kalerkantho

অনিবার্য কারণে আজ শেয়ারবাজার প্রকাশিত হলো না। - সম্পাদক

খুঁজে ফেরা

সোনারগাঁয়ের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ

ত্রয়োদশ শতকের সাতের দশকে সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল একটি উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্র। দূর-দূরান্ত থেকে আসত ছাত্ররা। এটি গড়ে তুলেছিলেন সুফি দরবেশ ও পণ্ডিত শেখ শরফউদ্দিন আবু তাওয়ামা। বাংলাপিডিয়ায় সূত্র পেয়ে খোঁজখবর করেছেন মাসুম সায়ীদ

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোনারগাঁয়ের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ

মোগরাপাড়ার দরগাবাড়ি

শেখ শরফউদ্দিন খোরাসান থেকে দিল্লি হয়ে এসেছিলেন সোনারগাঁয়। জন্ম তাঁর বোখারায়। তবে পড়াশোনা করেছেন খোরাসানে। ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ ও হাদিস শাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। জানতেন ভূগোল, গণিত, রসায়নবিদ্যা আর প্রকৃতিবিজ্ঞানও।

 

খোরাসান থেকে সোনাগাঁয়ে

খোরাসান থেকে শেখ শরফউদ্দিন প্রথমে আসেন দিল্লিতে। দিল্লির শাসনকর্তা তখন গিয়াসউদ্দিন বলবন। সোনারগাঁ তখন দিল্লির অধীন। শরফউদ্দিনের পাণ্ডিত্যের কথা তখন আরব, ইস্পাহানে ছড়িয়ে পড়েছিল। জানত ভারতবাসীও। তাই দিল্লিতে আসার পর অনেক লোক তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে আসত। আমির-ওমরাহরাও তাঁর অনুরাগী হয়ে ওঠেন। দিল্লির সুলতান তাঁর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে পড়েন। সুকৌশলে পাঠিয়ে দেন সোনারগাঁয়।  

 

মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা

দিল্লি থেকে সোনারগাঁয়ের যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। বহু মানুষ তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যেও সঙ্গী হন কিছু লোক। সোনারগাঁয়ে এসে তিনি তাঁর শিষ্যদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন খানকাহ আর ছাত্রদের জন্য মাদরাসা ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি (১২৭৪ থেকে ১২৭৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে)। আসলে এই মাদরাসা ছিল একটি উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, ফিকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এখানে শিক্ষা দেওয়া হতো রসায়ন, গণিত, ভূগোল ও ভেষজ শাস্ত্রও। গবেষকরা মনে করেন এটাই উপমহাদেশে ইলমে হাদিসের প্রথম বিদ্যাপীঠ।

 

আলোকায়ন

ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আবু তাওয়ামা বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতাও করতেন। শিগগিরই এ মাদরাসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শিক্ষা আর দীক্ষা নিতে ছাত্ররা এসে হাজির হয় দূর-দূরান্ত থেকে। মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। তাঁদের অন্যতম বিহারের মানেরির বিখ্যাত শায়খ মখদুম-উল-মুলক শেখ শরফউদ্দিন এহিয়া মানেরি। তিনি মানেরি থেকে তাঁর সঙ্গে সোনারগাঁয়ের পথ ধরেন কিশোর বয়সেই।

 

শরফউদ্দিনের ইন্তেকাল

জ্ঞানতাপস শরফউদ্দিন প্রায় ২৩ বছর শিক্ষকতায় নিয়োজিত থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মোগরাপাড়ার দরগাবাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। প্রতিবছর ১২ মাঘে দরগাবাড়ির ওরসে ঢাকা থেকে অনেক বিহারি আসেন। বিহারে তাঁদের পীর এহিয়া মানেরির গুরু বা শিক্ষকের মাজার এখানে বলে। দরগাবাড়ি কমপ্লেক্সে পুরনো যে মাজারগুলো রয়েছে তারই একটিতে ঘুমিয়ে আছেন শরফউদ্দিন। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যে ভাঙা দালানকোঠার কিছু স্তূপ আজও টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে এগুলো হয়তো পুরনো সেই মাদরাসা আর খানকার অংশ। পরবর্তী সময় শেখ আলাউদ্দিন আলাউল হক (মৃত্যু ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দ), তাঁর পৌত্র শেখ বদর-ই-ইসলাম ও প্রপৌত্র শেখ জাহিদ ধর্মতত্ত্ব ও সুফিতত্ত্ব শিক্ষা দিতেন এখানে। আরো পরে এ ধারা অব্যাহত রাখেন সাইয়্যিদ ইবরাহিম দানিশমন্দ ও তাঁর বংশধর সৈয়দ আরিফ বিল্লাহ মুহাম্মদ কামেল, সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফসহ অন্যরা।

 

শরফউদ্দিনের গ্রন্থাবলি

আবু তাওয়ামার রচিত গ্রন্থ ‘মনজিলে মাকামাত’ সুফিবাদের ওপর প্রাচীন বাংলায় লিখিত একটি উল্লেখযোগ্য ইসলামী দর্শন গ্রন্থ। জানা যায়, এর পাণ্ডুলিপি এখনো সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে। ছাত্রদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতাগুলোর একটি সংকলনের কথাও জানা যায়। তার নাম ‘নামে-ই-হক’। এতে স্থান পেয়েছে ১৮০টি ফারসি বয়েত বা পঙিক্ত। এটি ১৮৯৫ সালে মুম্বাই ও ১৯১৩ সালে কানপুর থেকে প্রকাশিতও হয়। তাঁর শিষ্য এহিয়া মানেরিও শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।

 

কালের পরিক্রমা

বাংলায় স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনা করেন ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি তুঘলক শাসক বাহরাম খান ওরফে তাতার খানের সিলাদার বা বর্মবাহক ছিলেন। বাহরাম খানের মৃত্যুর পর ১৩৩৮ সালে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করে সোনারগাঁয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। সে সময় শরফউদ্দিনের মাদরাসা সম্ভবত ফকরুদ্দিনের আনুকূল্য পায়নি। জানা যায়নি ইলিয়াস শাহের আমলের কথাও। তবে সুলতান সিকান্দার শাহ ও গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের সময় (১৩৮৯-১৪১০) মাদরাসা ও খানকার অবস্থা বেশ সুদৃঢ় ছিল। এ সময় সোনারগাঁ ছিল পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক রাজধানী। বাংলার সুলতানরা শিক্ষা ও শিল্প-সাহিত্যে প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। তাঁদের মধ্যে গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ ছিলেন অগ্রগণ্য। হোসেনশাহী বংশের শেষ সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহ সাইয়্যিদ ইবরাহিম দানিশমন্দকে সোনারগাঁয়ে লা-খারাজ (করমুক্ত ভূমি) বন্দোবস্ত দেন। তিনি মোগরাপাড়ার দরগাবাড়িতেই তাঁর খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীন সুলতানদের পর বাংলায় ছিল আফগান শাসন। তারপর মোগল-আফগান হাতবদল হয়ে আবার আসে মোগল শাসন। মাঝে বারোভূঁইয়ার কাল। এসব রাজনৈতিক ডামাডোলে গুরুত্ব হারায় সোনারগাঁ। আসে ইংরেজ আমল। ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের সূত্র ধরে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় সব লা-খারাজ সম্পত্তি। বন্ধ হয়ে যায় মাদরাসা-খানকাহ তথা ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রগুলো।

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ

মন্তব্য