kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফেসবুক থেকে পাওয়া

ওরা আজ মেহমান

২০১৪ সালের কথা। ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা ভার্সিটিতে ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা। আমার সিট পড়েছিল ভার্সিটিতেই, আইবিএ ভবনে। ডিউটিতে ছিলেন একজন প্রবীণ স্যার ও একজন ম্যাম। হলরুমে যেতে আমরা কয়েকজন ভুল করে শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত লিফটে উঠে পড়েছিলাম। স্যার ও ম্যাম একই লিফটে উঠেছিলেন। সিকিউরিটি গার্ড আমাদের নেমে যেতে বললেন। নেমেও গেলাম। পরে দেখলাম, স্যার আমাদের ডাকছেন—এই, তোমরা লিফটে আসো। ম্যাম অবাক হয়ে তাকালেন স্যারের দিকে। স্যার হেসে বললেন, ‘উঠুক, ওরা আজ অতিথি।’ এরপর লিফট চলাকালে অনেক কথা হলো স্যারের সঙ্গে। স্যারের চোখেমুখে ছিল স্নেহ, চেহারায় ব্যক্তিত্বের ছাপ। লিফট থেকে নামতে নামতে ভাবলাম, ‘সৌম্য’ শব্দটি এ ধরনের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। এরপর কয়েক জায়গায়ই ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেছি। কিন্তু ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ফেরার কালে বারবার ভার্সিটিকে দেখেছি। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা আছে পুরো ক্যাম্পাসে—আইবিএ ভবন থেকে শুরু করে প্রতিটি ভবনে। হতে পারে সেটা ভার্সিটির সোনালি ইতিহাস অথবা অন্য ভার্সিটির রোল মডেল হওয়া অথবা ওই প্রবীণ শিক্ষকের মুখে, ‘উঠুক, ওরা আজ মেহমান’ কথাখানির মতো মায়া!

মুহসিনা মিঠু

শিক্ষার্থী, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ।

 

আম্মার দেওয়া ফোন

তখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি। একদিন বাজারে এলাকার এক বড় ভাইয়ের হাতে একটা স্মার্টফোন দেখলাম। ফোনের বিভিন্ন গেমস আর অ্যাপ্লিকেশন দেখে স্মার্টফোনের প্রেমে পড়ে গেলাম। এমন একটা ফোন কবে যে আমার হবে! কিন্তু সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। এ সময় কোনোভাবেই বাড়িতে ফোনের কথা বলা যাবে না। যা বলার সেটা বলব পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে; কিন্তু মৌখিক পরীক্ষা তখনো বাকি। এর মধ্যে আম্মার কাছে বায়না ধরলাম একটা স্মার্টফোনের জন্য। কয়েক দিন ধরে রাগ-অভিমানের পর আম্মা রাজি হলেন। অবশেষে এলো বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন। শহরে এসে চাচাতো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মার্কেটে গেলাম। কিন্তু যে ফোনটা পছন্দ হলো সেটার যা দাম, টাকা এনেছি তার চেয়ে কিছুটা কম। বাড়িতে ফোন দিলাম, আব্বা রিসিভ করলেন। আমার কথা শুনে তিনি বললেন যতটুকু টাকা লাগে চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে নিতে। পরে শোধ করে দেবেন।  অবশেষে ফোন কিনলাম। ফোনটা যখন হাতে নিলাম তখন কী যে আনন্দ লেগেছিল, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর ঢাকা গেলাম একটা কাজে। কিন্তু সেখানে গিয়েই ঘটল এক বিপত্তি। ফোনটা কোনোভাবেই অন হচ্ছে না। মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আম্মার কিনে দেওয়া স্মার্টফোনটা কি আর ব্যবহার করতে পারব না? ঢাকা থেকে ফিরে এসে গেলাম কাস্টমার কেয়ারে। তারা বলল, ব্যাটারি পরিবর্তন করলেই ঠিক হয়ে যাবে। ফোনটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। বন্ধুরা অনেকেই নিত্যনতুন মডেলের ফোন কিনছে। আমি এই মোবাইলটা এখনো পরিবর্তন করিনি। এ ফোনটা কাছে থাকলে অন্য রকম এক প্রশান্তি অনুভব করি। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকালেই আম্মার মুখটা ভেসে ওঠে। মনে হয়, মায়ের স্পর্শ সব সময় সঙ্গে নিয়ে আছি। এটা আমার কাছে অনেক বড় এক উপহার।

মালেক সরদার

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

গঙ্গারামপুরের বিনোদ মুখার্জি

তখনো আমাদের বাড়ি বিদ্যুৎ আসেনি। তাতে কী, লেখালেখির নেশাটা তখন পুরোপুরি ধরে ফেলেছে আমায়। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা, কী নিয়ে লেখা যায়? কোনটা লিখলে ভালো হবে, আর কোনটা লিখলে পত্রিকার সম্পাদক গুরুত্বসহকারে ছাপাবেন? সারা রাত কাগজে লিখি আর সকাল হলেই চোখ মুছতে মুছতে কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বিদ্যুতের সন্ধানে। উদ্দেশ্য একটাই, রাতে লেখা গল্প, রম্যরচনা, কার্টুন আইডিয়াগুলো টাইপ করে পত্রিকায় পাঠাতে হবে। ছুটে যেতাম বাজারে। কখনো ক্লাবে, কখনো বা রোকন ভাইয়ের দোকানে, কখনো কখনো বিভিন্নজনের দোকানে ল্যাপটপ চার্জে দিয়ে বসে টাইপ করার জন্য ধরনা ধরতাম। বেশির ভাগ সময় শান্ত কাকার দোকানে বসে ল্যাপটপ চার্জে লাগিয়ে শুরু করতাম টাইপ। সকাল থেকে শুরু করে কোনো কোনো দিন বিকেল অবধি টাইপিং চলত। পরে পত্রিকার ঠিকানায় পাঠিয়ে বাড়ি ফিরতাম। আম্মু এ নিয়ে কত যে বকা দিয়েছেন। ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে বের হলেই আম্মু বলতেন, গরুর ডাক্তার। ভাবি বলত, পরিবার পরিকল্পনার লোক। কেউ বলত এনজিওর লোক, কিস্তি নিতে আসছে নাকি লোন দিতে আসছে। শান্ত কাকার দোকানে বসে টাইপ করার সময় একটা জিনিস প্রতিদিনই লক্ষ করতাম, একজন মানুষ আসেন। পরনে তার সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি, কাঁধের ওপর দিয়ে হলুদ রঙের তোয়ালে, কপালে সাদা ফোঁটা। হাতের ঝুড়িতে ভরা বিভিন্ন রকমের তরতাজা ফুল। মুখে তার অনবরত সংস্কৃত শব্দ। দেখেই বোঝা যায়, উনি ব্রাহ্মণ। গুনগুনিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে ঢুকে দোকানের ভেতরে টানানো দেবতার ছবিতে ফুল দিয়ে ভক্তিভরে পূজা-অর্চনা করেন। পূজা শেষে শান্ত কাকার কপালে সাদা একটা ফোঁটা দেন। শান্ত কাকা দু-এক টাকা দেন, সেটা নিয়ে চলে যান। টানা তিন বছর আমি তাঁকে দেখেছি। রোজ তাঁর মুখে মন্ত্র শুনতে শুনতে আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। একসময় আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এলো। অনেক দিন খুব সকালে যাওয়া হয় না বাজারে আর। সেই ব্রাহ্মণকেও দেখা হয় না। হঠাৎ সেদিন তাঁকে নিয়ে কৌতূহল জাগল। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখনো তিনি রোজ সকালে বাজারে আসেন। দোকানে দোকানে পূজা দিয়ে বেড়ান। সাদামাটা এই মানুষটার নাম বিনোদ মুখার্জি। গঙ্গারামপুরেরই বাসিন্দা। এক সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হলাম তাঁর বাড়ি। এক ছেলে, বউমা আর স্ত্রীকে নিয়েই সংসার। অনেক কথা হলো। বললেন, জন্ম যেহেতু ব্রাহ্মণ পরিবারে, পূজা-অর্চনা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। বুঝতে শেখার পর থেকে দেখেছি বাবা-কাকারা পূজা-অর্চনা দিয়ে বেড়িয়েছেন। একসময় আমাকে পৈতা দেওয়া হলো। তখন থেকেই পূজা-অর্চনা শুরু। সংসারের টানাপড়েনে পড়াশোনা বেশি করতে পারিনি। একসময় বিয়ে করলাম। তখন গঙ্গারামপুর বাজার বেশ জমজমাট হয়ে উঠল। তখন বাজারের বেশির ভাগ দোকানই ছিল হিন্দুদের। তাঁরা ডেকে বললেন, রোজ সকালে তাঁদের দোকানে গিয়ে পূজা দিতে হবে। বিনিময়ে যে যার মতো দক্ষিণা দেবে। রাজি হলাম। তখন থেকেই বাজারে দোকানের পূজা করা শুরু করলাম। ১৫ বছর ধরে করছি এটা। প্রথমে দোকানদাররা আট আনা-চার আনা করে দিত। এখন দুই থেকে ১০ টাকাও দেন কেউ কেউ। রোজ ২৫০-৩০০ টাকার মতো কামাই হয়। এত দিন মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে আছি, শেষ সময়ে এভাবে ভালোবাসায় বাঁচতে চাই।

এস আর শানু খান

মনোখালী, শালিখা, মাগুরা।

মন্তব্য