kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

আসলে তো কষ্ট বাড়াচ্ছি

২০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আসলে তো কষ্ট বাড়াচ্ছি

মোরশেদ মিশু

ছোটবেলায় কী ধরনের বই পড়তেন?

শৈশবে মেজো ভাইয়া উন্মাদ ম্যাগাজিন, চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিংকি, নন্টে-ফন্টে এনে দিত। সেগুলো পড়তাম, পড়াশেষে মেজো ভাইয়ার সঙ্গে বসে সেগুলো দেখে আঁকার চেষ্টা করতাম। কার্টুন আঁকার হাতেখড়ি সেখান থেকে। কৈশোরে তিন গোয়েন্দাতে ডুব দিই। পড়ার সময় কল্পনায় নিজেকে কিশোর পাশা ভাবতাম। রূপালি মাকড়সা, অথৈ সাগর, ভীষণ অরণ্যের মতো আরো অনেক গল্প মাথায় গেঁথে আছে এখনো। তারপর পড়া শুরু করি কিশোর ক্লাসিক, হ্যারি পটার আর হুমায়ূন আহমেদ। কিশোর পাশা, হ্যারি পটার, হিমু আমার প্রিয় চরিত্র। মজার বিষয় হচ্ছে, কল্পনায় এই প্রতিটি চরিত্রে আমি নিজেকে কল্পনা করি। আমার ধারণা, অনেকেই এই কাজটা করে।

 

খেলাধুলা কেমন করতেন? 

স্কুলজীবনে ক্রিকেট খেলতাম এবং ভালোই খেলতাম। লেগ স্পিন করতাম আর ব্যাটিংয়ে নামতাম ওপেনিংয়ে। ফুটবলও খেলতাম, করতাম গোলকিপিং। ভাবতাম জায়গাটা সেইফ, বেশি দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না; কিন্তু স্কুলে একবার স্ট্রাইকারের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার সময় জোরে আঘাত পেয়েছিলাম। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আর শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলতাম।

 

আপনি কি কম্পিউটারে আঁকেন, না হাতে?

কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে পড়তে ছেড়ে দিলেন।

কোনো আঁকাই তো হাতের ব্যবহার ছাড়া সম্ভব না। তা সেটা ট্র্যাডিশনাল ড্রইংই হোক কিংবা কম্পিউটারে ডিজিটাল ড্রইং। কাগজ, ক্যানভাস, রং আর রংতুলি যেমন একেকটা ড্রইং টুল, তেমনি কম্পিউটার আর গ্রাফিক ট্যাবলেটও ড্রইং টুল। যেকোনো মাধ্যমে আঁকতে পারাটাই বেশি জরুরি। কম্পিউটারকে কমান্ড করলে কম্পিউটার অটোমেটিক্যালি এঁকে দেবে, ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। আমি ট্র্যাডিশনাল ও ডিজিটাল দুই মাধ্যমেই আঁকতে পছন্দ করি। আমি মূলত কার্টুন আঁকায় বেশি সময় আর মনোযোগ দেওয়ার জন্য কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া থেকে নিজেকে ড্রপ করি। যদি পড়তে থাকতাম তাহলে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হওয়া আর একটা সার্টিফিকেট পাওয়া ছাড়া আর কোনো উপকার হতো বলে মনে হয় না। কারণ ওই ফিল্ডে আমি আসলে সময়ই দিতাম না। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, যার যে বিষয় বা ক্ষেত্রে আগ্রহ, সে বিষয়ে বা ক্ষেত্রেই সময় দেওয়া উচিত। ভালোভাবে স্কিল ডেভেলপ করতে পারলে কাউকে থামানো সম্ভব না। শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের পিছে না ছুটে, নিজের আগ্রহের ফিল্ডে স্কিল ডেভেলপ করায় মনোযোগী হওয়াটা জরুরি।

 

কার্টুন তো অনেক রকম হয়ে থাকে। বিদ্রূপাত্মক বা শুধুই হাস্যরসাত্মক। আপনি কী ধরনের কার্টুন আঁকতে পছন্দ করেন?

বাংলা, ইংরেজি কিংবা অন্য যেকোনো ভাষার মতো কার্টুনও আমার কাছে একটা ভাষা। এবং এটা একটা ইউনিভার্সাল (বিশ্বজনীন) ল্যাংগুয়েজ। অন্য যেকোনো ভাষার মতো কার্টুন দিয়েও মনের ভাব প্রকাশিত হয় এবং যেকোনো দেশের মানুষের পক্ষেই তা বোঝা সম্ভব। কার্টুন যে শুধুই বিদ্রূপাত্মক কিংবা হাস্যরসাত্মক হবে তা কিন্তু না, একটা শক্তিশালী আইডিয়ার মাধ্যমে দেওয়া মেসেজও কার্টুন হতে পারে। যেমন ধরেন, দ্য গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ সিরিজটা। এই কার্টুন সিরিজে বিদ্রূপ কিংবা হিউমারের চেয়ে আইডিয়া আর মেসেজটা বেশি শক্তিশালী। তবে আমার সব ধরনের কার্টুন আঁকতেই ভালো লাগে।

 

আপনি তো দেশ-বিদেশের অনেক কার্টুনিস্টের ছবি দেখেছেন। প্রিয় কার্টুনিস্ট কে?

প্রিয় কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব। তাঁর আইডিয়া জেনারেট করার ক্ষমতা আর আঁকার সাবলীল স্টাইলের আমি ভক্ত। একটা ভালো কার্টুন আঁকতে যে আসলে একটা কলম, এক টুকরা কাগজ আর একটা ভালো আইডিয়া ছাড়া আর কিছু লাগে না, আহসান হাবীবের কার্টুন সেটার প্রমাণ।

 

গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ সিরিজের ছবিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে। আপনি নতুন করে যেভাবে এঁকেছেন, তাতে বাংলা অনুভব পাওয়া যাচ্ছে। যেমন শিশুকে চাঁদ দেখানো, পিতার বুকে পুত্রের পরম আশ্রয় ইত্যাদি।

গ্লোবাল হ্যাপিনেস সিরিজের ছবিগুলোর প্রেক্ষাপট মোটেও কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গা নয়; বরং এর প্রেক্ষাপট যুদ্ধ বা হানাহানি এবং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব। যেকোনো যুদ্ধের মূল ভিকটিম কিন্তু সাধারণ মানুষ। আমরা সাধারণ মানুষ কিন্তু হানাহানি চাই না। আমরা চাই সুখ-শান্তিতে থাকতে। আর সুখ বা শান্তি কিন্তু অর্থ-কড়ি কিংবা গোলাবারুদে নাই। সবুজ মাঠে কন্যাকে কোলে নিয়ে বাবার দৌড়ে বেড়ানো, বাবার বুকে পুত্রের ঘুম, ভাই-বোন মিলে একত্রে খেলা—চাঁদ দেখানো, খাঁচার পাখি উড়িয়ে দেওয়া, অলস বিকেলে নদীতে মাছ ধরা, নতুন পড়তে শেখা, একটা শিশুর রূপকথার গল্পের বই পড়ে কল্পনার রাজ্যে হারানো কিংবা স্কুল-কলেজ ছাত্রদের ফুটবল খেলে কাপ জিতে ফেলা—এমন  সামান্য কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর মুহূর্তগুলোর মধ্যেই হ্যাপিনেস বিরাজমান। আর এই ব্যাপারগুলো শুধু বাংলাদেশ না, বিশ্বের সব জায়গায়ই একই রকম। আমার বিশ্বাস এই অনুভূতিটি একটি বৈশ্বিক অনুভূতি।

 

আপনি কষ্ট ঢাকতে চাইছেন; কিন্তু আসল কষ্ট কি

ঢাকা যাচ্ছে?

সত্যি বলতে, এভাবে হ্যাপিনেস এঁকে তো আর কষ্ট ঢাকা সম্ভব না; বরং আঁকা হ্যাপিনেস, কষ্টগুলোকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে বাংলায় একটা কথা আছে না, বিষে বিষক্ষয়। তেমনি কষ্টের ওপর কয়েক গুণ কষ্ট বাড়তে বাড়তে একদিন আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে হ্যাপিনেস ছড়ানো শুরু করব ইনশাআল্লাহ।

 

আপনার মা-বাবা কি গ্লোবাল হ্যাপিনেস সিরিজ দেখেছেন?

আব্বা দেখছেন কি না জানি না। তবে উন্মাদের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদর্শনীর মাধ্যমে আম্মা আর আপু কার্টুনগুলো দেখেছিলেন। আম্মা ছবিগুলোর সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছিলেন। মুখে কিছু বলেননি, শুধু আমার কপালে দুটো চুমু দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আমার কাজে সুখী।

 

 

মন্তব্য