kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

অনেক গল্প জমা আছে তাঁর কাছে

তিনি আলোকচিত্রী। নাম গণেশ দাশ পিন্টু। চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্র তোলেন। তাঁর কাছে জমা আছে আশির দশকের অনেক গল্প। আছে নব্বইয়ের দশকের কথা। ছবি দিয়েই ধরে রেখেছেন গল্পগুলো। শুনে এসেছেন বিনয় দত্ত

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অনেক গল্প জমা আছে তাঁর কাছে

এফডিসির লোকেরা তাঁকে জি ডি পিন্টু নামে বেশি চেনে। প্রায় ২০০-র বেশি সিনেমায় কাজ করেছেন। সাদাকালো থেকে চলচ্চিত্র রঙিন হয়ে ওঠার সময়গুলো কাছ থেকেই দেখেছেন। শুরুর দিনগুলোয় বেশ কষ্ট করেছেন।

 

একজন পিন্টু

১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কলেরহাট গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা অমলেন্দু দাশ স্কুলশিক্ষক ছিলেন। গ্রামের সবাই স্যারের ছেলে বলে চিনত। তাঁরা তিন বোন, তিন ভাই। বাবা ছাড়া রোজগেরে আর কেউ ছিল না। শিক্ষকের বেতন আর কতই বা!  মা রেণুকা দাশ খুব হিসাব করে চালাতেন সংসার। ছেলে-মেয়েদের অভাব বুঝতে দেননি। পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়ে গেছেন বরাবর। পিন্টু ১৯৭৩ সালে কামিনী মজুমদার হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। তারপর বারৈয়ারহাট ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এইচএসসিতে। তবে বেশিদিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। আর্থিক সংকট চরমে পৌঁছেছিল। পিন্টুকে তাই চাকরির খোঁজে বের হতে হয়। কিন্তু এসএসসির পুঁজি দিয়ে চাকরি পাওয়া সহজ ছিল না। পিন্টু ঘুরতে ঘুরতে একসময় বগুড়া গিয়ে হাজির হন।

আলোকচিত্রী হয়ে ওঠা

বগুড়ায় বাহাদুর স্টুডিও। মালিকের নাম কামরুজ্জামান বাহাদুর। পিন্টু বাহাদুরে চাকরি নেন। বাহাদুর সাহেব শৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি মঞ্চনাটক লিখতেন, পরিচালনা করতেন। নাটকে অভিনয়ও করতেন।  তাঁর শিল্পমন পিন্টু মুগ্ধ করেন। পিন্টু ছবি তোলার কাজকর্ম শিখতে থাকেন মন দিয়ে। একসময় তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয়। আরো পরিচয় হয় আলোকচিত্রী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। বগুড়ায়ই বাড়ি ছিল নজরুল ইসলামের। তিনি বগুড়ায় এলে বাহাদুরে আড্ডা দিতে আসতেন। পিন্টুর সঙ্গে ভালো বনিবনা হয়ে যায়। পিন্টু ঢাকায় আসার কথা বলেন নজরুলকে। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে থাকবেন কোথায়? করবেন কী? এসব ভাবতে ভাবতেই ঢাকার পথ ধরেন পিন্টু। চলচ্চিত্রের তখন সুদিন। সারা দিনই ছবির শুটিং হয় এফডিসিতে, নয়তো কক্সবাজার, নয়তো আর কোথাও। আলোকচিত্রীদেরও তখন দাম ছিল। ঢাকায় গিয়ে নজরুলের বাসায় উঠলেন পিন্টু। খাওয়াও সেখানেই। নজরুল সঙ্গে করে এফডিসিতেও নিয়ে গেলেন। সেখানে অসীম হালদার, মিয়া জহির, ফিরোজ এস হাসান তখন নামি আলোকচিত্রী। তাঁরা পিন্টুকে সহযোগিতা করলেন। ছবি তোলার কায়দা-কানুনও শেখালেন। পিন্টু দেখলেন স্টুডিওতে ছবি তোলা আর চলচ্চিত্রের ছবি তোলায় ফারাক আছে। আজিজুর রহমান তখন ‘মায়ের আঁচল’ ছবি করছেন। স্থিরচিত্র তোলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম। তবে তখন এমন ছিল অবস্থা, একই দিনে হয়তো দু-তিনটি সিনেমার ছবি তোলার কাজ পড়ে যেত। নজরুল তাই পিন্টুকে কাজ ভাগ করে দিলেন। কিন্তু পিন্টুর যে ক্যামেরা নেই। নজরুলের ইয়াশিকা হান্ড্রেড টুয়েন্টি নিয়ে মায়ের আঁচলের সেটে যান পিন্টু। একটু ভয় লাগছিল। কিন্তু একসময় ঠিক হয়ে যান। একের পর এক ছবি তুলে গেছেন। উত্তেজনা ছিল।  রাতেই ডার্করুমে গেছেন। ফিল্ম ডেভেলপ করে ওই রাতেই প্রিন্ট করে নেন। নিজের তোলা ছবি দেখতে থাকেন। সেদিনটির কথা ভোলেননি পিন্টু। ভুলবেন না কখনো। পরদিন নজরুল ছবিগুলো দেখে বাহবা দিয়েছিলেন।

সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল

জিয়াউদ্দিন মাসুদের চলচ্চিত্র ‘মানিক রতন’। এই ছবিতে পিন্টু আর সহযোগী নন, আলোকচিত্রী হিসেবেই কাজ শুরু করেন। ওয়াসিম, অঞ্জু ঘোষ, প্রবীর মিত্র ছিলেন ছবির পাত্র-পাত্রী। তখনো কিন্তু পিন্টুর নিজের ক্যামেরা ছিল না। নজরুলের ইয়াশিকাই ছিল ভরসা। ছবি তুলতে তুলতে পিন্টুর তখনকার সুপারস্টার অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। ভালো সম্পর্ক হয় রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, শাবানার সঙ্গেও।

ছবি থেকে ভিউকার্ড

তখন চলচ্চিত্রের পরিচালকরা গানের দৃশ্যগুলো আলাদা করে শুটিং করতেন। গানের শুটিংয়ে চলচ্চিত্রের আলোকচিত্রীরা কাজে আসতেন বেশি। কারণ ওইসব ছবি দিয়েই চলচ্চিত্র পরিচালক, পরিবেশক বা হল মালিক চলচ্চিত্রের পোস্টার ও অন্যান্য পাবলিসিটি ম্যাটেরিয়াল বানাতেন। এরপর ছবিটি রিলিজ হলে আলোকচিত্রীরা পুরো অ্যালবাম নিয়ে আজাদ প্রোডাক্টস বা আরো প্রতিষ্ঠানে নিয়ে বিক্রি করে দিতেন। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ছবি দিয়ে ভিউকার্ড বানাত। তখন ভিউকার্ডের বাজারও বড় ছিল। পিন্টু মায়ের আঁচল ছবির পুরো অ্যালবাম আজাদ প্রোডাক্টসের কাছে বিক্রি করেছিলেন প্রায় ১০ হাজার টাকায়। আশির দশকে ১০ হাজার টাকা তো অনেক।

পিন্টুর আরো ছবি

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘স্নেহ’, ‘আম্মা’, ‘পরাধীন’, ‘আর্তনাদ’, কাজী মোরশেদের ‘ঘানি’, সোহানুর রহমান সোহানের ‘রণাঙ্গন’, জামশেদুর রহমানের ‘লাভ লেটার’, ‘আমার প্রেম আমার অহংকার’, কাজী হায়াতের ‘ত্রাস’, ‘পাগলী’, ‘চাঁদাবাজ’ ইত্যাদি মিলিয়ে ২০০ ছবিতে কাজ করেছেন পিন্টু। শেষ করেছেন রায়হান রাফির ‘দহন’ ছবিতে। ছবিটি এখনো মুক্তি পায়নি।

 

পরিবার ভবিষ্য ভাবনা

চলচ্চিত্রে এখন আগের মতো আলোকচিত্রীর কাজ নেই। পিন্টুর স্ত্রী শিউলী মিত্র একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তাই তাঁদের সংসার চলে যায় এক রকম। তাঁদের তিন মেয়ে—জয়ন্তিকা দাশ বাংলা, আদৃতা দাশ ভাষা ও প্রনিধী দাশ ডোনা। একটিমাত্র ছেলে। নাম ঋক্ষম দাশ। পিন্টু নিজে উচ্চশিক্ষিত হতে পারেননি। কিন্তু সন্তানদের বেলায় কোনো কার্পণ্য করছেন না। চাইছেন তাঁদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে। জয়ন্তিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। আদৃতা পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে সমাপনী বর্ষে। প্রনিধী মণিপুরি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নার্সারিতে পড়ছে। আর ঋক্ষম মনিপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে-মেয়ের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেননি। তারা নিজেদের মতো পেশা বেছে নিচ্ছে অথবা নেবে। পিন্টু এখন স্থিরচিত্র গ্রাহক সমিতির সভাপতি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ দায়িত্ব তিনি পালন করে যাচ্ছেন। সমিতিতে নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে সদস্য ৮২ জন। তিনি এখন চাইছেন যেন আলোকচিত্রীরা সম্মান পায়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে স্থিরচিত্র গ্রাহকরা পুরস্কার পায় না। এটি তাঁকে পীড়া দেয়। তিনি চান, এফডিসির উদ্যোগে সব চলচ্চিত্রের আলোকচিত্র যেন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়।

অর্থের জন্য জীবনের শুরুতে কাজের পেছনে ছুটলেও অর্থের অভাব যে মিটিয়ে নিতে পেরেছেন তা নয়, তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। এখনো ভালো কোনো ছবির খবর এলে নিজ থেকে খোঁজ নেন। পিন্টুর আশা, একদিন আবার চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরবে।

চেয়েছি যেন আমার কাজগুলো থেকে যায়

কেন আলোকচিত্রী হলেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে। ১০০ বছর পরে কেউ একজন কী ভাবছেন, তা তিনি ওই সময়ে লিখে গেছেন। তাই আমি আলোকচিত্রী হতে চেয়েছি, যেন আমার কাজগুলো থেকে যায় এবং দর্শক যেন আমার কাজগুলো দেখতে পারেন।

 

চলচ্চিত্রে ছবি এত গুরুত্ব কেন পেত?

যেহেতু রিলে শুটিং হতো, তাই সহজে আউটপুট দেখা যেত না সে সময়। একমাত্র ভরসা ছিল স্থিরচিত্র। নায়ক-নায়িকাদের স্ক্রিনে দেখতে কেমন লাগছে তা জানা জরুরি ছিল, তাই প্রথম দিন শুটিং শেষে যেসব ছবি উঠত, তা দেখেই পরদিন নায়ক-নায়িকারা নিজেদের মেকআপ বা পোশাক পরিবর্তনের কথা ভাবতেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্রগ্রাহকের ছবি দেখে সেই সময় হল মালিকরা হল বুকিং করতেন। হল মালিকরা দেখতেন, এই চলচ্চিত্রে কে আছেন? অঞ্জু নাকি শাবানা? রাজ্জাক নাকি আলমগীর? বড় কাস্টিং মানে চলচ্চিত্রের রমরমা ব্যবসা। তাই পরিচালকরা বিশেষভাবে ছবিগুলো তুলতে বলতেন, যাতে হল মালিকরা সন্তুষ্ট হন।

 

কেন আলোকচিত্র সংরক্ষণ জরুরি?

বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক হীরালাল সেন একজন চিত্রগ্রাহক ছিলেন। অথচ তাঁর তোলা ভালো কোনো আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা হয়নি। এই বিষয়টি আমাকে খুব পীড়া দেয়।  আমি তাই চলচ্চিত্রের ছবিগুলো সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিয়েছি, যেন দেশি তারকাদের ভালো ভালো আলোকচিত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখতে পায়।

 

আলোকচিত্রগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

আমি ও আমার দুই শাগরেদ শাহ সুলতান ও এস আই শহীদ মিলে আলোকচিত্রগুলো সংরক্ষণ করছি। আমাদের কাছে প্রায় ৪০-৪৫ জন আলোকচিত্রীর ১৫০০-২০০০ আলোকচিত্র আছে। এসব আলোকচিত্র আগে প্রতিবছর বিভিন্ন দিবসে প্রদর্শনী করতাম, পরবর্তী সময়ে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে প্রদর্শনী শুরু করি।

প্রতিবছর ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস উপলক্ষে এফডিসিতে আমরা আমাদের সব আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করি, যাতে করে সবাই দেখতে পারেন। এই বছর আমরা স্থিরচিত্রগ্রাহক সমিতি থেকে ২১তম আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। যত দিন আমি বেঁচে আছি, তত দিন এই প্রদর্শনী চলবে আশা করি।

মন্তব্য