kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

খাদ্য চক্কর

স্যুপ

থাই, চিকেন, হট ইত্যাদি হরেক রকম স্যুপ পাওয়া যায়। আমরা দুপুরে ও রাতে যে ডাল খাই, তা-ও এক রকম স্যুপ—লেন্টিল স্যুপ। অভিধান বলছে, স্যুপ মানে শুরুয়া বা ঝোল। এর ইতিহাস খুঁজতে বসেছিলেন আহনাফ সালেহীন

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্যুপ

জায়গাভেদে স্যুপের রকমফের হয়

চীনের জিয়াংজি প্রদেশ। জিয়ানরেনডং গুহা। ২০ হাজার বছর আগের একটি স্যুপ বোল (গর্তওয়ালা গোল বাটি) পাওয়া গেছে। মাটির পাত্রটিতে পুড়ে যাওয়ার দাগ পাওয়া গেছে, যার অর্থ এতে গরম স্যুপ রাখা হয়েছিল। ব্যাপারটি বুঝি এমন ছিল—প্রাচীন মানুষটি একটি গর্ত খুঁড়েছিল প্রথমে। তারপর চকমকি পাথর দিয়ে আগুন জ্বেলেছিল। পাত্রটি পানিতে পূর্ণ করে তার মধ্যে শিকার করা পশুর নাড়িভুঁড়ি রেখেছিল। শেষে সেটি আগুনের ওপর ধরেছিল। তৈরি হয়ে গিয়েছিল প্রাচীন মানুষের স্যুপ। তাই বলা হচ্ছে, স্যুপ বা ঝোল বা শুরুয়ার বয়স অনেক। রান্নার ইতিহাসের সমান।

প্রাচীন মানুষটি বুঝি চকমকি দিয়ে আগুন জ্বেলেছিল

আরেকটু ইতিহাস

৫০০ বছর ধরে রোমানরা বিশ্বের এদিক-ওদিক দাপিয়ে বেড়িয়েছে। স্যুপের ইতিহাসেও তারা দাগ রেখে গেছে। স্পেনে তারা নিয়ে গিয়েছিল গাজপাচো। বিয়ের আসরে বিশেষ রকমের স্যুপ তারা তৈরি করত। ৪৭৬ অব্দে পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে স্যুপ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে টিকে গেল, বিশেষ করে কনস্টান্টিনোপলে স্যুপের ভালো চল ছিল। তারপর ১৪৫৪ সালে অটোমানরা কনস্টান্টিনোপল জয় করে নিলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের স্যুপের মিলন ঘটল। তুর্কিরা স্যুপে প্রচুর সবজি দিত আর ইউরোপীয়দের স্যুপে গোশত থাকত। তুর্কিদের স্যুপ খাওয়ার নির্দিষ্ট সময় ছিল না, দিনের যেকোনো সময় খেত। এদিকে ইংল্যান্ড, জার্মানি আর গ্রিসের লোকেরা রুটির ওপর স্যুপ ঢেলে খেতে বেশি পছন্দ করত। এই চল দীর্ঘ সময় চালু ছিল।

আলগা কলার পরা রানি এলিজাবেথের পোর্ট্রেট

ফ্যাশন দিল চামচ

রেনেসাঁর আমলে ইউরোপে একটা ফ্যাশন চালু হলো—গলায় আলগা কলার পরার। এটি লেসেরও হতো। ১৫৭৫ সালে রানি এলিজাবেথের একটি পোর্ট্রেটে তাঁকে আলগা কলার পরা দেখা যায়। এই কলার পরার কারণে লোকদের বোলে করে স্যুপ খেতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই এলো স্যুপ স্পুন (চামচ)। এখন তো চামচ ছাড়া স্যুপ খাওয়ার কথা বেশি লোক ভাবতেও পারে না।    

স্যুপকথা

সাধারণভাবে স্যুপ হলো গরম তরল খাবার, যাতে থাকে গোশত, ডিম, শস্যদানা, সবজি ইত্যাদি। ফরাসিরা দুই ধরনের স্যুপের কথা বলেন—পাতলা ও ঘন। স্যুপের সঙ্গে স্টুর তেমন ফারাক নেই। তবে স্টু বেশি ঘন হয়। ধনী, গরিব সবাই খায়। সুস্থ, অসুস্থ সবাইকেই শক্তি জোগায়; বিশেষ করে খাবারের অভাব দেখা দিলে স্যুপের চেয়ে ভালো সমাধান হয় না। এটি শুধু সস্তাই পড়ে না, সহজে পেটও ভরে। জায়গাভেদে স্যুপের রকমফের হয়, কারণ একেক জায়গায় একেক জিনিস বেশি মেলে। গাজপাচো যেমন স্পেনের লোকেরা খায় খুব গরমের দিনে। এটি কোল্ড বা ঠাণ্ডা স্যুপ। অনেক রকম সবজি এতে দেওয়া হয়। পূর্ব ইউরোপের লোকেরা খায় বোর্স্ট। এটি টক স্বাদের হয়। এতে গোশত থাকে। আবার ইতালির লোকেরা মাইনস্ট্রোন নামের যে স্যুপ খায় তাতে শিম, পেঁয়াজ, গাজর, টমেটো থাকে বেশি। সাধারণত যে মৌসুমে যে সবজি পাওয়া যায়, তা দিয়েই এটি তৈরি করা হয়। ফরাসিরা  স্যুপ শব্দটি পেয়েছে ল্যাটিন সুপ্পা থেকে। ঘন তরলে ডোবানো রুটিকে সুপ্পা বা সপ ইত্যাদি বলা হয়। ১৬ শতকের ফরাসি রেস্তোরাঁগুলোয় মূলত কম দামের স্যুপ মিলত। ফ্রান্সের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে স্যুপ বিক্রি করতেও দেখা যেত ফেরিওয়ালাদের। ১৮ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার জার্মান অভিবাসীরা পটেটো স্যুপ বেশ খেত। ফরাসি বিপ্লবে বাস্তুহারা জাঁ ব্যাপ্টিস্ট গিলবার্ট ১৭৯৪ সালে বোস্টনে একটি রেস্তোরাঁ খোলেন। তিনি পরে স্যুপের রাজপুত্র নামে পরিচিত হন। বহনযোগ্য বা পকেট স্যুপের প্রচলন ১৯ শতকের শেষে। ব্রিটিশরা যখন তাঁদের উপনিবেশগুলোতে (ভারতবর্ষ ইত্যাদি) বেড়াতে যেতেন, তখন ব্যাগে স্যুপ বহন করতেন। এতে শুধু পানি মেশাতে হতো। ১৯ শতকে ক্যানড স্যুপের চল হয়। ক্যাম্পবেল স্যুপ কম্পানির ড. জন টি ডরেন্স ১৮৯৭ সালে এটি আবিষ্কার করেন। কাউবয় ও সৈনিকদের মধ্যে ক্যানড স্যুপের আদর ছিল বেশি।

মন্তব্য