kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

অবাক মানুষ

যে তুমি আলো ঝরাও

হাত নেই, পা নেই; কিন্তু আলোকচিত্রী হিসেবে দারুণ তিনি। তাঁর ক্যামেরায় সুন্দর হয়ে ওঠে আরো সুন্দর। ইন্দোনেশিয়ায় তাঁর বাড়ি। নাম আছমাদ জুলকারনাইন। খোঁজ নিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যে তুমি আলো ঝরাও

জুলকারনাইনের তোলা ছবি। এমন অসংখ্য ছবি তুলেছেন তিনি।

পূর্ব জাভার বনিয়উঙ্গাতিতে জন্ম। আছমাদ জুলকারনাইন এখন ২৫ বছরের তরুণ। বন্ধুরা তাঁকে ‘ডিজোয়েল’ (Dzoel) বলে ডাকে। আর দশজনের মতো শৈশব কাটেনি তাঁর। জন্মগতভাবেই ছিলেন হাত-পাহীন। মা-বাবার কপালে তো চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। এই ছেলের ভবিষ্যৎ কী—তা নিয়েই ভাবনার যেন অন্ত ছিল না তাঁদের।

 

স্বপ্নপূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন

লোকজন তাঁকে ‘প্রতিবন্ধী’ বলত। শুনে কষ্ট পেতেন জুলকারনাইন। বুঝতে শেখার পর থেকেই নিজের মতো চেষ্টা করে গেছেন। একসময় স্থানীয় একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে কাজ করতেন। ওই ক্যাফেতে একটি ফটোগ্রাফি সার্ভিস ছিল। সেখানে ছবি তোলা দেখেই ছবির প্রেমে পড়েন তিনি। নিজের কাছে ক্যামেরা কেনার মতো টাকা ছিল না। একসময় ধার করা টাকায় একটি ক্যামেরা কেনেন। এরপর নেমে পড়েন ছবি তোলায়। প্রথম দিকে শুধু তাঁদের গ্রামে আইডি কার্ডে ব্যবহারের জন্য ছবি তুলতেন। বলছিলেন, ‘আইডি কার্ডের ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম ফটোগ্রাফির ব্যাপারটা দারুণ।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জুলকারনাইন নিজেকে তৈরি করেছেন। স্বপ্নপূরণে নিজের প্রতি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করেন নিজের উদ্ভাবনী পদ্ধতি। হাত নেই তো কী হয়েছে? মুখ তো আছে। তা দিয়েই ক্যামেরা চালু ও বন্ধ করেন। শাটার চাপেন হাতের অতিরিক্ত চামড়ার সাহায্যে। ছবি তুলতে কোনো ট্রাইপড ব্যবহার করেন না। এভাবে মুখ ও হাতের ওপরের অতিরিক্ত চামড়া ব্যবহার করে বহু সাড়া জাগানো ছবির জন্ম দিয়েছেন জুলকারনাইন।

 

ফর্মুলা ওয়ান কার

ক্যানন ফাইভ-ডি ইওএস মার্ক টু ক্যামেরায় ছবি তোলেন জুলকারনাইন। পেশাদার আলোকচিত্রীদের কাছে এই ক্যামেরা খুবই জনপ্রিয়। ৮১০ গিগাবাইটের এই ক্যামেরা বেশ ভারী বলে জানালেন তিনি। ‘আমার তো আঙুল নেই, তাই মুখ দিয়ে আঙুলের কাজ করি।’

চলাফেরার জন্য চার চাকার একটা ছোট্ট বাহন আছে। যেটাকে তিনি ‘ফর্মুলা ওয়ান কার’ নাম দিয়েছেন। এই বাহনটির ডিজাইনও তাঁর নিজের করা। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা কারটি নির্মাণে সাহায্য করেছেন। এটায় মোটরবাইকের ইঞ্জিন আছে। একজন মাত্র বসতে পারে। কারটি তিনিই চালান। প্রতিদিন সকালে কালো ক্যামেরা ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। পরনে থাকে টি-শার্ট, মাথায় ব্যান্ডেনা অথবা ক্যাপ। জুলকারনাইন বলেন, ‘ফর্মুলা ওয়ান কারটি আমাকে দূর-দূরান্তে যেতে সাহায্য করে।’

 

নিজের কম্পানি খুলেছেন

শখের বশে শুরু করেছিলেন। এখন পুরোদস্তুর পেশাদার ফটোগ্রাফার। গড়ে তুলেছেন নিজের কম্পানি। নাম ব্যাঙ ডিজোয়েল। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ফ্রেমবন্দি করতে ভালোবাসেন। এ ছাড়া তোলেন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে মডেলদের ছবি। তোলা হয়ে গেলে ছবিগুলো ক্যামেরা থেকে ল্যাপটপে নিয়ে নেন। সেখানে এডিটও নিজেই করেন। সবশেষে প্রকাশ করেন। তাঁর তোলা অসংখ্য ছবি বিশ্বের নজর কেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার সীমানা পেরিয়ে তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও ভীষণ জনপ্রিয় জুলকারনাইন। ইনস্টাগ্রামে তাঁকে অনুসরণ করেন প্রায় ৭৪ লাখ মানুষ।

আছমাদ জুলকারনাইন

সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষ সৃষ্টিশীলতা দেখুক

সমতলে তো বটেই, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিটার উঁচুতেও ছবি তুলেছেন জুলকারনাইন। সব সময় যে স্বাচ্ছন্দ্যে তুলতে পেরেছেন তা-ও নয়। মাঝেমধ্যে বিপত্তিও ঘটেছে। একবার যেমন—একটি জলপ্রপাতের ছবি তুলতে খুব উঁচু একটি জায়গায় উঠেছিলেন জুলকারনাইন। সেইবার সমুদ্রের কিনারে খাড়া পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন; কিন্তু সেদিকে মোটেও খেয়াল ছিল না তাঁর। বেশি চিন্তিত ছিলেন ক্যামেরা নিয়ে। প্রথমে দেখে নিয়েছিলেন ক্যামেরার কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না। কারণ ‘আমি সত্যি সত্যিই আমার ক্যামেরাকে খুব ভালোবাসি’—আল জাজিরাকে বলছিলেন জুলকারনাইন। তিনি আরো বলেছেন, ‘আমি চাই না মানুষ আমার ছবি দেখে চিন্তা করবে আমি কে? আমার স্বপ্নকে আমি কোনো সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকতে দিই না। আমি চাই মানুষ শুধু আমার সীমাবদ্ধতা নয়, সৃষ্টিশীল কাজগুলোও দেখবে।’

 

‘যদি সেরা হতে চাও, তাহলে তোমার সীমাবদ্ধতা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। তুমি যা করো তাতে সেরা হতে তোমাকে নিখুঁত হওয়া লাগবে না।’

—জুলকারনাইন

 

আসলে আমি অন্য রকম কেউ

যাঁরা ফটোগ্রাফি শিখতে চান, তাঁদেরও সাহায্য করতে চান জুলকারনাইন। তিনি বলেন, ‘এখনো অনেকে আমাকে দেখলে ভ্রু কুঁচকায়। তবে এখন আর আগের মতো খারাপ লাগে না!’ ফটোগ্রাফির পাশাপাশি জুলকারনাইন এখন স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। যাঁরা স্বাভাবিক, শুধু তাঁদের কাছ থেকেই নয়—যাঁরা ভিন্নভাবে সক্ষম, তাঁদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে বলে মনে করেন জুলকারনাইন। বললেন, ‘আমি আমার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গর্বিত। আমি ডিজাবলড; কিন্তু পরাজিত নই, আসলে আমি অন্য রকম কেউ।’   

 

সূত্র : আলজাজিরা, মাইমর্ডানমেটডটকম, দ্য স্টেয়ারটাইমস

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা