kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

এমআইটির এম এইচ চৌধুরী

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মিজানুল হক চৌধুরী। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) জিরো রোবটিক্স ল্যাবের সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যান্ড আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত। কিছুদিন আগে দেশে এসেছিলেন। পিন্টু রঞ্জন অর্ক তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এমআইটির এম এইচ চৌধুরী

এমআইটিতে সহকর্মীদের সঙ্গে (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)

একজন মিজানুল হক চৌধুরী

মিজানুল হক চৌধুরী একজন যন্ত্র প্রকৌশলী। ১৯৮৬ সালে বুয়েট থেকে পাস করে বেশ কিছুদিন পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ করেন। ১৯৯১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা যান। ১৯৯৩ সালে ন্যাচারাল গ্যাস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম এস ডিগ্রি নেন। বছর ছয়েক আমেরিকার তেল ও গ্যাস কম্পানিতে চাকরি করার পর ক্যারিয়ার গড়েছেন সফটওয়্যার ডেভেলপার ও সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট হিসেবে। এমআইটিতে যোগ দেন ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। ২০১৬ সালে টেক্সাসের এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কিনোট স্পিকার হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। একই বছর আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড আর্কিটেক্টস তাঁকে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর নামে দুটি প্যাটেন্ট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। তিনি আঁকাআঁকি আর সংগীতচর্চাও করেন। তাঁর আঁকা একটি ছবি আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের কাছে আছে। তাঁর স্ত্রী জেসমিন চৌধুরীও একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। একমাত্র মেয়ে সাবা জেবিন চৌধুরী কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে এখন নিউ ইয়র্ক স্টেট সাইকিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটে সিনিয়র এপিডেমোলজিস্ট হিসেবে কর্মরত।

 

সমস্যার সমাধান করতে পারাটা স্মার্টনেস

একজন মিজানুল হক চৌধুরী

ঢাকায় স্ত্রী-স্বজনদের সঙ্গে মিজানুল হক চৌধুরী (ডান থেকে দ্বিতীয়)

কখন থেকে রোবট নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়?

আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বাংলাদেশ মাত্র স্বাধীন হয়েছে। রায়েরবাজারে কয়েকটি ভাঙ্গারির দোকান ছিল। প্রায়ই যেতাম। খুঁজে খুঁজে কিছু জিনিস জোগাড় করেছিলাম। সেগুলো দিয়ে একটি রোবট কার তৈরি করেছিলাম। গাড়িটি চলতে গিয়ে কোনো বাধা পেলে নিজে থেকেই গতিপথ বদলাতে পারত। ক্লাস সেভেন পড়ার সময় একটা টেলিস্কোপও বানিয়েছিলাম। তখন লেন্স বেশি পাওয়া যেত না। টেলিস্কোপটির লেন্সও আমি বানিয়েছিলাম। তারপর করেছিলাম একটি মাইক্রোস্কোপ।

 

এমআইটিতে গেলেন কিভাবে?

ডালাসে ছিলাম ২২ বছর। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ একটি কম্পানিতে কাজ করতাম। এক দিন আমার মেয়ে এসে বলল, ‘বাবা, আমি হার্ভার্ডে যাচ্ছি রিসার্চ করতে।’ একমাত্র মেয়ে। তখন চাকরিবাকরি সব রেখে ওর সঙ্গে চলে গেলাম বোস্টনে। এরপর এক দিন আমার স্ত্রী বলল, ‘তুমি এমআইটিতে অ্যাপ্লাই করো না কেন?’ হাসি দিয়ে বললাম, ‘ওরা কেন আমাকে নেবে?’ শেষ পর্যন্ত আমার হয়ে আমার স্ত্রী অ্যাপ্লাই করল। ডাকও পেলাম। ওরা আমার ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল দেখে অবাক হয়েছিল। আমি যে ছবি আঁকতে পারি আর গানও গাই, তাতে ওরা আনন্দ পেয়েছিল।

যাহোক তখন ওরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কতগুলো বিষয় পরীক্ষা করার কথা বলেছিল; যা খুবই ব্যয়বহুল।

আমি বললাম, পরীক্ষাগুলো আমি ল্যাবে করার পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি। এখানে ৯৫ শতাংশ সফল হলেই তোমরা স্পেসে পরীক্ষা করে দেখতে পারো। বুদ্ধিটা ওদের মনে ধরল। বলল, ‘তোমাকে তিন মাস সময় দেওয়া হলো।’

আমি ওদের দেওয়া সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পেরেছিলাম। খুশি হয়ে বলল, ‘ওকে, তুমি আমাদের সঙ্গে কাজ করো।’ আমাকে ওরা হায়ার করেছে সিনিয়র পজিশনে। ওই কাজটির জন্য এমআইটি ল্যাবের খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ২০১৭ সালে এই অভিনব উদ্যোগের জন্য এমআইটি আমাকে ‘স্পেশাল রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছিল।

 

এখন তো জিরো রোবটিক্স প্রকল্পে কাজ করছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন?

এটা এমআইটি স্পেস সিস্টেম ল্যাবের একটি প্রকল্প। ২০০৬ সালে শুরু। অনেক জটিল বিষয় নিয়ে এখানে গবেষণা হয়। একটা যেমন—মহাকাশে প্রতিদিনই স্যাটেলাইট ও নভোযান পাঠাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এগুলোর একটি মেয়াদকাল আছে। মেয়াদ শেষে এগুলো কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এতে স্পেসে জ্যাম লেগে যাচ্ছে। ফলে নতুন স্যাটেলাইটের জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এগুলো বাড়তে থাকলে দেখা যাবে একসময় পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছাবে না। ভাবুন ব্যাপারটি কতটা ভয়াবহ। আমরা এগুলোকে একটি ট্র্যাশবিনে ফেলার উপায় খুঁজছি। এ রকম প্রকল্প আরো আছে। আমাদের ল্যাবে একটি টেবিল আছে। এর ওপর দুটি স্যাটেলাইট মুভ করানো যায়। নানা রকম পরীক্ষা চালাই আমরা স্যাটেলাইট দুটির ওপর। যেমন—আমরা একটি টেস্ট করছি স্পেসে তরল পদার্থের আচরণ বিষয়ে। এসব গবেষণা নিয়ে আমরা গেম বানাই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশুদের খেলতে দিই। খেলাচ্ছলেই তারা মহাকাশসংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধান বের করে। এই প্রগ্রামটাই জিরো রোবটিক্স। এর মাধ্যমে আমরা কিন্ডারগার্টেন থেকে হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত শেখাতে পারছি।

 

কারা এতে অংশ নিতে পারে?

এটা একটা গেমনির্ভর প্রতিযোগিতা। শুরু হয় অনলাইনে। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব হয় কৃত্রিমভাবে তৈরি জিরো গ্রাভিটিতে (মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেখানে শূন্য)। যেসব দেশ ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের সদস্য, সেসব দেশের শিশুরাই এই প্রগামে অংশ নিতে পারে। শুরুতে শুধু হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়েই প্রতিযোগিতা হতো। এখন মিডল স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়েও হয়।

 

ছোটদের নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

ওরা অনেক অভিনব চিন্তা করতে পারে। আমি কানাডা আর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। ইতালির বাচ্চারা একটু অন্য রকম ভাবে চিন্তা করে। ওরা কিছুটা অ্যাগ্রেসিভ (আগ্রাসি)। অন্যদিকে জাপানি শিশুরা বেশ সৃজনশীল ও ভদ্র। বাংলাদেশের শিশুরা এখনো রেজাল্টকেই বড় করে দেখে। আসলে কিন্তু জিপিএ ব্যাপারটি বড় কিছু নয়। আইফোন বা ফেসবুক ব্যবহার করতে পারাটা কোনো স্মার্টনেস নয়; বরং ফেসবুক তৈরি করতে পারাটা স্মার্টনেস। সাদা কথায়, কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারাটা স্মার্টনেস। আমেরিকায় কাজ চাইতে গেলে আপনাকে ওরা সমস্যা ধরিয়ে দেবে। বলবে সমাধান করো। পারলে তবেই আপনি যোগ্য।

 

এমআইটির ল্যাবে কাজ করতে কেমন লাগে?

এমআইটি সারা বিশ্বের নাম্বার ওয়ান টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান। আমার ইমিডিয়েট বস ড. আলবার সায়েনজ নাসার নামকরা বিজ্ঞানী ছিলেন। আরেকজন ড. ডেভিড মিলার। তিনি নাসার চিফ টেকনিক্যাল অফিসার ছিলেন। এদের সঙ্গে কাজ করাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং। ওরা কাজ করে একেবারে নিখুঁতভাবে। মূল টিমটি বেশ ছোট; কিন্তু এই টিমের অধীনে পিএইচডি আর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন কাজ করে।

ল্যাবে একসঙ্গে অনেক মেশিন চলে। একবার পুরো সিস্টেম ডাউন হয়ে গিয়েছিল। রাতভর চেষ্টার পর এটা ঠিক করলাম। সকালে ড. আলবারকে বললাম, ‘এটা আমি করেছি।’ শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা তো তোমারই দায়িত্ব।’ আর বেশি কিছু বললেন না। তবে ঠিক এক বছর পরে বার্ষিক রিভিউ দেওয়ার সময় তিনি আমাকে খুব বাহ্বা দিলেন। বললেন, ‘তোমার ওই কাজে খুবই খুশি হয়েছি। খুব সিনসিয়ারলি কাজটা করেছো। ধন্যবাদ।’

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট নিয়ে মানুষের চিন্তার কোনো কারণ আছে?

আমার মনে হয় না মানুষের কাজ কমে যাবে। কম্পিউটার যখন এলো তখনো এমন গুঞ্জন ছিল; কিন্তু হয়েছে তার উল্টোটা। এ ক্ষেত্রেও তেমনি কিছু হবে। এমআইটিও বলছে, রোবট আর মানুষ পাশাপাশি কাজ করবে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত জিনিস। এটা কেউ দখল করতে পারবে না।

 

ভবিষ্য পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।

আরো বছর দশেক জিরো রোবটিক্স নিয়ে কাজ করব। বাংলাদেশের স্কুলগুলোকে যদি জিরো রোবটিক্সের আওতায় আনতে পারি, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন আসবে। আমরা টেকনিক্যালি অনেক পেছনে আছি। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি বটে, ভিত্তিটা কিন্তু মজবুত নয়।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ ও সংগ্রহ

মন্তব্য