kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

শেষ মানুষ

পাপ্পু আর্ট

বিশাল ফ্রেমে ক্যানভাস কাপড়ে আঁকা হতো সিনেমার ব্যানার। মাত্রই মুক্তি পেয়েছে এমন সিনেমার প্রচারের বড় মাধ্যম ছিল এটাই। সিনেমার চরিত্রগুলোর আকর্ষণীয় ছবি শোভা পেত ব্যানারগুলোয়। হানিফ পাপ্পু এখনো ধরে রেখেছেন তাঁর এ পেশা। তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আসাদ

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পাপ্পু আর্ট

প্রতি সপ্তাহে একাধিক ছবি মুক্তি পেত। সব কটির জন্য ব্যানার আঁকতে হতো। সাধারণত এনামেল পেইন্ট দিয়ে আঁকা হতো ক্যানভাস কাপড়ে। দেশভাগের পরপর এই কাজ করত পাকিস্তান ও ভারত থেকে আসা লোকজন। বাঙালিরা এই শিল্পে বেশি যোগ দেয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। মুনলাইট সিনেমা হলের মালিক মোহাম্মদ সেলিমকে বলা যায় ঢাকার সিনে আর্টের পথিকৃৎ। তাঁর আদি নিবাস ছিল মুম্বাই। এরপর বলতে হয় আবদুল ওহাবের কথা। চেন্নাইয়ের লোক ছিলেন। দাদা আর্ট নামে সাইন করতেন তিনি।

 

সেই ত্রিশের দশক

ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে ঢাকার বিখ্যাত পেইন্টার ছিলেন গুলফাম ও গ্রিনবাবু। দেশভাগের পর গুলফাম এসেছিলেন ভারত থেকে, অন্যদিকে গ্রিনবাবু পুরান ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। পরবর্তী সময়ে যাঁরা ব্যানার এঁকেছেন, তাঁদের গুরু ছিলেন এই দুজন। অনেক সময় চারুকলার শিক্ষার্থীরাও ব্যানার আঁকার কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে নিতুন কুণ্ডু, আজিজুর রহমান, অলোকেশ ঘোষ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পরিচালক সুভাষ দত্তও ব্যানার পেইন্টের কাজ করেছেন। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এই শিল্প সিনেমার প্রচারে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছে। ডিজিটাল ব্যানার আসার পর এই শিল্পে বিরাট ধস নামে। কোনোমতে টিকে থাকা চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সবই বন্ধ হয়ে যায়। ২০০২ সালের পর ঢাকায় সিনেমার ব্যানার তৈরির আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। শিল্পীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের পোর্ট্রেট এঁকে এক রকম টিকে আছেন।

 

পাপ্পুর দোকান

এখনো সিনেমার ব্যানার আঁকেন পাপ্পু। সিনেমা হলের জন্য নয়, শৌখিন মানুষ শখ করে কিনে বাসায় ঝুলিয়ে রাখেন পাপ্পুর আঁকা ব্যানার। পাপ্পুর জন্ম ১৯৬২ সালে, ঢাকার নবাবপুরে। সেটি ছিল তাঁর নানাবাড়ি। বাবা মুম্বাই থেকে ব্যবসা করতে এ দেশে এসেছিলেন। পরে বিয়ে করে স্থায়ী হয়ে যান। করতেন পানের ব্যবসা। পাকিস্তানে পান পাঠাতেন, আনতেন কাপড়। পাপ্পুর মামা ছিলেন সিনেমার ব্যানার পেইন্টার। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে খাবার দিতে যেতেন মামার দোকানে। সেখান থেকেই এই শিল্পের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। ক্যানভাসে লাল-হলুদ-সবুজ দেখে সিনেমার ভক্ত বনে যান পাপ্পু। কিশোর বেলায়ই ব্যানার আঁকার কাজে লেগে যান। তারপর দিন দিন পেশাদার সিনেমার ব্যানার আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ৪০ বছর একটানা সিনেমার ব্যানার এঁকেছেন। পাপ্পু প্রথম এঁকেছিলেন ওরা ১১ জন সিনেমার ব্যানার। এরপর রংবাজ, অবুঝ মন, দুই রাজকুমার, বেদের মেয়ে জোসনা, সোনার হরিণ, বধূসহ অনেক সিনেমার ব্যানার এঁকেছেন।

১৯৭৩ সাল। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে আসবেন। তাঁর জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নৌকা আকৃতির মঞ্চ করা হয়েছিল। সে মঞ্চ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন শিল্পী নিতুন কুণ্ডু। কাজ করেছিলেন পাপ্পুও। ২০১১ সালে চট্টগ্রামে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের ওপর একটি ওয়ার্কশপ করতে গিয়ে নতুন করে এই শিল্পের প্রেমে পড়েন। কয়েক বছর আগে শিল্পী রুহুল আমিন কাজলের আমন্ত্রণে এই শিল্প নিয়ে গিয়েছিলেন ডেনমার্কের কোপেনহেগেন। সেখানে সিনেমার ব্যানারের আদলে ছবি এঁকেছেন দেয়ালে, ব্রিজে, রাস্তায়। পেয়েছেন উচ্চ প্রশংসা।   

ছবি : লেখক

মন্তব্য