kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুখ

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুখ

‘যে যার মতো এগিয়ে গেছে, শুধু থেকে গেছে কাঠের বেঞ্চে স্টিলের স্কেল দিয়ে লেখা নামগুলো।’ কথাটা কে লিখেছিল জানি না। কিন্তু কথাটা মনে পড়তেই আমার দুই চোখে পৃথিলার ছবি ভেসে ওঠে। প্রিয় পৃথিলা, তুমি হয়তো কখনো জানতে পারবে না, আট বছর আগের এই পুরনো বন্ধুটার বুকের ভেতর তুমি এখনো কতটা জায়গা জুড়ে আছ। জীবনের গতিপথে হারিয়ে গেছ ঠিকই; কিন্তু প্রথম কৈশোরে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে যে শীতলতা অনুভব করতাম, সে অনুভূতিগুলো আজও চির সবুজ হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, জীবনের কোনো এক লগ্নে যেন আমাদের আবার দেখা হয়ে যায়। তোমার নামটা কত যত্নে বুকের ভেতর এঁকে রেখেছি, তা মাঝেমধ্যে তোমাকে খুব দেখাতে ইচ্ছা করে।

ক্লাস সেভেনে পৃথিলা আর আমি একসঙ্গে পড়তাম। ছেলেবেলার সেই সোনালি দিনগুলো স্বপ্নের মতো ছিল। ক্লাসে আমরা প্রতিদিন পাশাপাশি বেঞ্চে বসতাম। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে তাকানো, চোখে চোখ পড়া, তারপর মুচকি হাসিতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মাঝে কী এক মহিমা লুকিয়ে ছিল, কী এক পূর্ণতা লুকিয়ে ছিল, যা আজও আমি হাতড়ে বেড়াই। কৈশোরের সেই সাধারণ চোখে চোখ পড়াতে বুকের ভেতর যে কাঁপন হতো সেটা আজও অনুভব করি।

পৃথিলা আর আমার ভীষণ পাখি হওয়ার শখ ছিল। দুই হাত উঁচু করে আমাদের কল্পনার নীল আকাশে পৃথিলা আর আমি আমাদের রঙিন ডানায় কতগুলো বিকেল যে উড়ে বেড়িয়েছি তার ঠিক নেই। আমার একটা সবুজ রঙের টিয়া পাখি ছিল। আমি রোজ তাকে পৃথিলার নাম ধরে ডাকা শিখাতাম। পৃথিলা মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায় আসত। টিয়া পাখির খাঁচায় হাত দিয়ে বলত ‘বলো তো টিয়া পাখি, আমার নাম কী?’ আমার পোষা টিয়া তখন ‘পৃথিলা! পৃথিলা!’ করে ডেকে উঠত। পৃথিলার অধরজুড়ে তখন ছড়িয়ে পড়ত কী এক অপূর্ব হাসি।

পৃথিলা ছিল খুব চঞ্চল মেয়ে, সারাটা দিন চঞ্চলতায় মেতে থাকত। আমি ওকে প্রজাপতি বলে ডাকতাম। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র প্রজাপতি।

এ নামে ডাকতাম বলে পৃথিলা একদিন দুপুরে আমাকে একটা প্রজাপতি উপহার দিয়েছিল। নীল সবুজের ডানায় অপূর্ব সুন্দর এক প্রজাপতি। টিফিন বক্সে করে প্রজাপতিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল ‘এটা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রজাপতি, খুব যত্ন করে রাখবে। কখনো উড়ে যেতে দিয়ো না।’ কিন্তু আমি পারিনি। প্রিয় প্রজাপতিটাকে আমার নীল আকাশে ধরে রাখতে পারিনি। ডিসেম্বরের শেষে এক পাতাঝরা সকালে পৃথিলা আমার ছোট্ট সাজানো আকাশ থেকে অনেকটা দূরে হারিয়ে যায়।

পৃথিলার বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। বদলি হয়ে চলে যায় দূরের এক অচেনা শহরে। সেই সঙ্গে চলে যায় পৃথিলাও। বার্ষিক পরীক্ষার সেই ছুটির রঙিন দিনগুলো সেদিন কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে পৃথিলা আর আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম ওদের ভাড়া বাড়ির বেলকনিতে। একসময় পৃথিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল ‘দেখো আকাশ, আমাদের একসময় ঠিকই দেখা হবে। অনেক দিন হারিয়ে থাকার পর একদিন আমরা আমাদের আবার খুঁজে পাব।’ আমি কিছুই বলিনি সেদিন। প্রচণ্ড অভিমান করে ফিরে এসেছিলাম। সেদিন পৃথিলার সঙ্গে মুক্ত করে দিয়েছিলাম খাঁচায় পুষে রাখা প্রিয় টিয়াকেও।

এরপর পেরিয়ে গেছে অনেকটা দিন, অনেকটা প্রহর। সেই কচি মুখে নির্মল হাসি, নিষ্পাপ চাহনি সব কিছু বুকের আলমারিতে সাজানো আছে। আজও পৃথিলার শেষ কথাগুলো আমার কানে বাজে। আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, এই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর পর আমরা আমাদের আবার খুঁজে পাব। জীবনের কোনো এক লগ্নে আমাদের আবার দেখা হবে।

 

নাজমুল হোসাইন আকাশ, সাতক্ষীরা

মন্তব্য