kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

মাগো, কবে আবার মুখ লুকাব তোমার বুকে?

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাগো, আমায় ক্ষমা করো, তোমার মতো করে নিঃস্বার্থভাবে আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমায় দিতে পারি না বলে। মা, তোমার কি মনে আছে ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা? শীতের ভোরগুলোতে ঘুম থেকে জেগে উঠেই যখন তোমায় জালাতন করতে শুরু করতাম, বাবা আর তুমি প্রাণপণে চাইতে আমাকে লেপের নিচে রাখতে। কিন্তু আমি কেঁদে কেঁদে তোমাকে বাধ্য করতাম আমায় নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে। আমায় তুমি চাদর দিয়ে তোমার পিঠের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে উঠোন ঝাড়ু দিতে আর আমি তোমার কানের দুল নিয়ে খেলা করতাম। তুমি আমায় বকতে আর বলতে, নামিয়ে দেব কিন্তু কোল থেকে। জান মা, এখন কেউ-ই আর ঠাণ্ডা লাগবে বলে সকালে লেপের নিচে আমায় থাকতে বলে না। কেউ বলে না যে রোদ উঠুক তারপর উঠবি। কে বলবে? আমি যে এখন তোমার থেকে অনেক দূরে।

তোমার মনে আছে মা? যখন আমি খেতে চাইতাম না, তখন তুমি খাইয়ে দিতে। তুমি খাইয়ে না দিলে তৃপ্তি পেতাম না। প্রতিবেশীরা বলত এত বড় ছেলেকে আবার খাইয়ে দিতে হয়; ঢং দেখ! কিন্তু তুমি সেসব গায়েই মাখতে না। পরম মমতায় আমার মুখে তুলে দিতে ভাতের লোকমা। জান মা? আজ চায়নিজে অনেক আধুনিক দামি খাবার খাই, কিন্তু সেই স্বাদ একটুও পাই না।

তোমার মনে আছে মা, আমার কোনো অসুখ হলে তুমি অস্থির হয়ে পড়তে। সারা রাত জেগে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। জ্বর হলে মাথায় পানি ঢেলে দিতে। পানির পট্টি দিতে। কোলে বসিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে আর প্রার্থনা করতে আমার সুস্থতার জন্য। আর এখন প্রচণ্ড জ্বরে বিছানায় কাতরাই, মাথাব্যথায় ঘুমোতে পারি না; কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস পর্যন্ত করে না যে কেমন আছি।

সেদিনকার কথা মনে আছে, যেদিন রাস্তার পাশে পুকুরপাড়ে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গিয়েছিল, সেদিন তুমি আমায় কোলে নিয়ে পুরো দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে এসেছিলে। মা, মনে আছে তোমার?  তুমি সব সময়ই আমাদের সৎ মানুষ হতে বলতে। আজ আর কেউ-ই এভাবে বড় মানুষ হওয়ার কথা বলে না। কেউ খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার জন্য পীড়াপীড়ি করে না।

পরীক্ষার সময় পড়ার চাপ থাকলে রাত জেগে জেগে পড়তাম, তুমি আমার পাশে এসে বসে থাকতে। আমার কখনো নিজেকে একা মনে হয়নি। সারাক্ষণই মনে প্রেরণা ছিল যে আমার সব প্রচেষ্টার সঙ্গী হয়ে তুমি আমার সঙ্গে আছ বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে। কখনো কখনো পড়ার টেবিলেই বইয়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমোতাম, তুমি এসে আমায় বিছানায় পরম মমতায় শুইয়ে দিতে। মশারি টানিয়ে, কয়েল জ্বালিয়ে সব কিছু ঠিক করে দিতে। আজ প্রায় সময়ই মশার কামড়ে রাতে জেগে উঠি। প্রতীক্ষায় থাকি তুমি এসে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার প্রহর যে ফুরোতে চায় না।

এত আদরের মধ্যেও আমাদের শাসন করতে তুমি এক বিন্দু পিছপা হওনি। আমরা কোনো ভুল করলে তুমি তত্ক্ষণাৎ ধরিয়ে দিয়েছ। আমাদের ভুলকে ভুল বলতে শিখিয়েছ। শিখিয়েছ খারাপকে বর্জন করে সত্যকে গ্রহণ করতে। তোমার দেওয়া শিক্ষাগুলো আজও আমাদের প্রেরণা, আলোর উৎস।

কখনো ভাবিনি তোমায় ছেড়ে থাকতে পারব। বাস্তবতার কবলে পড়ে আমাকে থাকতে হচ্ছে তোমার থেকে অনেক দূরের এক ইট-পাথরের শহরে, যেখানে তোমার মতো আদর দেওয়ার, মমতা দেওয়ার কেউ নেই। এখানে কেউ কাউকে বুঝতে চায় না, সবাই সবার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। দেখছ মা, তোমার এই দুষ্টুটা আজ কেমন স্বার্থপরের মতো তোমায় ছেড়ে রয়েছে। তুমি এই দুষ্টুটার ওপর রাগ করনি তো মা? লক্ষ্মী মা, রাগ করো না, শুধু দোয়া করো, এই দুষ্টুটা যেন পারে অনেক বড় মানুষ হয়ে তোমার মুখে হাসি ফোটাতে, যেন পারে বাংলার সব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, কষ্ট দূর করতে।

 

অরণ্য সৌরভ

সরকারি সফর আলী কলেজ, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ

মন্তব্য