kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

বিশ্ব বিচিত্রা

বন্দুক বাজার

শাক-সবজি, মাছ-গোশত নয়, এ বাজারে পাওয়া যায় অস্ত্র। তিন হাজার দোকান আছে দারা আদমখেল বাজারে। তাই ছোট বলা যায় না একেবারে। আহমেদ বায়েজীদ খবর পেয়েছিলেন

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বন্দুক বাজার

দোকান না বলে ওয়ার্কশপ বলাই ভালো। মেঝেতে ছোট ছোট কয়েকটি মেশিন বসানো। কোনটিতে লোহা কাটা হয়, কোনোটি দিয়ে লোহা ফুটো করা হয়। একপাশে বসে আরেকজন লোহা ঘষামাজা করছে। কিতাব গুল এ দোকানের মালিক। বয়স তাঁর পঁয়তাল্লিশ। এলাকায় কিতাবের দোকানের নামডাক আছে। তুরস্ক ও বুলগেরিয়ায় তৈরি অটোমেটিক এমপি-ফাইভ সাবমেশিন গান একেবারে হুবহু তৈরি করতে পারেন কিতাব। ইউরোপের বাজারে এ রকম অস্ত্র কয়েক হাজার ডলারে বিক্রি হয়। কিতাব বিক্রি করেন মাত্র ৬৭ মার্কিন ডলারে। এক বছরের গ্যারান্টিও দেন। তিনি দাবি করেন, আসলটির মতোই নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করতে পারে তাঁর তৈরি অস্ত্র। কেউ কিনতে চাইলে দোকানের পেছনের ছোট্ট একটি মাঠের মতো জায়গায় নিয়ে যান গুল। সেখানে একটি ফায়ারিং রেঞ্জে অস্ত্র যাচাই করে তারপর বেচাকেনা চলে।

 

কিতাব গুল

আছে হাজারখানেক

কিতাব গুলের মতো কয়েক হাজার দোকানদার আছেন বাজারটিতে। প্রকাশ্যেই এখানে অস্ত্র তৈরি ও বেচাকেনা চলে। এটি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ছোট্ট শহর দারা আদমখেল। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মধ্যে। পশতুন আর আফ্রিদিরা এখানকার বাসিন্দা। দারা আদমখেলও আফ্রিদিদের একটি শাখা নৃগোষ্ঠী। এর চারদিক পাহাড়বেষ্টিত। পেশোয়ার থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এ শহর। এখানকার কর্মক্ষম প্রায় সব পুরুষ অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত। অনেকে এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবৈধ অস্ত্রের বাজার বলেন। সাদা পাহাড়ের পাদদেশে দুই বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে এই অস্ত্রের বাজার। দোকানগুলোর বেশির ভাগই একতলা, কোনোটি বা দুইতলা। কালাসনিকভ সিরিজের যেকোনো রাইফেল, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এম-১৬ অটোমেটিক রাইফেল কিংবা চায়নিজ পিস্তল—সবই পাওয়া যায় এখানে। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যরা যে এম-১৬ রাইফেল নিয়ে টহল দেয়, তা এখানে পাওয়া যায় মাত্র তিন হাজার পাকিস্তানি রুপিতে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তার দাম কয়েক হাজার ডলার। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে তৈরি যেকোনো হ্যান্ডগান নিয়ে হাজির হলে দু-এক দিনের মধ্যেই তার নকল তৈরি করে দিতে পারে এখানকার লোক।  কিতাব গুল জানান, তিনি গত ১০ বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার রাইফেল বিক্রি করেছেন। কোনো ক্রেতাই অভিযোগ নিয়ে আসেননি।

 

দারা আদমখেল

বয়স এক শর বেশি

১৮৯৭ সালে এই বাজারের যাত্রা শুরু। পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলো নিজেদের শক্তি বাড়াতে নিজেরাই অস্ত্র তৈরিতে লেগে যায়। বন্দুক তাদের সংসৃ্কতির অংশও। যেমন—পশতুন পুরুষদের সুনাম নির্ভর করে বন্দুক চালানোর দক্ষতার ওপর। এ অঞ্চলের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আলগা। এখানে চোরাই গাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট সবই পাওয়া যায়। এশিয়ার অন্য সব দেশের মতোই পাকিস্তানেও অস্ত্র তৈরি ও কেনাবেচা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ব্যতিক্রম শুধু এই দারা আদমখেল।

১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময় এই অস্ত্রের বাজারটি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আফগান মুজাহিদদের ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় অংশ সরবরাহ করত দারা আদমখেল।  পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ, তালেবান শাসন ও পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় তালেবানের শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়ায় অস্ত্রের বাজারটির সুদিন দীর্ঘায়িত হয়।

বংশপরম্পরায় এই কাজের সঙ্গে জড়িত এখানকার দোকান মালিকরা। ৬৭ বছর বয়সী বানাত খান বলেন, ‘আমার দাদা, তারপর বাবা, এখন আমি এই কাজ করছি। আমার সন্তানরাও এই কাজের সঙ্গেই জড়িত।’

প্রত্যেক দোকানেরই রয়েছে আলাদা শুটিং রেঞ্জ, যেখানে ক্রেতারা অস্ত্র কেনার আগে গুলি চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। এখানকার কাঁচামাল, বিশেষ করে লোহা আসে করাচির জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। কোনো দোকানে পিস্তল বানানো হয়, কোনোটিতে শুধুই রাইফেল। আবার কেউ দুটিই বানাতে পারেন। কোনো দোকানে তৈরি করা হয় গুলি। তৈরির পর অস্ত্রগুলো দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়। বাজারজুড়ে সারা দিনই বিভিন্ন মেশিন আর কামারের দোকানের মতো লোহা পেটানোর শব্দ পাওয়া যায়। বাতাসে গানপাউডারের গন্ধ নাকে লাগবে এলাকাটিতে ঢুকলেই। এলাকাটিতে বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশে রয়েছে কড়াকড়ি।

 

এখন সময় বদলেছে

খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর এলাকাটিতে  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ি বেড়েছে। ক্রমেই এলাকাটিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। আবার অব্যাহত সেনা অভিযানে পাকিস্তানি তালেবান প্রায় নির্মূল হওয়ার কারণে অস্ত্রের ব্যবসায় ধস নেমেছে। একসময় সাত হাজারের বেশি অস্ত্রের দোকান ছিল বাজারটিতে, এখন তিন হাজারে নেমে এসেছে। এ নিয়ে হতাশায় আছেন দোকান মালিকরা। পড়াশোনা জানেন না, পারেন না অন্য কোনো কাজ; তাই এ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে কিভাবে দিন কাটবে তা জানেন না অনেকেই। এক ব্যবসায়ী জানান, আগে দিনে ১০টি রাইফেল তৈরি করতেন, এখন তা চারটিতে নামিয়ে এনেছেন। কারণ বিক্রি কমে গেছে। অনেক দোকানদার অস্ত্রের ব্যবসা ছেড়ে মুদি দোকান শুরু করেছেন।

সূত্র : এএফপি ও আলজাজিরা

মন্তব্য