kalerkantho

মুখার মানুষ

বরুণ দত্ত

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বরুণ দত্ত

বাবা ছিলেন যাত্রাদলের পোশাকশিল্পী। পাত্র-পাত্রীদের সাজিয়ে-গুছিয়ে রাজা-উজির করাই ছিল তাঁর কাজ।  বাবার কাজটা বরুণের মনে ধরে খুব। কাজের সময় ঘুরঘুর করতেন আশপাশে। এগিয়ে দিতেন এটা-সেটা। ধীরে ধীরে শিখে ফেলেন টুকটাক

বাবা এখন বিগত। শাঁখারীবাজারের ‘পোশাক ঘরের’ পরিচালক এখন তিনিই। তিনিই প্রধান কারিগর।  বাবা লক্ষ্মীনারায়ণ দত্ত পেশাটা পেয়েছিলেন তাঁর বাবা গৌরচন্দ্র দত্তের কাছ থেকে। তাঁকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে তুলে এনে ঢাকায় বসান নবাব বাহাদুর আহসানউল্লাহ। বরুণ আর তাঁর বাবা লক্ষ্মীনারায়ণের জন্ম ঢাকায়ই।

 

মুখোশ থেকে মুখা

তখনকার দিনে যাত্রার পাশাপাশি লোকনৃত্যেরও চল ছিল। লোকনৃত্যের জনপ্রিয় শাখা মুখোশ নৃত্য, কালী নৃত্য আর অবতার নৃত্য। চড়কের দিনগুলোতে হয় বেশি। এ ছাড়া গাঁয়ের মানুষ মুখোশ লাগায় পালাগান পরিবেশনার সময়ও। মুখোশের কথ্য বাংলা মুখা। গৌরচন্দ্র যাত্রাদলের পোশাকের পাশাপাশি মুখা বানাতে পারতেন ভালো। আর এর জন্যই নজরে পড়েছিলেন নবাব বাহাদুরের।

 

মুখার রকমফের

শক্তির দেবী কালীর মুখোশ হয় রক্তবর্ণের জিহ্বাসহ। শিবের তাণ্ডবনৃত্যের মুখা হয় জটাধারী। নৃসিংহ নৃত্যে দানবমূর্তির মুখোশ পরে দেখানো হয় দানবের নর্তনকুর্দন। দানবের প্রতীকে ১০ মাথার রাবণ হাজির হন প্রায়ই। রাবণের মুখা যেমন দেখতে, তেমন এর দামও। উত্তরবঙ্গে প্রচলিত আছে মুখা খেলা। এখানে রাজা-রানি, ঋষি-দরবেশ বা কাঠুরিয়ার দেখা মেলে।

বরুণ দত্তের মুখোশ

শাঁখারীবাজারের পোশাক ঘরের তাক আর টেবিলভর্তি বরুণ দত্তের বানানো মুখায়। ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দোকানের সামনে আর ভেতরের দেয়ালেও।  এসএসসির পর পড়ালেখাটা আর চালিয়ে যাননি। মনোযোগ দিয়েছেন ব্যবসায়। ১৯৮৬ সাল থেকে শুরু। এখনো নিজ হাতেই করেন পোশাক আর মুখোশ বানানোর সব কাজ। প্রতিটি মুখোশ বানান বেশ যত্ন করে, সময় নিয়ে। রাবণের মুখোশ বানাতে সময় লেগে যায় প্রায় পাঁচ দিন। এ ছাড়াও বানান বাঘ-ভালুুক-শেয়াল, বুড়া-বুড়ি, কার্তিক-দানব-অসুর, মহিষ-হনুমান আর নানা পাখির মুখোশ।

 

মুখোশ তৈরি

একটা সময় কাগজ আর কাপড়েই তৈরি হতো মুখোশ। ইদানীং কিছু কিছু হয় ফরমিকায়। তবে কাগজেই বেশি। প্রথমে খড় আর মাটি দিয়ে বানাতে হয় ছাঁচ। তারপর সেই ছাঁচের ওপর বিছাতে হয় ভেজা কাগজ। এর ওপরে মাখতে হয় আঠা। তার ওপর আবার ভেজা কাগজ। আবার আঠা, আবার ভেজা কাগজ। এভাবে পাঁচ-সাতটি স্তর। তারপর রেখে দিতে হয় শুকানোর জন্য। শুকানোর পর কয়েকটি টুকরা করে কেটে বের করে আনতে হয় ছাঁচ থেকে। তারপর আবারও আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে হয় টুকরাগুলো। তারপর আবার শুকাতে হয়। শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেলে সব শেষে করতে হয় রং। বরুণ দত্তকে সাহায্য করেন বৌদিসহ বাড়ির অন্য মহিলারা। আর কর্মচারীরাও। কালীর মুখোশটি লম্বায় বড়। আর রাবণেরটি পাশে। রাবণের মুখোশ তিন খণ্ডের। মাথায় পরার জন্য থাকে বড় একটি মুকুট। এটা যোদ্ধাদের শিরস্ত্রাণের মতো। এটার কপালে যুক্ত থাকে নানা রংয়ের পাথর বসানো তাজ। আর মাথার ডানে-বাঁয়ে বসানো থাকে একদিকে চারটি, অন্যদিকে পাঁচটি মাথা। সব মিলিয়ে ১০টি। রাবণ যেহেতু রাক্ষসদের রাজা, তাই তার চেহারাও বিকট করে দেখানো হয়।

 

দরদাম

রাবণের মুখার দাম এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এরপর কালীর ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অন্যগুলো প্রতিটি ১০০ টাকা।

 

মুখার মৌসুম

ফাল্গুন আর চৈত্র—এই দুই মাস মুখার মৌসুম। মুখোশনির্ভর নৃত্য আর পূজা-পার্বণগুলো হয় এ সময়ই। চৈত্র মাসে চড়ক আর কালীপূজা। হয় শিবের গাজনও। এ ছাড়া বৈশাখে বর্ষবরণের জন্য হয় শোভাযাত্রা আর বসে মেলা। এ সময় প্রচুর বিক্রি হয় পশুপাখির মুখোশ, বিশেষ করে বাঘের। এ ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় বানান বিয়ের মুকুট। প্লাস্টিকের মুখোশের প্রচলন ঘটলেও হাতে তৈরি মুখোশের চাহিদা এখনো টুকটাক আছে। মঞ্চে-থিয়েটারের লোকেরাও আসে তাঁর কাছে।

 ছবি : মাসুম সায়ীদ

মন্তব্য