kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

নাঈমকে যে খুঁজে পেয়েছিল

বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ফাটা পানির পাইপ দুই হাতে চেপে বসে ছিল যে শিশু তার নাম নাঈম। দুর্জয় জয় শাওন নামের এক আলোকচিত্রী নাঈমের সে ছবি তুলে দিয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাড়া ফেলে দিয়েছে সে ছবি। শাওনের কাছে পুরো ব্যাপারটি জেনেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নাঈমকে যে খুঁজে পেয়েছিল

শাওন থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়ায়। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে এমবিএ পড়ছেন। দশম শ্রেণিতে থাকতেই ছবি তোলার প্রেমে পড়েন জয়। সেই থেকে যেখানেই যান, ক্যামেরা হাতে নিতে ভুল হয় না।

 

সেদিন দুর্জয়

বেশ রাত করে ঘুমিয়েছিলাম সেদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে ঢুকতেই পেলাম আগুন লাগার খবর। সেখানে আটকে পড়া অসহায় মানুষদের দেখে মন কেঁদে উঠল। সাইকেল নিয়ে না খেয়েই বের হয়ে পড়লাম। মিরপুর থেকে বনানী যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগল। জায়গাটা পরিচিত না হওয়ায় কয়েকবারই জিজ্ঞেস করতে হয়েছিল। তারপর টাওয়ারের কাছাকাছি পৌঁছে এক বাসার দারোয়ানকে অনুরোধ করলাম সাইকেলটা দেখে রাখতে। তিনি সম্মতি দিলে সাইকেল, ব্যাগ রেখে চলে গেলাম টাওয়ারের নিচে। দেখলাম হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অগ্নিকাণ্ড দেখছে। শুধুই দেখছে। আমি কী করব ঠিক করতে পারছিলাম না। তারপর দেখলাম কিছু ছাত্র ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সাহায্য করছে। আমিও যোগ দিলাম তাদের সঙ্গে। এর মধ্যে দেখলাম, কয়েকজন তার বেয়ে নামার চেষ্টা করছে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য।

নাঈমকে যেভাবে পেলাম

পরিস্থিতি কিছু আয়ত্তে এলে খেয়াল করলাম, আমার ঠিক পাশেই একটা ছেলে পাইপের ওপর বসে আছে। দুই হাত দিয়ে সে পাইপটা চেপে ধরে আছে। পাইপটা ফাটা ছিল। তাই পানি বেরিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেটি ছোট দুটি হাত দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় পানির বেরিয়ে যাওয়া ঠেকাচ্ছে। আশপাশের কেউ কেউ তাকে পলিথিন এনে দিল। আমার অবাক লাগল, ওই বয়সী একটা ছেলে অন্যদের মতো শুধু দাঁড়িয়ে না থেকে একটা কাজের মতো কাজ করছে। ক্যামেরা বের করে ক্লিক করলাম। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হলো। সে লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। তারপর আমি আরো কয়েকটি ক্লিক করলাম।

 

একজন লাফ দিতে চেয়েছিলেন

নাঈমের ছবি তুলে পাশের একটি হোটেলে উঠি আরো ছবি তুলতে। সেখানে হোটেলের কিছু লোক ও কয়েকজন সাংবাদিক ছিল। ফায়ার সার্ভিসের মই যতটা ওপরে পৌঁছেছিল, আমরা তার চেয়েও ওপরে ছিলাম। তাই দেখতে পাচ্ছিলাম কিছু বেশি। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের তথ্য দিয়ে সাহায্যও করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একজন টাওয়ার থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছেন আর কান্নাকাটি করছেন। আমরা দ্রুত একটি হ্যান্ড মাইকের ব্যবস্থা করলাম হোটেল সদস্যদের কাছ থেকে। আমরা ওই ব্যক্তিকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আপনি নিরাপদে আছেন, ওখানেই থাকুন, লাফ দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এভাবে কিছু সময় যাওয়ার পর তিনি পানির ট্যাংকের কাছে গিয়ে বসেন। সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।

ছবিতে মিলেছিল লাশের পরিচয়

হোটেল থেকে যখন নিচে নামছিলাম, তখন মনে হলো, টাওয়ারে কিছু মানুষ তখনো আটকে আছেন। পাশের একটি ভবন দিয়ে টাওয়ারে প্রবেশ করি। ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে ১৮ তলায় উঠে দেখি তিনটি লাশ পড়ে আছে। আমি কয়েকটি ছবি তুলে দ্রুত বের হয়ে আসি। কারণ আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। চারদিকে ধোঁয়া ও গুমোট গন্ধ ছিল। নিচে নেমে এসে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ওই লাশগুলোর কথা জানাই। তারপর আমি বাসায় চলে আসি। এসেই ফেসবুকে লাশগুলোর ছবি আপলোড করি। কয়েক মিনিটের মধ্যে বেশ কয়েকজন আমাকে ফেসবুকে নক করে। জানতে চাইলেন, তাঁরা দেখতে কেমন, আর কী পরা ছিল? এরপর আমি আরো কয়েকটি ছবি আপ করি। সেগুলোর মধ্যে নাঈমের ছবিটিও ছিল। ছবিটি খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। পরের দিন পত্রিকা মারফত জানতে পারি, শিশুটির নাম নাঈম। থাকে কড়াইল বস্তিতে। তার বাবা ডাব বিক্রি করেন আর মা ‘কাজের লোক’। সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র।

মন্তব্য