kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

প্রকৃতি সুন্দর

লিচু

অনেক অনেক দিন আগের কথা। বাংলা-বিহার-ওড়িশা তখন নবাবরা শাসন করতেন। বিহারের মোজাফফরপুরীতে উন্নত জাতের এক লিচুর সন্ধান মিলেছিল সে সময়। নবাবরা তা খেয়ে খুশি হতেন। এবার লিচুর কথা বলছেন ফখরে আলম

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লিচু

চায়না-৩

বিহার থেকে নবাবের রাজধানী মুর্শিদাবাদে আগমন ঘটে মোজাফফরপুরীর। এরপর একদিন সে লিচু আসে রাজশাহী। রাজশাহী থেকে যায় দিনাজপুর, যশোর, মেহেরপুর বা ঈশ্বরদীতে। মোজাফফরপুরী থেকে নাম হয় মোজাফফরপুরী লিচু। বোম্বাই লিচুর মতো এই লিচু পাকলে লাল বর্ণ ধারণ করে। বেশ মিষ্টি। প্রতিটি ফলের ওজন ২০ গ্রাম হয়ে থাকে। বাংলাদেশে দুই ধরনের মোজাফফরপুরী লিচু হয়। একটি আগাম জাত। আরেকটি নাবি জাত।

মোজাফফরপুরেরই আরেক জাতের লিচুর নাম মঙ্গলবাড়ি। আমাদের ময়মনসিংহে ফলে। এটিও বেশ মিষ্টি হয়। এই জাতের লিচু আগাম পাকে।

 

লিচু কী

লিচুর আঁতুড়ঘর হচ্ছে চীন। চীনা বিজ্ঞানী লাই চি প্রথম এর সন্ধান পান। অনেকে মনে করেন, লাই চি থেকেই লিচু নাম এসেছে। ফল নিয়ে পৃথিবীতে প্রথম বই লেখা হয় ১০৫৬ সালে। সেটি এই লিচু ফল নিয়েই। রাজা-রানি, বেগম-বাদশা, উজির-নাজির, নবাব, সম্রাট, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী সবারই মন জয় করেছে লিচু। অষ্টম শতকে চীনা সম্রাট হুয়ান সাং দক্ষিণ চীন থেকে লিচু নিয়ে গিয়ে উত্তর চীনে সম্রাজ্ঞীকে উপহার দিয়েছিলেন। লিচুর ইংরেজি নাম লিচি। বৈজ্ঞানিক নাম  Litchi chimensis। এতে ভিটামিন ‘সি’ আছে। পুষ্টিমানও বেশ ভালো। বাংলাদেশে রাজশাহী, যশোর, দিনাজপুর, রংপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ময়মনসিংহ, ঢাকার সোনারগাঁ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রামসহ আরো কয়েকটি জেলায় লিচুর চাষ হয়। চাটনি, ঘর সাজানো, চকোলেট তৈরিতেও লিচুর ব্যবহার দেখা যায়। লিচুর অনেক ঔষুধি গুণ রয়েছে। কাশি, পেটব্যথার মতো রোগে লিচু ফল কার্যকর। বোলতা, বিছের দংশনে এর পাতার রস ব্যবহার করা হয়। চর্মরোগে লিচুর বিচি ভালো কাজে লাগে।

 

বাহারি সব নাম

বেদানা, বোম্বাই, চায়না-১, চায়না-২, চায়না-৩, মোজাফফরপুরী, মঙ্গলবাড়ি, মাদ্রাজি, পূরবী, এলাচি, বারি-১, বারি-২, বারি-৩সহ দেশি আরো কয়েকটি জাত রয়েছে লিচুর। ফল গবেষক পার্বত্য এলাকার ফল উদ্যানের প্রকল্প পরিচালক এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘দেশে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর অনেক বাগান গড়ে উঠেছে। চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ায় আর একসঙ্গে লিচু পেকে যাওয়ায় এর দাম কমে গেছে। এ জন্য আমরা লিচুর আগাম ও নাবি জাত নিয়ে গবেষণা করছি। কিশোরগঞ্জে একটি আগাম জাতের সন্ধান পাওয়া গেছে।  চায়নার বারোমাসি ও বিচিবিহীন লিচুর জাত সংগ্রহ করে দেশে বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

 

বেদানা লিচু ১০ টাকা

হ্যাঁ, একটি লিচুর দামই ১০ টাকা। এর নাম বেদানা লিচু। শুধু দিনাজপুরেই হয়। বাজারে কিনতে গেলে না-ও পেতে পারেন। শৌখিন ক্রেতারা আগে থাকতেই বাগান সাফ করে ফেলেন। অধিকাংশই বিদেশে চলে যায়। গবেষকরা বলেন, মাটি আর আবহাওয়ার কারণে দেশের অন্য জেলায় বেদানা লিচু ফলে না। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাছিমপুর গ্রামে এই লিচুর চাষ হয়। গত বছর ১০০ লিচু বিক্রি হয়েছে এক হাজার টাকা। এবার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকায়। লিচুর রং সবুজাভ হালকা লাল। আকারে বোম্বাই লিচুর চেয়েও বড় হয়। পাতলা খোসা। শাঁসের পরিমাণ বেশি। খুবই মিষ্টি। জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি বেদানা লিচু পাকে। 

 

বোম্বাই

রাজশাহী, দিনাজপুর, মেহেরপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় বোম্বাই লিচুর চাষ হয়। পাকলে টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করে। এই লিচু খুবই মিষ্টি হয়। ওজন হয় ১৫-২০ গ্রাম। শাঁস রসাল। এই লিচু কয়েক দিন ধরে সংরক্ষণ করা যায়।

 

চায়না-৩

সুদূর চীন থেকে চায়না-৩ জাতের এই লিচুর বাংলাদেশে আগমন ঘটেছে। আর নিজ গুণেই সমাদর পেয়েছে।  দিনাজপুর, মাগুরাতেই বেশি হয় চায়না-৩। এর গাছ খুবই আদুরে। প্রেম-ভালোবাসা পছন্দ করে। নিবিড় পরিচর্যা ছাড়া এর চারা বাঁচানো কঠিন। চায়না-৩ গাছ বেশি লম্বা হয় না। চারা লাগানোর দু-তিন বছরের মধ্যেই ফল আসে। ফল গোলাকার। শরীর মসৃণ। ফলের ওজন ২৫ গ্রাম কিংবা এর থেকে বেশি। পাকলে সবুজের মধ্যে লাল রং ফুটে ওঠে। শাঁস মোটা। খেতে খুবই মিষ্টি। এ বছর চায়না-৩ লিচু প্রতিটি ৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

 

বারি-৩

বারি-১ ও বারি-২ লিচুর জাত উদ্ভাবনের পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি-৩ নামের নতুন একটি লিচুর জাত উদ্ভাবন করেছে। ১৯৯৬ সালে এই জাতটির অনুমোদন মিলেছে। এই লিচুতে গোলাপের খুশবু পাওয়া যায়। প্রতিবছর ফল ধরে। ফলের রং লাল-সবুজ। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় ২০ গ্রাম। ফল খুবই মিষ্টি। জুন মাসে পাকে। এ জন্য এই লিচুর জাত চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।

 

ছবি : ফিরোজ গাজী

মন্তব্য