kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

নাটোরের কাঁচাগোল্লা

নাটোরের বনলতা সেন যেমন চেনা, কম চেনা নয় কাঁচাগোল্লাও। যেভাবে তৈরি হলো কাঁচাগোল্লা জেনেছেন রেজাউল করিম রেজা

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নাটোরের কাঁচাগোল্লা

রাজা-উজিরের দেশ এই নাটোর। রানি ভবানীর হাতে তো অর্ধেক বঙ্গের নাটাই ছিল। তাইতো তাঁর গালভরা নাম ছিল অর্ধবঙ্গেশ্বরী। মূলত সে আমলেই কাঁচাগোল্লার সৃষ্টি ও প্রসার।

 

যে গল্প মুখে মুখে ফেরে

মিষ্টি রানি ভবানীর খুব পছন্দ ছিল। তাঁর প্রাসাদে নিয়মিতই মিষ্টি সরবরাহ করতেন লালবাজারের মধুসূদন পাল। এক দিন মধুুসূদনের ২০ কর্মচারীর সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। দোকানে দুই মণ ছানা রাখা ছিল। নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মধুসূদন ছানাগুলো চিনির রসে ভিজিয়ে দেন। এরপর একটু চেখে দেখেন—অপূর্ব হয়েছে খেতে। এদিকে রানির লোকেরা মিষ্টি নিতে এলো। তিনি ওই ছানাগুলো পাঠিয়ে দেন প্রাসাদে। নতুন এই মিষ্টি রানির খুব পছন্দ হলো। তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। শুধালেন—এর নাম কী? মধুসূদন পড়লেন বিপাকে। নাম তো রাখা হয়নি। তখন ভাবলেন, যেহেতু কাঁচা ছানা থেকে  তৈরি, তাই কাঁচাগোল্লা নাম হতে পারে। সেই থেকে এর নাম কাঁচাগোল্লা। ছানা, চিনি ও এলাচ দিয়ে তৈরি হয়।

রানি ভবানীর আমলেই কাঁচাগোল্লার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তা আজ থেকে ২৫০ বছর  আগের কথা। আজও সুনাম ধরে রেখেছে কাঁচাগোল্লা।

 

দেশ-বিদেশে

১৭৬০ সাল রানি ভবানীর রাজত্বকাল। তখন নাটোরে মিষ্টির দোকান ছিল গুটিকয়। তবে দোকানগুলোয় অনেক পদের মিষ্টি মিলত। যেমন—সন্দেশ, রাঘবশাহী, চমচম, রাজভোগ, রসমালাই, পানতোয়া ইত্যাদি। এর মধ্যে হঠাত্ করে ওই কাঁচাগোল্লাই সিংহাসনে চড়ে বসল। তখন জমিদারদের রানির লোকেরা কাঁচাগোল্লা দিয়েই আপ্যায়ন করতেন। বিলেতের রাজ পরিবারও কাঁচাগোল্লার স্বাদ পেয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। কাঁচাগোল্লা যেত ভারতবর্ষের আরো নানা জায়গায়। এই মিষ্টান্নের সুখ্যাতি করেছে রাজশাহী গেজেটও। লেখালেখি হয়েছে কলকাতার পত্র-পত্রিকায়ও। ১৮৪০ সালে দিঘাপতিয়ার রাজা প্রসন্ননাথ রায় কৃষ্ণ উত্সবে আসা ভক্তদের কাঁচাগোল্লা দিয়েই আপ্যায়িত করেন। তখন প্রতি সের কাঁচাগোল্লার দাম ছিল তিন আনা। 

 

গুপ্তিমন্ত্র

কারিগর প্রভাত পাল ও রবী কুণ্ডু জানান, খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি কাঁচাগোল্লা তৈরির প্রধান উপাদান। এক কেজি কাঁচাগোল্লা তৈরি করতে প্রায় এক কেজি কাঁচা ছানা লাগে। এই ছানা হতে হবে ননি ও সর না তোলা দুধের। ৪০০ গ্রাম চিনি কড়াইতে নিয়ে পরিমাণমতো পানিসহ জ্বাল দিতে হয়। এ সময় কাঠের খন্তা দিয়ে নাড়তে হয়। এভাবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ধারাবাহিকভাবে নাড়তে নাড়তেই কাঁচাগোল্লা তৈরি হয়ে যায়।

 

মধুসূদনের বংশধর

নাটোর শহরের পালপাড়ায় থাকতেন মধুসূদন পাল। লালবাজারে জয়কালীবাড়ির কাছে জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামে একটি দোকান খুলেছিলেন। এই নামে এখনো লালবাজারে একটি দোকান আছে। প্রভাত পাল এটি পরিচালনা করেন। পিসি সুভদ্রা পালের কাছে প্রভাতের কাঁচাগোল্লা তৈরির হাতেখড়ি। লোকে বলে, সুভদ্রা পাল মধুসূদনের বংশধর। সুভদ্রা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো। সুভদ্রার আগে তাঁর স্বামী ষষ্টি পাল কাঁচাগোল্লা তৈরির কাজ করতেন। তার আগের মানুষটির খবর আর পাওয়া যায় না। প্রভাত পাল বলেন, মধুসূদন পালের সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক পিসি বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন। মধুসূদন পাল সম্পর্কে প্রভাত বেশি কিছু জানেন না।

 

যেথায় মেলে কাঁচাগোল্লা

নাটোর শহরের প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায় কাঁচাগোল্লা। লালবাজারের জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে তো বটেই, নিমতলা মোড়ে দুলাল পালের দোকানে, নিচাবাজারে কুণ্ডু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ও মৌচাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ভালো কাঁচাগোল্লা পাওয়া যায়। এক কেজির দাম চার থেকে পাঁচ শ টাকা। 

 

কারণ অনুসন্ধান

কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার জানান, নাটোরের পানি মূলত কাঁচাগোল্লা তৈরির জন্য আদর্শ। বললেন, নাটোরের বিভিন্ন স্থানে অল্প স্রোতের অসংখ্য খাল ছিল। কাপড়ে বেঁধে দুধের তৈরি ছানা ওই সব খালের পানির ভেতর ডুবিয়ে রাখা হতো। সকালে তুলে সব পানি বের করে দেওয়া হতো। ওই ছানা থেকেই তৈরি হতো কাঁচাগোল্লা। এ কারণেই নাটোরের মতো সুস্বাদু কাঁচাগোল্লা আর কোথাও তৈরি হয় না।

ছবি : লেখক

মন্তব্য