া—এসব এলাকায় মিষ্টি পানের চাষ হয়। পান গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। পানগাছ খুবই স্পর্শকাতর। তাই বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। পানের বাগান বরজ হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের বাগান থেকে পানের বরজের পার্থক্য আছে। বর্ষাকালে চাষিরা পানচাষের জমি তৈরি করে। ৫ বা ১০ শতক জায়গা নির্ধারণ করে আগাছা পরিষ্কারে লেগে যায়। গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে তার জন্য দুই পাশে অগভীর পরিখা খনন করে উঁচু অংশে পানের লতা বীজ হিসেবে লাগানো হয়। পরিখা পানি ধরে রাখার কাজ করে। গাছের বৃদ্ধির জন্য ৭-৮ ফুট দীর্ঘ বাঁশের কঞ্চি খাড়া করে পুঁতে দেওয়া হয়। এই কঞ্চি বেয়ে গাছ বাড়তে থাকে। অনেক কঞ্চির মাথা একত্র করে ওপরে মাচার মতো তৈরি করা হয়। মাচায় শণ বা খড় বিছানো থাকে। পানের লতা লাগানো হয় আষাঢ় মাসে। পানগাছে যাতে রোদ সরাসরি না লাগতে পারে, তার জন্য সম্পূর্ণ বাগানই শুকনো খেজুর বা সুপারিপাতা অথবা খড়ের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। প্রায় ৯ মাস পর পান তোলার উপযোগী হয়। একটি বরজ থেকে কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়। তবে প্রতিবছর বাগানে নতুন মাটি দিতে হয়। বাগানও পরিষ্কার রাখতে হয়।

মমতাজুল ইসলাম আরো জানান, বছরজুড়েই ফলন পাওয়া যায়। বর্ষার সময় পানের ফলন ভালো হয়, তাই এ সময় দাম কম থাকে। শীত ও বসন্তকালে ফলন কমে যায়, তাই দাম বেশি থাকে। সাধারণত পান বিক্রি হয় গণ্ডা বা বিড়া হিসেবে। চারটি পান পাতায় এক গণ্ডা এবং ৮০ গণ্ডায় এক বিড়া ধরা হয়। প্রতি বিড়া পান কমপক্ষে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পানের ওজন গুরুত্বপূর্ণ। এক বিড়া পানের ওজন সাধারণত ৩০০-৪০০ গ্রাম হয়।

 

মহেশখালীর পানের বাজার

মমতাজুল ইসলাম জানান, গোরকঘাটা ও বড় মহেশখালীর নতুনবাজারে সপ্তাহের মঙ্গল ও শুক্রবার পানের হাট বসে। চাষিরা বরজ থেকে পান তুলে বাঁশের ঝুড়িতে গোল করে সাজিয়ে হাটে নিয়ে আসেন। হাটবারে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আড়তদাররা এসে জড়ো হন মহেশখালীতে। তাঁরা পান কিনে ট্রাকে বা বড় নৌকায় করে নিয়ে যান। খিলি পানের জন্য গোরকঘাটার মিষ্টিমুখ হোটেলের পাশের দোকানটি প্রসিদ্ধ। তিনি আরো জানান, মহেশখালীর সব বাগানের পানের স্বাদ এক নয়। পাহাড়ের পাদদেশের পুরনো বাগানের পানই বেশি স্বাদের। নতুন বাগানের পান কিছুটা কম স্বাদের। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার পানের তুলনায় মহেশখালীর সব বাগানের পানের স্বাদই অতুলনীয়।

 

পানছল্লাহ, হাচারগুয়া

পুরো কক্সবাজারেই পান ছাড়া কোনো বিয়ের কথা ভাবা যায় না। বিয়ের আগে বর ও কনের বাড়িতে মুরব্বিদের নিয়ে যে শলাপরামর্শ হয়, তাকে পানছল্লাহ বলে। বিয়ের দিন সকালে পান-সুপারি ও পাকান পিঠাসহ বিভিন্ন সামগ্রী কনের বাড়ি পৌঁছে দিতে হয় যেন বরযাত্রী কনের বাড়িতে যাওয়ামাত্র পান পেতে অসুবিধা না হয়। যাঁরা এগুলো বহন করে নিয়ে যান, তাঁদের হাচারগুয়া বলে। বিবাহিত বর যখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়ি যায়, তখন সিকান্দরি বাটা প্রদান করা হয়। তবে ধাঁধার জবাব দিতে পারলেই শুধু বর পান খাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। একটি ধাঁধা এমন—

যেমন—

‘অগগুয়া জিনিসঅর তিনমুচড়া

ভাআই দি ন পাইল্লে কানমুচড়া।

অর্থাত্ একটি জিনিসের তিন মোচড়া, উত্তর না দিতে পারলে কান মোচড়া খেতে হবে। জিনিসটি হচ্ছে পান।

মন্তব্য