kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

সুতায় বাঁধা জীবন

মিয়াচাঁন

চুলের চেয়েও মিহি পাখির পালকের চেয়েও নরম, রংবেরংয়ের রেশমি সুতা। সেই সুতায় বাঁধা পড়ে আছে তাঁর জীবন। শুরুটা ২৬ বছর আগে। বাঁধনটা খুব জটিল আর দুরূহ। কাহিনিটা মিয়াচাঁনের

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মিয়াচাঁন

মিয়াচাঁন তাঁতশিল্পী। হাতে টানার তাঁতে বুনে যান তাঁতের শাড়ি পাতরাইল বাজারের উত্তম কুমারের তাঁতঘরে বসে। এই শাড়িই টাঙ্গাইলের বিখ্যাত তাঁতের শাড়ি।

হাতে টানা তাঁত

তাঁতশিল্প বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। মসলিনের ভুবনবিজয়ী স্বর্ণসময় এখন আর নেই। কিন্তু তারই ঐতিহ্যের খানিকটা ধরে রেখেছে টাঙ্গাইলের তাঁতের কাপড়। কালিহাতীর বল্লা, সদর উপজেলার বাজিতপুর আর দেলদুয়ারের পাতরাইলে তৈরি হচ্ছে এসব কাপড়। বাজিতপুর আর পাতরাইলের বাতাসে হাতে টানা তাঁতের মাকু এখনো শব্দ তুলে টাকুরটুকুর।

 

রেশমি স্বপ্ন

দেলদুয়ারের গোয়ারিয়া গ্রাম। পাতরাইল বাজার থেকে আড়াই-তিন মাইল দূরে। সৈয়দ আলী আর বাহারজানের দরিদ্র সংসারে মিয়াচাঁনের জন্ম। কিশোর বয়স থেকেই তাঁকে নামতে হয় জীবিকার সন্ধানে। ক্ষেত-খামারে দিনমজুরের কাজ করতে পারতেন না। তাই বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন তাঁতের কাজে। সেটা ২৬ বছর আগের কথা। প্রথম কাজ ছিল চরকায় সুতা গোছানো। কাজটা ভালোই লাগত প্রথম প্রথম। শুকাতে দেওয়া রংবেরংয়ের সুতা দুলত চোখের সামনে। সেই সঙ্গে দুলত তাঁর বুক ভরা স্বপ্ন। থিরথির করে কাঁপত বুকটা আবেগে। চরকায় সুতা তুলতে গিয়ে হয়ে যেতেন আনমনা। সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনত বাস্তবে। শিরদাঁড়া টানটান করে মনোযোগ দিতেন কাজে। কাজটা তাঁকে শিখতেই হবে দ্রুত। যে করেই হোক। মিয়াচাঁন ছয় মাসের মাথায় বসে যান তাঁতে।

পরিশ্রমের কাজ

তাঁত চালানো খুব পরিশ্রমের কাজ। শারীরিক আর মানসিক—দুদিক থেকেই। তাঁত যন্ত্রটার খুঁটিনাটি দেখিয়ে বলে গেলেন সে কথা। এক হাতে টানতে হয় হাতেম—যেটাতে বাঁধা থাকে মেরার দড়ি। অন্য হাতে ভারী ফাইসেল। আর নকশা তোলার জন্য পা দিয়ে চাপ দিতে হয় মাথার ওপরে রাখা নকশা-কলের লিভার বাঁধা লাঠিতে। মাথায় রাখতে হয় জো বা বুননের ধারাবাহিকতা। এখন নকশা ওঠে মেশিনে। এই মেশিন আবার কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সে রকম কোনো অটো মেশিন নয়, স্রেফ কয়েকটি লোহার কলকব্জা। আর সুতায় ঝুলানো কয়টি কাঠি। এটা বসানো থাকে মাথার ওপরে। ভাঁজ করা তালপাখার পাতার আকারের মোটা কাগজ ছিদ্র করে বানানো হয় নকশার ছাঁচ বা ব্লক। এই ব্লকের ধাক্কায় ওঠানামা করে সুতা। আর তাতেই শাড়ির বুকে ফুটে উঠতে থাকে ফুল-লতা-পাতা। তখনকার দিনে নকশা করার কল ছিল না। পুরো কাজটা করতে হতো তাঁতিকেই মাথা খাটিয়ে। কাজটা ছিল সুচের ফোঁড়ে নকশা ফুটিয়ে তোলার মতো অনেকটা। তখন নকশা থাকত কারিগরদের মনে। আর তাই একেকজন কারিগরকে হতে হতো একেকজন শিল্পী। কদরও ছিল তখন কারিগরদের। ভালো কাজ করতে পারাটা ছিল গর্বের।

 

তাঁত একটা মিশ্র শিল্প

তাঁত একটা মিশ্র শিল্প। সুতা থেকে কাপড় পর্যন্ত আছে কয়েকটি ধাপ। প্রথমেই সুতার কথা—সুতা থাকে সাদা; তাঁতিরা বরাবরই আমদানি করতেন সুতা। তারপর সুতায় রং করা। রংয়ের পর গোছানো। গোছানো সুতা শাড়ির জন্য গুনে গুনে পেঁচায় তোলা। পেঁচা হচ্ছে কাঠের ভারী একটা ডলনা। সুতা পেঁচানো হয় বলে এর নাম পেঁচা। এটা থাকে সামনের দিকে কয়েক হাতে দূরে। এ রকম আর একটি ডলনা থাকে তাঁতির কোলের ওপর। এটার নাম মোড়া। এটাও পেঁচার মতো কাঠের ডলনা। পেঁচায় তোলা সুতা সানার ভেতর দিয়ে নিয়ে টানটান করে বাঁধতে হয় মোড়ার সঙ্গে। পেঁচানো সুতার মাথা মুড়িয়ে জোড়াটা দেওয়া হয় বলে কাজটার নামও মোড়া। আবার বোনানো শাড়ি এটাতে মুড়িয়ে রাখা হয় বলে কাঠটার নামও মোড়া। পেঁচা-মোড়া আগের দিনের ফিল্ম ক্যামেরার রিলের মতো—একটা থেকে টেনে নিয়ে আরেকটাতে জড়ানো। পেঁচায় সুতা আর মোড়ায় শাড়ি। পেঁচা মোড়ার মধ্যে থাকে সানা। এটা আসলে একটি চিরুনি। এর কাজ প্রতিটি সুতাকে আলাদা রাখা। আগের দিনে সানা ছিল বাঁশের, এখন ধাতুর। সানা আটকানো থাকে কাঠের বাতায়। এটার নাম ফাইসেল। ফাইসেলের কাজ সুতার বুনট পোক্ত করা। ফাইসেলের দুই মাথায় দেড় ফুট লম্বা দুটি রড থাকে। এই রডের ভেতর ঢুকানো থাকে আংটা লাগানো এক খণ্ড কাঠ। এটার নাম মেরা। মেরার কাজ পিস্টনের মতো। আংটায় যুক্ত দড়ির মাথায় বাঁধা থাকে কাঠের হাতল। এর নাম হাতেম। হাতেমে টান দিলে টান পড়ে মেরায়। আর মেরা ধাক্কা দেয় মাকুকে। মাকু হলো সুতার ববিন কেস। কাঠের তৈরি। ফুটখানেক লম্বা, চিকন। এর পেটের খাঁজে থাকে সুতার কাঠি। আর দুই মাথা সুচাল। ধাক্কা খেয়ে মাকু সানায় পরানো সুতার মধ্য দিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে এ পাশ-ও পাশ। বোনা হতে থাকে শাড়ি। তাঁতিরা ডান হাতে টানেন হাতিম, বাঁ হাতে ফাইসেল। আর পা দিয়ে চেপে ধরেন নকশাকলের লিভার। কোনো রকম জ্বালানি ছাড়াই তাঁতির পেশিশক্তিতেই চলে তাঁত। সুতা রং করা, চড়কায় গোছানো, পেঁচা, মোড়া, সানা পরানো, বোনা সব শেষে বিক্রি—সব কিছুর জন্য চাই আলাদা আলাদা লোক।

স্বপ্ন দূরগামী

মিয়াচাঁনের বানানো শাড়ি সেই ১৫-২০-বছর আগেও তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হতো। বিয়ের সময়ই ধাক্কাটা খেলেন প্রথম। বুঝলেন নিজের বানানো একটা শাড়ি বউকে পরানোর সাধ্য তাঁর নেই। একটা শাড়ি বুনতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই দিন। শুরুর দিকে মজুরি পেতেন ৭০-৮০ টাকা। তারপর ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। কালক্রমে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কিন্তু সংসারের টানাটানি কমেনি কোনো দিন। নিজে তাঁত গড়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার সাধ্য তাঁর নেই। একটা তাঁত বসাতে বর্তমানে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। জায়গা আর ঘরের খরচ তো আছেই। ব্যবসার জন্য কমপক্ষে ১০-১২টি তাঁত দরকার। একসঙ্গে কিনতে হবে সুতা। অনেক টাকা পুঁজি দরকার। তার চেয়ে বড় কথা বিক্রি। এত দামের কাপড় গ্রাম্য হাটবাজারে বিক্রি হয় না। পাইকারি মার্কেটে নিজের কোঠা—মানে দোকান থাকতে হয়। থাকতে হয় বড় বড় পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ। কালক্রমে বুঝেছেন বুনানোর মতো তাঁতের শাড়ি বিপণনেও আছে ঝক্কিঝামেলা। নিজের কোঠা না থাকলে অন্যের কোঠায় মাল দিতে হয়। তারা যে দাম ধরে দেবে সেই দামেই থাকতে হবে খুশি। লাভ হোক আর না হোক। এখানে লাভবান হন কোঠার মালিকরা। বড় শহরে যাঁদের দোকান তাঁরা আর যাঁরা রপ্তানি করেন বিদেশে তাঁরা।

 

তাঁত থাকছে না হাতে

মিয়াচাঁনসহ তাঁর সতীর্থরা বুঝে গেছেন তাঁতের কাজটাও এখন আর হাতে থাকছে না। সব চলে যাচ্ছে মেশিনে। সুতা রং করা, শুকানো, গোছানো হয় মেশিনে। নকশা হয় কম্পিউটারে। আর বুনানোর জন্য এসেছে পাওয়ার লুম বা বৈদ্যুতিক মেশিন। মেশিনে প্রডাকশন হয় বেশি। লোক লাগে কম। ফলে খরচ পড়ে কম। মেশিনের কাজটাও হয় নিখুঁত। প্রতিযোগিতায় হাতের তাঁত টিকবে কিভাবে?

 

বিবর্ণ সময়

কাজটা কষ্টের হলেও জীবনটা চালিয়ে নেওয়ার তাগিদেই সুতার বাঁধন কাটতে পারছেন না মিয়াচাঁন। এখন বয়স নেই পেশা পরিবর্তনের। মেয়েটা বড়। বিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা এখনো ছোট। স্কুলে যায়। ছোট হলেও সংসার চালাতে হয় তাঁত চালিয়েই। ঘুম থেকে উঠে টিফিন ক্যারিয়ারে দুপুরের ভাতের বাটি বেঁধে আড়াই মাইল সাইকেল চালিয়ে রোজ কাজে আসতে এখন ক্লান্তই লাগে। তবু প্রতিদিন কাজে আসেন। বেঁচে থাকতেই এখন তাঁতের হাতেম টানা।

     ছবি : মাসুম সায়ীদ

মন্তব্য