kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

আরো জীবন

কুলফিওয়ালা আবুল ভাই

২০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কুলফিওয়ালা আবুল ভাই

বলতে গেলে ছোটবেলা থেকেই আবুল হোসেনের কুলফির সঙ্গে তারিকুল হক তারিকের সম্পর্ক।  এই সেদিন জানতে চেয়েছিলেন কেমন যায় মানুষটার জীবন

স্বাদে ঘ্রাণে অপূর্ব। আর গুণে মানে অনন্য। কুষ্টিয়ার কুলফি, বিশেষ করে আবুল ভাইয়ের কুলফি। মাটির হাঁড়ি মাথায় নিয়ে অনেক কুলফিওয়ালাই কুষ্টিয়ার রাস্তায় বের হন প্রতিদিন। আবুল ভাই অবশ্য বের হন রিকশাভ্যানে হাঁড়ি চাপিয়ে। সারা দিন বাজান কাওয়ালিগান। কুলফি তাঁর দিনও ফিরিয়েছে। দিনে প্রায় হাজার টাকা রোজগার।

 

বাড়ি কুমারখালী

কুষ্টিয়া শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে কুমারখালীর কয়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের অনেক মানুষই পেশায় কুলফি বিক্রেতা। এখানকার একটি গ্রাম উত্তর কয়া। এই গ্রামেই বাড়ি আবুল হোসেনের। অনেকের কাছে তিনি আবুল সাধু। বেশটাই যে আলাদা। কালো চশমা আর কালো পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেন। কুলফিভরা মাটির হাঁড়িটি মুড়িয়ে নেন লাল শালু কাপড়ে। তাঁর ভ্যান রিকশার সাউন্ডবক্সে কাওয়ালি বাজে। এই গান মানেই আবুল ভাইয়ের কুলফি। এটা কুষ্টিয়াবাসী জানে। প্রতিদিন ভোরবেলায় গরুর খাঁটি দুধে চিনি, এলাচি, বাদাম, কিশমিশ ও গরম মসলা মিশিয়ে ভালো করে জ্বাল দেন। ৫, ১০, ২৫, এমনকি ৫০ টাকার কুলফিও বানান।  গ্লাসে ভরে আটা দিয়ে গ্লাসের মুখ এঁটে দেন আবুল ভাই। তারপর  মাটির হাঁড়ির মধ্যে ৩০ টাকার বরফ ভেঙে দিয়ে গ্লাসগুলো ছেড়ে দেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব কুলফি জমে যায়। এর পর রওনা হন শহরের দিকে। প্রতিদিন মাটির ওই হাঁড়িতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার কুলফি নিয়ে বের হন আবুল হোসেন। বয়স তাঁর পঁয়তাল্লিশ।

 

ওস্তাদ ছিলেন জলিল মিয়া

বেশিক্ষণ লাগে না। শহর ঘুরে আসতে কয়েক ঘণ্টা। এর মধ্যেই শেষ হয় আবুল ভাইয়ের কুলফি। গরমের কয়েক মাস খুব চলে। শীতের সময় বিক্রি করেন দই। এ দই তিনি নিজে বাড়িতেই বানান। একসময় কিন্তু আবুল ভাইয়ের খেয়ে-না খেয়ে দিন গেছে। মাত্র চার ক্লাস পড়তে পেরেছিলেন। তারপরই রোজগারের ধান্দায় লেগে যেতে হয়েছিল। জলিল মিয়ার শাগরেদ বনে যান একপর্যায়ে। জলিল মিয়া কুষ্টিয়ার প্রথম দিকের কুলফি বিক্রেতা। খুব নাম করেছিলেন। আবুল অল্প দিনেই কুলফি তৈরির ফর্মুলা শিখে ফেলেন। এর মধ্যে ওস্তাদ জলিল মিয়া মারা যান। নিজেই কুলফি বিক্রি করতে লেগে যান। মাত্র আট হাজার টাকা ছিল তাঁর পুঁজি। এর পর সাফল্য ধরা দেয়। এক বিঘা জমি কিনেছেন। জমিতে ধানের আবাদও করেন। স্ত্রী সজলী খাতুন দুটি সমিতি করেন। ৭০ হাজার টাকা জমিয়ে ফেলেছেন সজলী। আবুল ভাই নিজে বাড়িতে ১০০ টাকা করে জমা রাখেন প্রতিদিন।

 

তাঁর দুটি ইচ্ছা 

জমানো টাকা দিয়ে একটি পাকা বাড়ি তুলবেন। দ্বিতীয় ইচ্ছাটি হলো আজমীর শরিফ দেখতে যাবেন। ২০ বছর ধরে তিনি কাদেরিয়া তরিকায় জীবন চালান। পীর-মুর্শিদের প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। অবসরে পীর-ফকিরদের আস্তানায় ঘুরে বেড়ান। তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে তিনটিরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সুজনও বাবার মতো কুলফি বিক্রি করে। আবুল হোসেনকে সুখী মানুষই বলা যায়। বললেন, ‘ওস্তাদের ওপর ভক্তি রাখি। আগের থেকে ভালো আছি। প্রায় ২৫ বছর ধরে এই কুলফি বেচেই আমি সারা শহরে নাম করেছি। আমাকে চেনে খলিসাদহ, সুলতানপুর, জাতপুর, শিলাইদহ ও কালোয়া গ্রামের মানুষরাও।’

 

মন্তব্য