kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

খাড়ু-হাঁসুলির শিল্পী

সুখীচরণ কর্মকার

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুখীচরণ কর্মকার

পানিটোলা, তাঁতীবাজার। রাখালচন্দ্র বশাক লেন। বুদ্ধ কর্মকারের ঘরে গিয়ে খোঁজ করি খাড়ু আর হাঁসুলির কারিগর। তাঁর জামাতা বললেন, সুখীচরণের কথা। একজন কিশোরকে সঙ্গেও দিলেন পথ দেখাতে। চললাম তার পেছন পেছন

রং বিবর্ণ একটি পুরনো দালান। বেশ লম্বা। কড়িবরগা দেওয়া ছাদ। তারই তলায় দুই সারিতে ছোট ছোট অনেক কামরা। কাঠের দুই পাল্লার দরজা। মাঝে এক চিলতে পথ। সারি সারি কামরা। কিশোর গিয়ে থামল একটার সামনে। দক্ষিণমুখো দরজা। চোখে চশমা-আঁটা হালকা-পাতলা একজন লোক দরজার সামনে দাঁড়ানো। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন বাইরে বেরোবেন বলে। ‘ইনিই সে’ লোকটাকে দেখিয়ে বলল কিশোর। নমস্কার করে বললাম খাড়ু-হাঁসুলির কথা। আবারও বসতে হলো তাঁকে। আমিও চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকলাম ঘরের ভেতরে। বসলাম নিচু একটা টুলে। তাঁর মুখোমুখি।

 

ছেষট্টি বছরের আখ্যান

ঘরটা খুব ছোট। কত আর? বড়জোর ১০ বাই ১২ ফিট হবে? তিনজন বসে কাজ করেন একসঙ্গে। উত্তর-দক্ষিণ আর পূর্ব দেয়ালের গা ঘেঁষে বসেন তাঁরা মুখোমুখি। তিনজনের প্রথমজন তিনিই, দরজার সামনেই তাঁর বসার গদি। বসেন পূর্ব দেয়াল ঘেঁষে পশ্চিম দিকে মুখ করে। নাম সুখীচরণ কর্মকার। হাসিখুশি মানুষ। প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯৬৮ সালে। ওস্তাদ জগদীশচন্দ্র রায়ের কাছে শুরু করেন কাজ শেখা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল নাগাদ ছিলেন তাঁর কাছেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় চলে যেতে হয় নিজগ্রাম বাউফলে। ধামরাই উপজেলার এই গ্রামেই তাঁর জন্ম। বাবা সত্যচরণ কর্মকার। আর মা ভানুরানী কর্মকার। যুদ্ধ শেষে আবার ফিরে আসেন তাঁতীবাজারে। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু করেন স্বাধীনভাবে কাজ।

খাড়ু-হাঁসুলির কথা

খাড়ু-বালা আর হাঁসুলির মতোই এক প্রকার ভারী গহনা। পায়ে পরার। রুপার তৈরি। একটা সময় এর প্রচলন ছিল বেশ, বিশেষ করে চা বাগানের কামিন, হরিজন আর সাঁওতালদের মধ্যে খাড়ুর চল ছিল খুব। কোনো কোনো সম্প্রদায়ের তো বিয়েই হতো না এক জোড়া খাড়ু ছাড়া। খাড়ুর ভেতরটা থাকে ফাঁপা। এর মধ্যে পুরে দেওয়া হয় পুঁতি। ফলে হাঁটার সময় উঠত বৃষ্টির ছন্দ, রুমঝুম। বালা বা কাঁকনের বেশ প্রচলন এখনো আছে। কিন্তু খাড়ু আর হাঁসুলি তেমন দেখাই যায় না। নেই বললেও চলে। হারিয়ে যাওয়ার দলে আরো একটি আছে, তার নাম অনন্ত। পরত ড্যানায়। খাড়ুর সঙ্গে মিলিয়ে। খাড়ুর সঙ্গে বালার চেয়ে অনন্তের সখ্যই বেশি।  

গড়িত আর নকশাকার

পায়ের খাড়ু, হাতের বালা, অনন্ত আর গলার হাঁসুলি তৈরির ধরন প্রায় একই। আর দেখতেও কাছাকাছি। শুধু আকারে ছোট-বড়। খাড়ু আর বালার মুখ থাকে বন্ধ। হাঁসুলির মুখ খোলা। খাড়ু আর বালার মুখ হয় দুই রকম—গুন্টি আর মকরমুখো। গুন্টি হলো গোলাকার গম্বুজের চূড়ার মতো। আর মকরমুখো কুমিরের মুখের আদলের মতো। মাঝখানটা একটু মোটা। দুই প্রান্ত সরু হয়ে কুমিরের মুখের আকার নিয়ে মিলে যায় মুখোমুখি। বালা ও হাঁসুলির ব্যবহার সর্বজনীন। খাড়ু তৈরি হয় রুপায়। দুটি খাড়ু বানাতে রুপা লাগে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় ভরি। প্রথমে রুপা হাঁতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পাতলা পাত বানাতে হয়। তারপর ওটাকে মুড়িয়ে বানাতে হয়ে ফাঁপা চুঙা। চুঙার ফাঁপা ভরে দেওয়া হয় গালা দিয়ে। ধূপ, পোড়া মাটি আর সরিষার তেল দিয়ে মণ্ড করে বানাতে হয় গালা। গালা পুরে দিয়ে পাতের ওপর সূক্ষ্ম ছেনি বা কাঁটা দিয়ে খোদাই করে তুলতে হয় নকশা। নকাশায় থাকে লতা-পাতা আর ফুল। লতা-পাতা ছাড়াও দড়ির মতো পাকানোও হয়। নকশা শেষে বের করে নেওয়া হয় গালা। নকশা তোলার কারিগর আবার আলাদা। অলংকার শিল্পে দু্ই ধরনের কারিগর আছে—‘গড়িত’ আর ‘নকশাকার’। একজন গড়েন আর একজন তোলেন নকশা। সুখীচরণ গড়িত কর্মকার।

 

সে একদিন ছিল

এক জোড়া খাড়ু বানাতে লেগে যায় প্রায় তিন দিন। সুখীচরণ ১০-১২ টাকা মজুরিতেও বানিয়েছেন খাড়ু। বর্তমানে এটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। তাতেও পোষাতে চায় না। একটা সময় ক্রেতারা সরাসরি চলে আসত তাঁদের কাছেই। মজুরিও পাওয়া যেত ভালো।

 

এখন অনিশ্চয়তা    

১৯৬৮ থেকে ২০১৭ সাল। কেটে গেল দীর্ঘ সময়। এই একটা পেশায়ই। বুড়িগঙ্গার পরিষ্কার জল নষ্ট হয়ে কালো হয়ে গেল। সুখীচরণের হাতের ডানে একটা ছোট্ট লোহার সিন্দুক, সামনে একটা কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর তিনটি কুপি, একটি মোমের আর দুটি গ্যাসের। পরিবর্তন যা হওয়ার হয়েছে, শুধু এই কুপিগুলোর। প্রথমে ছিল তেলের, তারপর এলো মোম আর সর্বশেষে এলো রিফিলযোগ্য গ্যাস সিলিন্ডার। ভয় হয়, অনিশ্চিত দিনও আসছে গুটিগুটি পায়ে।

 

মন্তব্য