kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

বিলকিছের মায়ার সংসার

মাদার তেরেসাকে আদর্শ মেনে মানবসেবায় কাজ করে যাচ্ছেন বিলকিছ বানু। স্বামী রবিউল ইসলামও তাঁর সঙ্গে আছেন। তাঁরা অনাথ শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন এক মায়ার ভুবন। আব্দুল খালেক ফারুক দেখে এসেছেন

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিলকিছের মায়ার সংসার

বিলকিছ বানুর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক রবিউল ইসলামও হাঁটছেন তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো। দুজন মিলে অনাথ-দরিদ্র শিশুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক মায়াবী ভুবন। বিলকিছ বানুর শ্বশুরের নামেই এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘গোলাপ খাঁ শিশু সদন’। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী পৌর এলাকায় বিলকিছ বানুর গোলাপ খাঁ শিশু সদন। ৭৮টি শিশু রয়েছে এখানে। এর মধ্যে ৩০টি শিশু এতিম। এ ছাড়া সদনের অনাবাসিক শিশুর সংখ্যা সাড়ে তিন শ। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থা আছে এখানে। বিলকিছ বানু ও তাঁর স্বামীই মূলত এর ব্যয়ভার বহন করেন। এই দম্পতির এক ছেলে, এক মেয়ে।

 

প্রীতিলতার গল্প বলা যাক

শিশুটির মা মানসিক ভারসাম্যহীন। পথেই শিশুটির জন্ম। মা যত্ন নিতে সমর্থ নন। পিতার কোনো খবর নেই। বিলকিছ বানু নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন। নাম রাখলেন প্রীতিলতা। নিজের মেয়ে সুকন্যার সঙ্গে হেসে-খেলে বড় হয়েছে সেই শিশু। এখন পড়ছে উচ্চ মাধ্যমিকে। নাগেশ্বরী সদরে যে মার্কেট তৈরি করেছেন বিলকিছ তার নাম রেখেছেন প্রীতিলতার নামে। পিতৃহারা বা মাতৃহারা কোনো শিশুর খবর পেলে ছুটে যান বিলকিছ। সদনে নিয়ে এসে বড় করার দায়িত্ব নেন।

 

কিছুক্ষণ গোলাপ খাঁয়

নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের কাছে তিন বিঘা জমির ওপর গোলাপ খাঁ শিশু সদন। গাছপালায় ভরা সদনের ভেতরটা। ফুলের বাগানও আছে। এর মূল ভবনে ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা। মেয়েদের হোস্টেল দুটি টিনশেড ঘরে। পাশেই থাকেন বিলকিছ-রবিউল দম্পতি। তখন দুপুর ১২টা হবে। কিছুক্ষণ পর বাঁশি পড়ল। আবাসিক শিশুরা লাইন ধরে ডাইনিংয়ের দিকে গেল। ডাইনিংয়ের দেয়ালে দিন ধরে খাবার তালিকা লেখা আছে। এখানে শিক্ষক আছেন ১৭ জন। বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সিকিউরিটি গার্ডও আছেন। খাবার, শিক্ষকদের বেতন ইত্যাদি সমেত মাসে মোট খরচ সাড়ে তিন লাখ টাকা প্রায়। প্রীতিলতা সুপার মার্কেটের ৮০টি দোকান থেকে একটা বড় অঙ্ক আসে। এ ছাড়া বিলকিছ-রবিউলের কিছু কৃষিজমি আছে। কলেজ ছাত্রীদের জন্য একটি হোস্টেল করেছেন। সেখান থেকেও কিছু আয় হয়। শিশু সদনের খরচ এসব থেকেই মেটানো হয়। নামাজ, জাতীয় সংগীত, কুচকাওয়াজ, পড়াশোনা, খেলাধুলা সব কিছুই এখানে নিয়মমাফিক হয়।

 

স্বপ্ন বড় হচ্ছে

বিলকিছ আরো বড় করতে চান গোলাপ খাঁ শিশু সদনকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশ বড় একটি টিনশেড ভবন গড়ার কাজে হাত দিয়েছেন এরই মধ্যে। মা ও শিশু কল্যাণ নামের একটি সেবাকেন্দ্রও গড়ে তুলছেন। এখানে মা ও শিশুরা বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পাবে। সারা দেশের সব অনাথ ও দুস্থ শিশুদের কথা তিনি ভাবেন। সবাইকেই জায়গা দিতে চান সদনে। তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান।

একজন মমতাময়ী মা

বিলকিছ বানুর সদনে যখন কোনো শিশু আসে, তখন তার পুরো দায়িত্ব নেন তিনি। কোনো শিশু অসুস্থ হলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সদনের সমন্বয়কারী সব্যসাচী সাহা জানান, এই সদনের শিশুরা মাতৃ ও পিতৃস্নেহে বড় হয়। বিলকিছ বানুকে মা ও রবিউল ইসলামকে সবাই বাবা বলে ডাকে। সবার সঙ্গেই তাঁরা মা-বাবার মতোই আচরণ করেন।

বিলকিছ বানু বলেন, ‘এই শিশুদের কষ্ট আমাকে কষ্ট দেয়। আমি চাই ওরা আর দশটি সাধারণ শিশুর মতোই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক।’

 

পাথরে ফুল ফোটালেন যেভাবে

রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু প্রীতিলতাকে বড় করার সময় থেকেই বিলকিছ বানু ভাবতে থাকেন, এমন তো আরো অনেক আছে। তাদের জন্য কিছু করা দরকার। স্বামী তখন নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক। তিনি প্রথম দিকে বেশি উৎসাহ দেননি। পরে বিলকিছের আন্তরিকতা দেখে তিনিও এগিয়ে আসেন। আস্তে আস্তে নিজের সব সম্পত্তি লিখে দিতে থাকেন গোলাপ খাঁ শিশু সদনের নামে। বিলকিছ বলছিলেন, ‘আমি পাথরে ফুল ফুটিয়েছি। এখন স্বামীকে সব কাজে পাশে পাই।’ রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এতিম শিশুদের সেবায় স্ত্রীর আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। একসময় তাঁর পাশে দাঁড়াই। এখন এই শিশুরাই আমাদের সব। যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন এই কাজই করে যাব।’

মন্তব্য