kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

আজ আমরাও

সাকিয়ার বাংলাদেশ

সাকিয়া হক একজন চিকিৎসক। স্কুটিতে করে ৬৪ জেলা বেড়িয়েছেন। প্রজনন স্বাস্থ্য, বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা আর নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলেছেন বেড়াতে বেড়াতে। মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাকিয়ার বাংলাদেশ

শিক্ষিকা জিজ্ঞেস করলেন, ‘বল তো, ম্যালেরিয়া কোথায় বেশি হয়?’

সাকিয়া বলেছিলেন, ‘বান্দরবানে।’

শিক্ষিকা আবার জানতে চাইলেন, ‘বল তো, বান্দরবান কোন দিকে?’

সাকিয়া বললেন, ‘উত্তর দিকে।’

ব্যস ক্লাসে সবাই হেসে ফেলল। সাকিয়া লজ্জা পেয়েছিলেন সেদিন। সাকিয়া পরদিনই মানচিত্র নিয়ে বসে গিয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, শুধু বান্দরবান নয়, ৬৪ জেলাই দেখে ছাড়বেন; কিন্তু ব্যাপারটি সহজ ছিল না, যতটা সহজ ভেবেছিলেন। ছুটিছাটা, টাকা-পয়সা জোগাড়, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় তাঁকে বেঁধে রাখতে চাইছিল। যাহোক, একটু একটু করে সব কিছু সামলে নিয়ে ৩৫টি জেলা বেড়ালেন ২০১৭ সালে আর কিশোরগঞ্জ দিয়ে ৬৪টি পূর্ণ করলেন এই মার্চে।

 

প্রশ্ন ছিল অনেক

প্রথম বাধাটা ছিল পরিবার থেকেই। কোথায় যাবে, কতজন সঙ্গে যাবে—এ রকম অনেক প্রশ্ন ছিল পরিবারের পক্ষ থেকে। সঙ্গী আসলেই দরকার ছিল। তাই সাকিয়া অনেককেই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। শেষে রাজি হলেন বন্ধু মানসী সাহা। তিনিও চিকিৎসক। দুজন মিলে গড়ে তোলেন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। একসময় যুক্ত হলেন সিলভী রহমান ও শামসুন্নাহার সুমা। তাঁদের দেখে পরিবার আশ্বস্ত হলো, অনুমতি মিলল।

 

মানুষের জন্য বেড়ানো

ভ্রমণ বলতে সাধারণত দর্শনীয় স্থান দেখা আর মশহুর খাবারের স্বাদ নেওয়া বোঝায়। সাকিয়া কিন্তু এখানে ব্যতিক্রম। সাকিয়া ও তাঁর বন্ধুরা বেড়াতে যাওয়া জেলাগুলোর স্কুল-কলেজের খবর নেন। পথে কোনগুলো পড়বে আর কোনগুলোতে যাওয়া বেশি জরুরি তার একটি তালিকা তৈরি করেন। ভ্রমণকালে সেগুলোতে গিয়ে খাদ্য, পুষ্টি, বয়ঃসন্ধি, সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেন। প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেন। কোথাও কোথাও সাকিয়ারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও কথা বলেছেন। তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষামূলক চলচ্চিত্রও প্রদর্শন করেন। পাবনায় গিয়ে তাঁরা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজে সীমাবদ্ধতা থাকায় নারীরা সব কথা খুলে বলতে পারেন না। নারী হয়ে নারীর কাছে বলতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন বলে মনে হয়। এই ভ্রমণকারী দলটিকে তাই আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’

 

ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ

সাকিয়া আর মানসী দুজনেই বাল্যবন্ধু। অষ্টম শ্রেণি থেকেই তাঁরা একসঙ্গে আছেন। মেডিক্যাল কলেজেও তাঁরা সহপাঠী। ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ তাঁরা গড়ে তুলেছেন ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর। গোড়ায় তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নারীদের ভ্রমণে উৎসাহিত করা। ফেসবুকে এখন দলের সদস্যসংখ্যা ২৭ হাজারের বেশি। সাকিয়া দলের সভাপতি। সাকিয়ারা মনপুরা, বগালেক, সাজেক, সেন্টমার্টিন, নাফাখুম, সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গল, কুয়াকাটা, কক্সবাজার, মহেশখালীসহ দেশের প্রায় সব জায়গায় নারীদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কম খরচে ও নিরাপদে যেকোনো নারী ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সঙ্গে বেড়াতে পারেন। জান্নাতুল তাসনিম নামের এক পর্যটক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি সাজেক গিয়েছিলাম ট্রাভেলেটসের সঙ্গে। খুব গোছানো আয়োজন ছিল। আমার ভালো লেগেছে।’

 

সাকিয়ার ছবি দেখে

সাকিয়া ভালো ছবিও তুলতে পারেন। ২০১৬ সালের আগস্ট মাস ছিল। সাকিয়া নিজের তোলা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্যের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন সুইজারল্যান্ডের মেয়ে করিনা টমাশেট। করিনা বাংলাদেশ দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। সাকিয়াকে তা জানিয়েও দেন। সাকিয়া সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন আর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন নারায়ণঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জসহ আরো অনেক জায়গা। বিদায় নেওয়ার সময় করিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি সুন্দর দেশ। মানুষ খুব বন্ধুবৎসল।’ সাকিয়াকে তিনি অনেক ধন্যবাদ জানান।

 

আগামী দিন

চিকিৎসক হওয়া সাকিয়ার স্বপ্ন ছিল। চিকিৎসক তিনি হয়েছেন। আর দেশ বেড়ানোর স্বপ্নও পূরণ হলো এবার। বলছিলেন, ‘খুব শান্তি লাগছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন যেমন ছিল, ৬৪টি জেলা বেড়ানোর স্বপ্নও ছিল। দুটিই পূরণ হয়েছে। মনে হচ্ছে এক জীবনে অনেক পেয়ে গেছি। আমার আর বেশি কিছু চাওয়া নেই। সামনের দিনগুলোয় মানবকল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।’

মন্তব্য