kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফেসবুক থেকে পাওয়া

ভাইয়া, আমি ভুল করেছি

মোহাম্মদ আলী। আমার ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকে খুব হাসিখুশি স্বভাবের। ওর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত কাজে ফাঁকি দেওয়া। পড়াশোনায় একেবারে মন দিত না। আমার কঠোর নজরদারিতে ওকে পড়ার টেবিলে বসতে হতো। এরই মধ্যে ২০০৩ সালে আমি বিমানবাহিনীতে বিমান সেনা হিসেবে চট্টগ্রামে জহুরুল হক ঘাঁটিতে যোগদান করি! আমার অনুপস্থিতিতে ও একেবারে স্বাধীন! যেদিকে খুশি ঘুরে বেড়াত। বাবা ব্যবসা ফেলে প্রায়ই ওকে খুঁজতে বের হতেন। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পড়ার টেবিলে বসাতেন। পড়া রেডি করতে পারত না বলে স্কুলের নাম করে বাইরে বাইরে থাকত। আবার ছুটির পর সুবোধ বালকের মতো করে স্কুলব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বাসায় ফিরত। মা দৌড়ে এসে ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিতেন। আদর করে খাওয়াতেন। ও তখন লজ্জায় মায়ের মুখের দিকে অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকত।

তখন আমার ইনিশিয়াল ট্রেনিং চলছিল। সামরিক ট্রেনিং চলাকালে ভাইয়ের পড়াশোনার খবর রাখা তো দূরের কথা, নিজেরও সব খবর রাখা দায়! রুটিনমাফিক অবিরাম ব্যস্ততা সামরিক ট্রেনিংয়ের বৈশিষ্ট্য। তিন মাস পর স্যালুটিং টেস্টে উত্তীর্ণ হলাম। বুক আউটে বেরিয়েই বাবার কাছে ফোনে ওর পড়াশোনার খোঁজখবর নিলাম। দেখতে দেখতে আমার পাসিং আউটের সময় ঘনিয়ে এলো। ও তখন পড়াশোনা থেকে পুরোপুরি দূরে সরে গেছে। দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে স্কুলের হাজিরা খাতা থেকে ওর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে বাবা একদিন ওকে খুব মারধর করেন।

পরদিনই সে কাউকে কোনো কিছু না জানিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। এরপর আমি চাকরি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে এলাম।

আমার জ্যাঠার বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। এখানে এসেই ওকে আবিষ্কার করলাম একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে। ও দোকান সহকারীর কাজ নিয়েছে। লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে যায়। তারপর সওদাগরকে বুঝিয়ে ওকে জ্যাঠার বাড়িতে নিয়ে এলাম। সবাই মিলে ওকে প্রাণান্ত বোঝালাম। ওকে বোঝাতে আমার দুদিন লাগল।

যাইহোক, ওকে আমার কাছে নিয়ে আসি। আমার বাসার পাশেই ছিল রামপুরা আইডিয়াল স্কুল। প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে ওকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করালাম। পাশাপাশি দুটি কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিলাম। ও নিয়মিত স্কুলে ও কোচিংয়ে যেতে লাগল। আবার স্কুল থেকে ফিরলে ওর পড়াশোনার তদারকি করতাম। দেখতে দেখতে সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফল বের হলো। কৃষিশিক্ষা ও ধর্ম ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ফেল করেছে। চিন্তায় পড়ে গেলাম; কিন্তু ওকে ঘিরে আমার স্বপ্ন থেকে একচুলও সরতে পারলাম না। কয়েক দিন ধরে নিজে নিজে ভাবলাম। আমি নিজেও তো একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছি। ওকে যদি আমার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে পারি তবে স্যার-ম্যাডামরা ওকে চোখে চোখে রাখবেন। ও ফাঁকি দিতে পারবে না। এই ভাবনা থেকে ওকে আমার স্কুলে ভর্তি করালাম। ও আমার সঙ্গে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা করত। সন্ধ্যায় আমি ওকে পড়াতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানেও প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় সে সব বিষয়ে অকৃতকার্য হয়।

আমি স্যার-ম্যাডামের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম। ওকে যেন তাঁরা নিরাশ না করেন, সাহস জোগান। আমি ব্যস্ততা কমিয়ে ওর প্রতি আরো মনোযোগী হলাম। দিন-রাত ও পড়াশোনায় সময় দিতে লাগল। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার কয়েক দিন আগের কথা। স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম। প্রতিদিনের মতো সেদিন কিন্তু ওকে পড়ার টেবিলে পেলাম না। ওর রুমমেট রিজভী বলল, ‘স্যার, আপনি স্কুলে যাওয়ার পর পরই আলী ভাই সেজেগুজে বের হয়ে গেছেন।’

পরিচিত সব জায়গায় খোঁজ নিলাম। কিন্তু কোথাও ওর দেখা মেলেনি। সারা রাত বিছানায় শুধু ছটফট করেছি। সকালে বাড়িতে ফোন করে সব জানালাম। মা-বাবা খুব টেনশনে পড়ে গেলেন।

পরদিন বাবা হাতিয়া থেকে বাসায় চলে এলেন। এরপর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় খোঁজ নিলাম। কোথাও পেলাম না। এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবা সেদিন খুব কেঁদেছিলেন। বললাম, ‘চিন্তা করবেন না। ওকে খুঁজে বের করবই।’

বাবা চলে যাওয়ার প্রায় এক মাস পর একদিন আমার ছাত্র রায়হান এসে জানালো, আলী তাকে কিছুক্ষণ আগে কল করেছে। ওর থেকে মোবাইল নম্বরটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল দিলাম। ওপার থেকে একটি অচেনা কণ্ঠ ভেসে এলো—

হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

আমি ঝটপট পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই নম্বর থেকে একটু আগে একটি ছেলে কথা বলেছিল। আমি তাকে চাইছিলাম। আর জায়গাটি কোথায়? লোকটি আমাকে বলতে চাচ্ছিল না। আমি সব খুলে বললে তখন তিনি বললেন, ‘পূর্ব মাদারবাড়ী এলে ওকে পেতে পারেন। ও কার্গো গাড়ির হেলপার।’

লোকটির দেওয়া ঠিকানামতো এসে ছোট ভাইকে খুঁজে পেলাম। চিনতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। রাস্তায় ধুলাবালির মধ্যে থেকেছে। রাতে গাড়ির ভেতরেই থাকতো। পরনের লুঙ্গি, গায়ের টি-শার্ট সব যেন ময়লার স্তূপ। দেখে মনে হয়েছে গত এক মাসে গোসল করেনি। আমার চোখে চোখ পড়তেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

বললাম, চেহারার এ কী হাল করেছিস! আমার সঙ্গে চল। আমি তোকে নিতে এসেছি।

বলল, ‘ভাইয়া, আমি যাব না। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। পড়ালেখা আমাকে দিয়ে হবে না।’

এই কথা বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ওকে জড়িয়ে ধরে আমিও কাঁদলাম। ওকে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখালাম। সেই স্বপ্নকে জীবনে জড়াতে ও খুব ভয় পাচ্ছিল। পরে আমার চোখে চোখ রেখে ও চিৎকার করে বলল, ‘হ্যাঁ, ভাইয়া, আমি ভুল করেছি। আমি আবার পড়াশোনা করব।’

আবার নতুন করে ওর জীবনের অধ্যায় শুরু হলো। এখন ও অনার্স (হিসাববিজ্ঞান) ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। দ্বিতীয়বারে বাসা থেকে চলে যাওয়াটাই ছিল ওর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

—কবির কাঞ্চন

সহকারী শিক্ষক, বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ, চট্টগ্রাম

সিইপিজেড, চট্টগ্রাম।

 

বিদায়ের রাগিণী

সময় ফুরিয়ে এসেছে। সবাই কেমন অস্থির হয়ে উঠল। আশপাশ তাকিয়ে দেখি বরপক্ষের লোকজন অপেক্ষা করছে। বিদায়ের অপেক্ষা। খুব তাড়াহুড়া।  এক্ষুনি নতুন বউকে বাড়ি নিয়ে যাবে। এখানে আর একটা মুহূর্তও যেন অযথা সময় নষ্ট। কনে একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরল। এত কাছের মানুষগুলো, যাদের সঙ্গে রক্তের, মনের আর আত্মার অটুট সম্পর্ক। এক বাঁধন। একটু একটু করে যেন ছিঁড়ে যেতে লাগল। বিদায় বেলার সেই মুহূর্তে সবার মনেই যেন একটা অন্য রকম কষ্ট উঁকি দিল। কিসের যেন এক টান। কিছুতেই ছুটতে চায় না। যেন ছেড়ে যেতে ইচ্ছা হয় না। এই সময়টায় চোখের পানি আটকে রাখা বড় দায়! কোথায় যেন চিনচিনে ব্যথা হয়। বোঝানো বড় মুশকিল।

আর আমি? পেছন থেকে তাকিয়ে আছি। ভাবছি এতগুলো বছরের কথা। আমি তখন কলেজে পড়ি। মা-বাবা পাঠিয়েছেন ঢাকায়। পড়াশোনার জন্য। আমার বোনের কাছে। ছোট বলে রাগটা ছিল একটু বেশি। কোনো কিছুতেই সহজে মানিয়ে নিতে পারতাম না। কত খারাপ সময় গেছে, কত ভালো সময় গেছে। সে আমাকে আগলে রেখেছে সব সময়। আমাকে ভালোবেসেছে, ঠিক যেন আমার মায়েরই মতো। যেন মায়েরই প্রতিচ্ছবি। আজ ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। তবু চোখের আড়াল করেনি এক মুহূর্তের জন্যও। এভাবে তার হাজারো যত্ন, ভালোবাসা আর স্মৃতি আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। মনে পড়তে লাগল সব কিছু। অনুভূতিগুলো ছোট; কিন্তু কতটা যে প্রখর তা হয়তো একটা মানুষকে হারিয়ে না ফেললে বোঝা যায় না।  

কাছের মানুষগুলো হঠাৎ করে দূরে চলে গেলে সব কিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যায়। তাই আজ আর ওকে আর সবার মতো জড়িয়ে ধরিনি। বড় হয়েছি, এখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে লোকে কী বলবে! তবে ওই সময়টায় চোখের পানি আটকে রাখা দায়। আমিও পারিনি। না চাইতেও চোখ দুটি অযথাই ভিজে উঠল।

ওকে কতটা ভালোবাসি কখনোই বলা হয়ে ওঠেনি। আপন মানুষগুলোকে মনের কথা অত সহজে বলা যায় না।

 

—সামিয়া দ্যুতি

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা