kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

সরেজমিন

কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার

কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারটি সাভারে। লোকে চেনে ডেইরি ফার্ম নামে। মাসুম সায়ীদ এক বিকেলে দেখতে গিয়েছিলেন

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার

অদ্ভুত স্নিগ্ধ বিকেল। গত রাতের ভারি বর্ষণের ফল। মেহগনি, নিম আর কড়ই গাছের সদ্য গজানো খয়েরি মলমলে পাতা থেকে পিছলে পড়ছে রোদ। এ হাতছানি এড়ানো গেল না। ফটক ছাড়িয়ে আমরা পা বাড়ালাম। আমি আর মারুফ।

 

ঘাসবন

মূল ফটকের বাঁয়ে সবুজ দালানটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। ডানে ঘাসবন। বেশ অনেকটা জায়গাজুড়ে। ঘাসগুলো উঠে গেছে কোমর ছাড়িয়ে মানুষের বুক পর্যন্ত। এর নাম নেপিয়ার। এর রস খেতে মিষ্টি, তাই গরুদের পছন্দের খুব। আর পুষ্টিকরও। তারপর একটি স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি। এখানে ফলানো হয়েছে দুধেল গাভির বিশেষ খাবার—জার্মান ঘাস। এটা খাওয়ালে গাভি দুধ বেশি দেয়।

 

বিষণ্ন ডাকবাক্স

ঢাল বেয়ে উঠলেই কাঁঠাল বন। তার ছায়ায় পুরনো আমলের একতলা হলুদ দালান। এটা চিকিৎসাকেন্দ্র। এরই একটি কক্ষে এখানকার ডাকঘর। বারান্দার পিলারে ঝোলানো ছোট লাল ডাকবাক্সটি। আজকাল হয়তো দরকার হয় না খোলার। তবু ডাকঘর বলে কথা। তার উল্টা পাশেই বিক্রয়কেন্দ্র। বিক্রির সময় হলেই লম্বা লাইন পড়ে যায় দুধের জন্য। চিকিৎসাকেন্দ্রের পর হলদে রঙের প্রশাসনিক ভবন। এখানকার সব থেকে বড় দালান এটা। সামনে ফুল বাগান। বেশ বড়ই।

 

জলের বাধা পেরিয়ে

বাগান ছাড়িয়ে গেলেই রাস্তার ওপর একটি লোহার খিড়কি। তার নিচে রাস্তা পুরোটা পানিতে ডোবা। যেন খানখন্দে জমে আছে পানি। যেতে হবে রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত ধরে। তাতেও সামান্য পানি। লাল বর্ণ তার। কোনো একটা ওষুধ মেশানো পানি। এটা আসলে পথচারীর পায়ের জুতা জীবাণুমুক্ত করার একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। নোটিশ বোর্ডে লেখা আছে কথাটি। আমরা জুতার তলা ভালো করে ভিজিয়ে ওপারে গেলাম।

 

শেডের পর শেড

এখান থেকেই শুরু হয়েছে গরুর শেড। পুবে-পশ্চিমে লম্বা লম্বা একেকটা শেড। উত্তর-দক্ষিণে মুখ করা দুই সারি করে গরু। মাঝখানে পথ। গরুগুলোর কানে ঝুলছে পিতলের গয়না।  না, গয়না নয়। এটা তাদের চিহ্ন। এরা কেউ-ই পরিচয়হীন নয়। নাম না থাকুক, নম্বর আছে। পরিচয়পত্রও আছে। কোনো কোনো শেডে চলছে দুধ দোহানোর কাজ। কোনোটা মেশিনে। কোনোটা হাতে। দোহানো দুধ বোতলের মতো বড় কনটেইনারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিক্রয়কেন্দ্রে। শেডগুলোর সামনে বেশ বড় মাঠের মতো খানিকটা জায়গা পাকা করা। এখানে শক্ত ডাঁটাসহ লম্বাঘাসগুলোকে ছোবড়ানো হয়। আজকের মতো শেষ হয়ে গেছে কাজটা। পাশেই পড়ে আছে কলটা। যেন একটা উট। মাটিতে শুয়ে লম্বা গলা দিয়ে বাতাস থেকে টেনে আনছে জলকণা। তার অদূরে ছোবড়ানো ঘাস বহন করার গাড়ি।

 

বিজ্ঞাপনের মতো

ওই শেডগুলো ছাড়িয়ে সোজা দক্ষিণে ফ্রিজিয়ান গাভিগুলোর শেড। এদের গায়ে সাদার ওপর কালো কালো ছোপ। কুঁজহীন সোজা পিঠ। আকারেও বেশ বড়। ঠিক বিজ্ঞাপনে যেমন দেখি। এরা শীতপ্রধান দেশের। গরম সহ্য করতে পারে না মোটেই। তাই রাখতে হয় বেশ যত্ন করে। রাতের বেলায় খোলা থাকে আঙিনায়। দিনে শেডের নিচে মাথার ওপর ঘোরে পাখা।

 

বাছুরের আস্তানা

ঘাস ভাঙানোর জায়গাটার লাগোয়া বাছুরের একটা আস্তানা। এখানে রাখা হয় ৩০ থেকে ৬০ দিন বয়সী বাছুরগুলো। পূর্ব পাশে শেডের ছায়ায় বসে আছে তিনজন—ওমর আলী, জাকির হোসেন আর আব্দুস সামাদ। ওমর আলী আছেন ৪২ বছর ধরে। কাজ ওই একটাই—বাছুর তদারকি। এখন অল্প কিছুদিন বাকি অবসরের। ওমর আলীর কাছেই জানলাম জন্মের পর একটা বাছুর মায়ের সঙ্গে থাকে মাত্র পাঁচ দিন। তারপর সরিয়ে নেওয়া হয় ভিন্ন একটা শেডে। সেখানে থাকে ৩০ দিন। তারপর বাছুরগুলো চলে আসে তাদের শেডে। এখানে ৬০ দিন থাকার পর চলে যায় অন্য শেডে। তারপর শ্রেণিমতো বিভিন্ন শেডে।

 

বুল শেডের দৈত্যগুলো

বাছুরের আস্তানার পর ফার্মের কারখানা। আঙিনায় পড়ে আছে অকেজো অনেক যন্ত্রপাতি। একটা তেলের পাম্পও আছে। এর উত্তর পাশে খড়ের স্তূপ। ইটের পাঁজার মতো লম্বা উঁচু খড়ের আঁটির পাঁজা। পলিথিনে ঢাকা। এর পরই প্রজননকেন্দ্র। কেন্দ্রের উত্তর-দক্ষিণ দুই পাশেই ষাঁড়ের আস্তানা। এটা সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা। খুব কাছে যাওয়ার নিয়ম নেই। তাই আমরা দেখে চললাম দূর থেকেই। পৃথিবীর উন্নত সব জাতের ষাঁড়। আকারে বিশাল। কোনো কোনোটা গণ্ডার কিংবা জলহস্তিকেও হার মানায়। এখানে সব থেকে বড় ষাঁড়টার ওজন ১০৫০ কেজি। ফ্রিজিয়ান জাতের। বুকটা টান করে মাথাটা উঁচু করে যখন দাঁড়ায়, তখন সমীহ না করে পারা যায় না। কিছুদিন আগেই উদ্বোধন করা হয়েছে আরো দুটি নতুন শেডের।

 

জাহাঙ্গীরের টান

গরুগুলোকে রাতের খাবার খাওয়ানো শেষ করতে হয় সন্ধ্যার আগেই। জাহাঙ্গীর আলম আর মেহেদী হাসান সেই আঞ্জামটাই করছে। গাড়ির খাঁচা থেকে একজন ঘাস নামিয়ে দিচ্ছে ট্রলিতে। আর ট্রলি ঠেলে শেডের কাছে নিয়ে যাচ্ছে মেহেদী। ট্রলি থেকে পরিমাণমতো ঘাস ষাঁড়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর। সবগুলোর সামনে এক পাঁজা এক পাঁজা করে ঘাস রেখে যাচ্ছিল সে; কিন্তু একবারে শেষ মাথায় এসে একটাকে দিল দুই পাঁজা ঘাস। ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতেই হেসে ফেলল জাহাঙ্গীর। কারণটাও ব্যাখ্যা করল। এর পেটটা সব সময় পড়ে থাকে নিচে। দেখে মায়া লাগে। এ রকম আরো দুটি আছে।

 

পরিত্যক্ত ভাগাড়

পরিত্যক্ত ভাগাড়

ওই তো ভাগাড়—হাত তুলল মারুফ। মারুফের আঙুল ছুঁয়ে আমার দৃষ্টি আটকে গেল শ্মশানের চিমনির মতো একটা চুঙির ওপর। ওটা দাঁড়িয়ে আছে ইটের গোল ভিতের ওপর। এগিয়ে গেলাম কাছে। অনেক আগে থেকেই এটা পরিত্যক্ত। কোনো মৃত গরু এখন আর পোড়ানো হয় না। পোস্টমর্টেম করার পর দেওয়া হয় মাটিচাপা। পাশেই একটা শিমুলগাছে ফুল ফুটেছে। প্রতিবছরই ফোটে। কে জানে এখানে পুড়িয়ে দেওয়া গরুগুলোর কথা তার মনে পড়ে কি না!

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য