kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

বাঙালির বিশ্বদর্শন

নামচে বাজার

নামটা শুনলেই অনেকের মন হারায়। অনেকে বলেন, আহা আবার যদি যাওয়া যেত! সৈয়দ আখতারুজ্জামান সাধ পূরণ করে এলেন সম্প্রতি

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নামচে বাজার

যাঁরা এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প বা গোকিয়ো লেক ট্রেকিং করেন নামচে বাজারে তাঁরা থামবেনই। উত্তর-পূর্ব নেপালের সাগরমাথা অঞ্চলের সোলুখুম্বু জেলার একটি গ্রাম এই নামচে বাজার। একসময় দোকান ছিল হাতেগোনা আর ট্রেকারদের থাকার জন্য ট্রেকার্স হাট ছিল কয়েকটি। ট্রেকারদের ওপর ভর করে শুধু ট্রেকিং সিজনেই এগুলো খোলা থাকত। বছরের বাকি সময় গ্রামবাসী পাহাড়ে কৃষিকাজ আর ইয়াক চড়িয়ে পার করত। আর এখন নামচে বাজার নেপালের অন্যতম ব্যস্ত শহর। শত শত অভিযাত্রী ভিড় করেন নামচে বাজারে। তার মধ্যে বিদেশিরাই বেশি।

নামচে বাজারকে সোলুখুম্বুর দরজা বলা হয়। বাজারের কাছে আগে ছোট্ট একটি এয়ারপোর্ট ছিল। এখন অবশ্য জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ছাড়া আর কিছু নামে না। এখন অভিযাত্রীরা কাঠমাণ্ডু থেকে লুকলা এয়ারপোর্ট  এসে নামেন। তারপর ১৩ কিলোমিটার ট্রেকিং করে নামচে বাজার আসেন। সাধারণত শেরপারা ছাড়া বেশি কেউ এই ১৩ কিলোমিটার এক দিনে পাড়ি দেন না। ফাকদিং বা মানজোতে একটি রাত কাটিয়ে নেওয়াই নিয়ম।

 

সুরতহাল নামচে বাজার

১১ হাজার ২৮৬ ফুট  উঁচুতে নামচে বাজার। ২০০১ সালের আদমশুমারি থেকে জানা যায়, নামচে বাজারে ৪০০ পরিবারের বসতি। মানুষের সংখ্যা দেড় হাজার। এখন হাজারেরও বেশি পরিবার স্থায়ীভাবে বাস করে। আরো ৫০০ পরিবার অস্থায়ীভাবে বাস করে। পর্যটন মৌসুম শেষ হলে তারা নিজের জায়গায় ফিরে যায়। মার্চ থেকে মে আর আগস্ট থেকে অক্টোবর হলো সেরা মৌসুম। নামচে বাজারও এই ছয় মাস জমজমাট থাকে। এই নামচে বাজারে পাবেন স্কুল, ব্যাংক, এটিএম মেশিন, পার্লার, ওষুধের দোকান, জামা-কাপড়ের দোকান, ইলেকট্রনিকসের দোকান, ভালো মানের সেলুন, দেশি-বিদেশি খাবারের দোকান, চা আর কফি শপ, সাইবার ক্যাফে ও বার। ওয়াই-ফাই সংযোগ পাবেন সর্বত্র।

 

আমি এখন নামচে বাজারে

শীতের পোশাক, ব্যাগ, জুতা, সানগ্লাস, কসমেটিকস, পানির বোতল বা ওয়াকিং স্টিক কোনোটিরই প্রয়োজন নেই আমার। দরকার নেই ম্যাপও। তবু বাজার ঘুরতে লাগলাম। বইয়ের দোকান পেলাম দুই-তিনটি। সেগুলোতে ভ্রমণের বই-ই বেশি। আছে পরিবেশ-প্রকৃতিবিষয়ক বই। পর্বতারোহণ বিষয়ের বই তো আছেই। আর্ট গ্যালারিও দেখলাম। তাতে জলরং আর তেলরঙে আঁকা ল্যান্ডস্কেপই বেশি। আমরা নামচে বাজার পৌঁছেছিলাম সন্ধ্যানাগাদ। আকাশে মেঘ ছিল, বৃষ্টিও হচ্ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি। কিন্তু হোটেলে না গিয়ে বাজারে ঘুরতে লাগলাম। তবে পাহাড়ে রাত নামে দ্রুত। আমরাও বেশি দেরি না করে হোটেলে গিয়ে ঢুকলাম। বেশির ভাগ হোটেলেই কমন টয়লেট। ভাড়া তাই কম। কোনো কোনো হোটেলে থাকতে পারবেন বিনা মূল্যে। শর্ত একটাই—খাবার খেতে হবে ওখানে। খাবারের দাম অবশ্য বেশি। যেমন—দুটি সিদ্ধ ডিমের দাম আড়াই শ রুপি, এক বোতল গরম পানি দেড় শ রুপি। গরম পানি আর চা কাপে নয়, ফ্লাস্কে বিক্রি হয়। তাই ছয়-সাতজনের দলে সাশ্রয় হয়। নামচে বাজারে অভিযাত্রীরা পুরো দিন বিশ্রাম করেন। উচ্চতাজনিত শারীরিক ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে উঠতে এই বিশ্রাম আবশ্যক। বিশ্রামের দিনে অনেকে কাছের খুমজং গ্রামে হাইকিং করেন। খুমজংয়ে হিলারি স্কুল, হিলারি ভাস্কর্য আর খুমজং মনাস্ট্রি দেখার সুযোগ হয়। আমরা বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার পথে দুই রাত ছিলাম নামচে বাজার। ফেরার সময়ও ছিলাম এক রাত।

 

একটা পুরো পৃথিবী

আমার মনে হলো, পুরো পৃথিবীই হাজির এখানে! এত দেশের মানুষ একসঙ্গে দেখার এমন সুযোগ আর কোথায় মেলে আমার জানা নেই। এখানে কারোরই তাড়া নেই। কেউ জোরে কথা বলে না। গাড়ি নেই, হর্ন নেই। সময় থির। ডানে-বাঁয়ে, উত্তরে-দক্ষিণে যেখানেই চোখ রাখুন পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের মাঝখানে এই এক অদ্ভুত পৃথিবী। সন্ধ্যা হলেই  রেস্তোরাঁর মাঝখানে এক লৌহচুল্লি জ্বালানো হয়। এর ওমে পুরো রেস্তোরাঁ উষ্ণ হয়ে ওঠে। সেই উষ্ণতা গায়ে মেখে অভিযাত্রীদের কেউ টেবিলে বসে বই পড়েন, কেউবা গরম চা খান। কয়েকজনকে দুঃসাহসী অভিযানের গল্প করতেও দেখা যেতে পারে। কোনো কোনো টেবিলে তাস খেলা চলে। ৮টা বাজলেই কিন্তু সব বাতি নিভে যায়। ঘুমিয়ে পড়ে নামচে বাজার।

 

নামচে বাজারে লেখক। ছবি : রাকিব হাসান

মন্তব্য