kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

নৌকায় ৪৫০ কিলোমিটার

নদীর রূপ দেখতে বেরিয়েছিলেন শাহজালাল নোমান। আর ইচ্ছা ছিল নদী নিয়ে একটি ছবি তৈরির। একাই তাই বেরিয়ে পড়েন। জলপথে বেড়ান ৪৫০ কিলোমিটার। বরগুনার বামনায় তাঁর দেখা পেয়েছিলেন সোহেল হাফিজ ও মনোতোষ হাওলাদার

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নৌকায় ৪৫০ কিলোমিটার

নোমানের বয়স ২৯। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের ছাত্র ছিলেন। কায়াক নামের পাতলা কাঠের নৌকায় চড়েছিলেন। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাঘাট থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন ২২ অক্টোবর। বরগুনার পাথরঘাটায় শেষ করেন ৪৫০ কিলোমিটারের দীর্ঘযাত্রা ২ নভেম্বর।

 

যে কারণে নৌভ্রমণ

প্রায় হাজার নদী বাংলাদেশে। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীর দখলে। অথচ নদী নিয়ে বড়সড় পর্যটনশিল্প গড়ে ওঠেনি। গবেষণাও হয়নি বেশি। আন্তর্জাতিক কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের নদী নিয়ে কোনো প্রামাণ্যচিত্র প্রতিযোগিতায় নামেনি এ পর্যন্ত। এসব সাতপাঁচ ভেবেই নোমান চার বছর আগে একটি কায়াক বানাতে বসেন। শেষে নদী বেড়িয়ে চর, নৌযান বা পাখির ছবি তুলতে থাকেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন দুটি ওয়াটার প্রুফ ক্যামেরা। নিজের মোবাইল ফোনটিও ব্যবহার করেছেন মাঝেমধ্যে।

 

নোমানের কথা

নোমানের বাবা মো. মাহবুবুল হক বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের সদস্য ছিলেন। মা গৃহিণী। বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট নোমান। বাবার চাকরির সুবাদে দেশের অনেক জায়গায়ই থাকার সুযোগ হয়েছে। নোমান ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণপ্রিয়। স্কুলবেলায় সাইকেলে তাঁর উত্তরাঞ্চল ঘোরা হয়ে গেছে। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। পরে ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। ইউল্যাবে পড়েছেন মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিষয়ে।

 

কায়াক যেভাবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নোমানকে হিসাব করেই চলতে হতো। তাঁদের মধ্যবিত্তের সংসার। তবু এর মধ্যে থেকেই কিছু কিছু টাকা জমানো শুরু করেন। তিন বা ছয় মাস পর পর প্লাইউড কিনতেন। ইচ্ছা তাঁর একটি নৌকা বানাবেন। এর মধ্যে ইউটিউবে নৌকা বানানোর টিউটরিয়াল দেখতে থাকেন। প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্লাইউড কিনতে তাঁর অনেক দিন যায়। তারপর নিজেই তৈরি করতে থাকেন কায়াক। মোট এক লাখ টাকা খরচ হয় নৌকাটি বানাতে। প্লাইউড দিয়ে কাঠামো তৈরি করে ফাইবার দিয়ে ঢেকে দেন। প্রচণ্ড ঢেউয়েও নৌকাটিতে পানি ঢুকতে পারে না।

উল্লেখ্য, কায়াক দ্রুতগতির ছোট নৌকা। লগি বা বৈঠা দিয়ে চালানো হয়। ছোট কায়াক লম্বায় ১০ থেকে ১৫ ফুট হয় আর বড়গুলো ২৫-২৬ ফুটও হয়। বড়গুলোয় দুই-তিনজনও বসতে পারে। উত্তর আমেরিকার আলাস্কায় কায়াকের ব্যবহার শুরু হয়। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের এস্কিমোরা সিল মাছ শিকারের জন্য সিলের চামড়া মোড়ানো হালকা কাঠের তক্তায় তৈরি কায়াক ব্যবহার করত। আধুনিক কায়াকের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮৪ সালে।

 

কায়াকে ১২ দিন

কুড়িগ্রামে নদটি ব্রহ্মপুত্র। ২২ অক্টোবর সকালে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সূর্যের আলো থাকা পর্যন্ত সময়ে গিয়ে পৌঁছান নুন খাওয়ার চরে। পরের দিন ভোরে আবার চলতে শুরু করেন। সন্ধ্যায় পৌঁছান চিলমারীর অষ্টমীর চরে। তৃতীয় দিন রাত কাটান গাইবান্ধার ফুলছড়ির চরে। পরের দিন পৌঁছান সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে। তার পরের রাত থাকেন যমুনার মাঝখানের এক চরে। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর পৌঁছান তার পরের দিন। সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে জেগে যেতেন নোমান। মাওয়া হয়ে পদ্মার চরে রাত কাটান সপ্তম দিনে। অষ্টম দিনে পৌঁছান শরীয়তপুরের আড়িগাঁও বাজারে। আড়িগাঁওয়ে তিনি রাত কাটান হোটেলে। পরের দিন পৌঁছান বরিশালের টরকী বন্দরে। তার পরের দিন ঝালকাঠির বাউকাঠিতে পৌঁছান। ১১তম দিনে ভাসতে ভাসতে পৌঁছান বরগুনার বামনায়। সন্ধ্যার পরে বিষখালী নদীতে একটি অন্য রকম নৌকা দেখে লোকে ভিড় করেছিল। তিনি ততক্ষণে ক্লান্ত। স্থানীয় লোকজন তাঁকে এক রকম উদ্ধার করে বলা চলে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বামনা ডাকবাংলোয়। পরে ১২তম দিনে বিষখালীতে ভাসতে ভাসতেই পাথরঘাটায় পৌঁছে যান। শেষ হয় তাঁর ৪৫০ কিলোমিটারের যাত্রা।

 

পদ্মায় ঢেউ ছিল

ব্রহ্মপুত্র শান্তই ছিল। নোমানকে বেগ পেতে হয়েছে পদ্মায় গিয়ে। উঁচু উঁচু ঢেউ ছিল কোথাও কোথাও। পদ্মা তাঁকে মেঘনায় ঢুকতে দেয়নি। কোনোমতে নড়িয়ার ভেতর দিয়ে তিনি টরকী পৌঁছান। আর ঝামেলা হয়েছিল বাউকাঠির খালে। কচুরিপানার ভিড় ছিল খুব। বলা চলে কচুরির জটে আটকা পড়েছিলেন। বৈঠা দিয়ে কচুরিপানা সরিয়ে এক রকম পার পেয়েছিলেন। ১২ দিন ভাসতে তাঁর কোমরে ব্যথা ধরে গেছে। বসতে বা চিত হয়ে শুতে কষ্ট হচ্ছে। নোমান বললেন, ‘আমি দেশটাকে আকাশ থেকেও দেখতে চাই। নিজেই একটি আকাশযান তৈরির পরিকল্পনা করছি।’ নোমানের বাবা বললেন, ছেলেটা (নোমান) একটু খেয়ালি টাইপের। একটা কিছু মনে এলে তা নিয়েই পড়ে থাকে। প্রথমে সাইকেলে সে দেশের ৫৪টি জেলা ঘুরেছে। এবার নৌযাত্রায় সে পুরো একাই ছিল। আমরা তাই চিন্তায় ছিলাম। ওর মা তো নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়েছিল। তবে আমার বিশ্বাস ছিল, নোমান পারবে এবং সে পেরেছে।

মন্তব্য