kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

মৃিৎশিল্পী

অমূল্যচন্দ্র পাল

ধামরাই উপজেলার ইসলামপুরের কাগুজিপাড়া গ্রামের পালপাড়ায় অমূল্য পালের বাড়ি। টেপা পুতুলের কারিগর বললে ১০ গাঁয়ের লোক চেনে

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অমূল্যচন্দ্র পাল

দুই হাত পাশ একটা চিপা গলি। আঁকাবাঁকা। বেশ ভেতরে তাঁর টিনের চার চালা ঘর। শুয়েছিলেন। ডাক দিতেই উঠে বসলেন বিছানায়। আলো জ্বেলে ডাকলেন ভেতরে। আপনজনের মতো বসতে দিলেন খাটে। মনে হলো কত কালের পরিচয়! 

 

দুরন্ত শৈশব

১৩৪২ সনের ভাদ্র মাসে তাঁর জন্ম। সাভার উপজেলার পাথালিয়া গ্রামে। বাবা জিতেশ্বর আর মা গিরিবালা। ছোটবেলা থেকেই অমূল্য হাসিখুশি আর ফুর্তিবাজ মানুষ। ভর্তি হয়েছিলেন ইসলামপুরের হার্ডিংস স্কুলে। তবে স্কুলের পড়াটা আটকে যায় অষ্টম শ্রেণিতেই। কিন্তু বই পড়া, গান শোনা ব্রাহ্মণ-বোষ্টমদের কাছে তত্ত্ব কথা শোনার অভ্যাস রয়ে গেল।

 

শিল্পী হয়ে ওঠা

একসময় বাড়িতে বউ আসে। বউ পাশের বাড়ির মানুষ। দাদি শাশুড়ি হাসির ছলে পাড়লেন কথাটা, ‘ভাই, ব্যবসা শিখবা বাপের, মন্ত্র শিখবা সাপের। করো আর না করো—শিখা রাখ বাপের-দাদার কাম।’ মনে দাগ কাটে কথাটা। হাতে তুলে নেন মাটি। শুরু হয় পতুল দিয়ে। ধারাটা রক্তেই ছিল। শিল্পীর মনও ছিল। কাজটা পেরে উঠতে সময় লাগল না। বিয়ের পর দায়িত্ব বেড়ে যায়। মাটির জিনিস গড়া আর বেচাবিক্রি চালিয়ে যেতে থাকেন পুরোদমে। সব কিছু চলছিল একরকম। এরই মধ্যে শুরু হয় স্বাধীনতাসংগ্রাম। পালিয়ে সপরিবারে আশ্রয় নেন ভারতে। স্বাধীনতার পর ফিরলেন। কিন্তু পাথালিয়ায় আর না। তার বদলে কাকলাজানি নদীর তীরে কাগুজিপাড়ায়।

 

মেলা জমিয়ে দিলেন

১৯৭৫ সাল। দুই ভাই মিলে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করে ফিরছিলেন বাড়ি। নবীনগর স্মৃতিসৌধের সামনে রাস্তার পাশে গাছের নিচে বসেছেন জিরাতে। ঘুরতে আসা লোকদের কেউ কেউ আগ্রহ করে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকেন এটা-সেটা। একটি-দুটি বিক্রিও হয়। তাই দেখে দুই ভাই বসলেন আরো কিছুক্ষণ। এক-দুই টাকা করে বিক্রি হয় মোট ৩২ টাকা। সেকালের হিসাবে বিরাট ব্যাপার। এতে বেড়ে যায় আগ্রহ। আর মাথায় আসে নতুন চিন্তা। তারপর নিয়ম করে শুক্র-শনি দুই বন্ধের দিনে চলে আসতেন নবীনগর। খুলে বসতেন পসরা। তাঁর দেখাদেখি আরো অনেকেই। নবীনগরের ‘মৃৎ ও কুটির শিল্প বাজার’-এর এই হলো গোড়ার কথা। আনুষ্ঠানিক বাজার শুরু হলে একটা দোকানও বরাদ্দ পান অমল চন্দ্র। এখন এটা ছোট ভাইয়ের হাতে।

তৈজসপত্রের বাইরে গিয়ে শোপিসজাতীয় জিনিস তিনিই বানাতে শুরু করেন প্রথম। দেব-দেবীর  মূর্তি, বুদ্ধদেবের মূর্তি, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদনের প্রতিকৃতিও গড়েছেন হুবহু। নজর কেড়েছেন দেশি-বিদেশি অনেক গবেষকের, বিশেষ করে মার্কিন মুল্লুকের হেনরি গ্লাসির। ‘আর্ট অ্যান্ড লাইফ ইন বাংলাদেশ’ বইতে অমূল্যর বেশ কিছু কাজ আছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে অমূল্য পেয়েছেন লোকশিল্পের সনদ।

 

একাল-সেকাল

তখনকার দিনে মাটির কাজ মানেই হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, মটকি, সরা, ঢাকনা, ঘটি, সানকি, তামাক খাওয়ার কলকে—মোট কথা ঘরের কাজের সবই তৈরি হতো মাটির। মাথায় বা কাঁধে বয়ে নিয়ে যেতে হতো গ্রামগঞ্জে। ধানের বিনিময়ে সওদা চলত। বৈশাখ মাসে কর্মবিরতি। এ মাসে নির্মাণ মানা। মহিলারা নাইওর যায়। পুরুষরা বিলঝিল থেকে মাটি সংগ্রহ করে। পাতিল বানানোর জন্য দরকার হয় এঁটেল মাটির। এটা আবার দুই রকম। সাদা আর কালো। সাদাটা নরম, কালোটা শক্ত। দুই মাটি মিলিয়ে নিতে হয় একসঙ্গে। চৈত্র-বৈশাখে গৃহস্থের পলি পড়া জমি থেকে মাটি কেটে উঁচু জায়গায় স্তূপ করে রাখা হতো। তারপর বর্ষায় আনা হতো বাড়ি। নৌকায় মাটি আর হাঁড়ি-পাতিল বহন করা সহজ বলে পালপাড়াগুলো বেশির ভাগই নদীর তীরে। অমল চন্দ্রের বাড়িও নদীর ধারে।

কাকলাজানির পাড়ে বটতলা

নদীটার নাম কাকলাজানি। পাড়ে আছে বিশাল এক বটগাছ। বটের তলায় অমূল্যর মাটি রাখার ব্যবস্থা, পাশেই পোড়ানোর চুল্লি। আগে উন্মুক্ত থাকত। এখন ওপরে চালা আর চারপাশটা প্লাস্টিকের চাটাই দিয়ে ঘেরা। মাটির জন্য তখন জমির মালিককে টাকা দিতে হতো না। বর্ষায় পলি পড়া উঁচু-নিচু ক্ষেত থেকে মাটি কেটে পালেরা সমান করে দিত। তাতেই খুশি থাকত তারা। কিন্তু এখন কিনে আনতে হয়। মাঝারি আকারের এক নৌকা মাটি চার হাজার টাকা। বাড়িতে আনার পর শুরু হয় মাটি প্রস্তুতির পর্ব। মাটির কাজে এ পর্বটাই পরিশ্রমের। এখন শ্রমিক দিয়ে করানো হয় কাজটা। এক নৌকা মাটি ছানা করতে খরচ হয় দুই হাজার টাকা। এক দফা পাতিল পোড়াতে সময় লাগে সাত দিন। খড়ি লাগে প্রায় ২০ মণের মতো। সঙ্গে দরকার পড়ে কাঠের গুঁড়া বা ধানের তুষ। আগের দিনে খড়িটাও এমনিই জোগাড় করা যেত আড়া জঙ্গল থেকে। এখন কিনতে হয় মণ হিসেবে।

 

পালাবদলের টানে

মেটাল আর প্লাস্টিকের কাছে হেরে গেছে মাটি। এখন শুধু ফুলের টব, অল্প কিছু শোপিস আর টেরাকোটায় এসে ঠেকেছে মাটির জিনিসের চাহিদা। তাও আবার নগরেই সীমাবদ্ধ। আগের বিপুল চাহিদার বিপরীতে এটা খুবই সামান্য। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে—পেশা পরিবর্তন। অমূল্যর দুই মেয়ে বড়। তারা মাটির কাজ ভালোই জানে। কিন্তু একমাত্র ছেলে করে দর্জির কাজ। মাটির কাজে সে আর ফিরবে না।

 

পুতুল গড়ার মুহূর্ত

বারান্দার একপাশে ছানা মাটি। অন্য পাশে কয়েকটি কাঁচা ফুলের টব। শুকানোর জন্য উপুড় করে রাখা। মধ্যে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। একটি নিচু টুল নিয়ে বসলেন সেখানেই। সামনে একটা কাঠের পিঁড়ি। একদলা মাটি নিয়ে রাখলেন পিঁড়ির কোনায়। একটা পাত্রে একটু পানি। শুরুর পর্বটা ঠিক রুটি বানানোর মতোই। মাটি ডলে ছোট্ট নোড়া বানালেন। পিঁড়িতে মাটি যাতে আটকে না যায় এ জন্য ব্যবহূত হলো ছাই। নোড়াটা দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে দুই বুড়ো আঙুল আর অনামিকায় চাপ দিলেন। তৈরি হলো দুটি ভাগ। এক ভাগে থাকল তিন ভাগের এক ভাগ, অন্যটাতে থাকল দুই ভাগ। ছোট ভাগটার নিচের দিকটা স্কার্টের মতো। বুঝলাম এটা হলো পুতুলের পায়ের দিক। তারপর বড় ভাগটাকেও ভাগ করা হলো ওই একই অনুপাতে। এখানে ছোট ভাগটা থাকল ওপরের দিকে। বড় ভাগটা থেকে নিখুঁতভাবে বের করে আনা হলো নারীর স্ফীত বুক আর সরু কোমর। তারপর ছোট ভাগ থেকে মুখ, কপাল আর মাথা। খোঁপা চূড়া আর দুই হাতের জন্য নেওয়া হলো আলাদা মাটি। কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। বেরিয়ে এলো একটা নারী। পুরো সময়টা রুদ্ধশ্বাসে কাটল আমার। পরপর দুটি পুতুল গড়লেন। তারপর উঠতে হলো তাঁকে। আজ তাঁর মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা।      

 

আমার ভেতর আরেক আমি

পালপাড়ার মাটির কারিগরের জীবনের বাইরেও অমূল্যচন্দ্রের একটা অন্য ভুবন আছে। সেখানে একান্তই ভিন্ন এক মানুষ তিনি। বাউল আর পালা গানের ভুবন সেটা। গান লেখেন। সুরও বাঁধেন। আবার দলবলসহ আসরেও দাঁড়ান। লেখেন হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রীয় সংগীতও। রাধা-কৃষ্ণের লীলা কীর্তন করেন। করেন চৈত্র মাসের নীল পূজার গান। বেদ-বেদান্ত-পুরাণসহ, রামায়ণ-মহাভারতের অনেক তত্ত্ব-কাহিনি তাঁর জানা। জানা আছে বৈষ্ণবদের পঞ্চরসের তত্ত্বও। লিখেছেন অসংখ্য গান। ছোট-বড় মিলিয়ে এক তোড়া খাতা জমে গেছে গানের।

 

জীবন এক পুতুলখেলা

অনেক ভাঙা-গড়া দেখলেন এক জীবনে। ইতিহাস হয়ে যেতে দেখলেন পৈতৃক পেশাটাকে। জগৎ-সংসারটাও এক পুতুলখেলা। নিজেও এক পুতুল। ৮১ বছর বয়স। ভাবেন এখন নিজেই ইতিহাস হয়ে যাবেন যেকোনো সময়। শুধুই অপেক্ষা!

ছবি : মাসুম সায়ীদ

 

মন্তব্য