kalerkantho

ঢোল মানুষ

সুবর্ণ ঢাকি

বাবা ছিলেন চামড়ার কারবারি। অবসরে বাজাতেন মৃদঙ্গ। ছোট্ট ছেলে সুবর্ণ। বাবার ঢোলের তালে তালে দুলতেন। সেই ছেলেটি এখন পুরোদস্তুর ঢুলি

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুবর্ণ ঢাকি

প্রাইমারি স্কুল পাস করে সুবর্ণ ভর্তি হন হাই স্কুলে। দুরন্ত শৈশব-কৈশোর আর দশজনের মতোই। রামরাবণ ঋষিপাড়া এমনিতেই জমজমাট। গাঁয়ে আছে রাধাকৃষ্ণের মন্দির। পূজা-পার্বণ লেগেই থাকে। এই উৎসব-আমুদের অন্যতম অনুষঙ্গ ঢাক। তাল তো গাঁথাই ছিল মনে। কাঁধে উঠল ঢাক। আরতিতে গাঁয়ের মন্দিরে ঢাক বাজান তরুণ সুবর্ণ। সাভার থেকে গাঁয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন রেখারানী দাস। চোখে পড়ে সুবর্ণকে। বাজান ভালোই। দুই তরুণ-তরুণীর মনের মিল হতে সময় লাগে না বেশি। এর সূত্র ধরেই বিয়ে। আর বিয়ে মানেই সংসার। বিয়ের পর দুজনেই বুঝতে পারেন, সংসার অনেক কঠিন। সুবর্ণের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তখনো।

 

ঢাকের কাঠিতে জীবিকা

কিছু একটা করা চাই, জীবিকাই তখন ধ্যান-জ্ঞান। বাবার কারবারটাও তখন ভালো নয়। অল্প লেখাপড়ায় কে দেবে চাকরি? অগত্যা ঢাকই সম্বল। কিন্তু সেটারও একটা শুরু চাই, গুরু চাই। মিলেও গেল। ওস্তাদ সুকুমারচন্দ্র দাস। অনেক দিন থেকেই ঢাক বাজান তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে বায়না আসে। ‘থাক আমার সঙ্গে, দেখি কী হয়?’ ভরসা দেন। দুর্গাপূজার সময়। ওস্তাদের বায়না সাভারের ফোর্ডনগরে। সেটাই প্রথম দুর্গাপূজার কাজ সুবর্ণের। কেটে গেল দুটি বছর এভাবেই। ওস্তাদের ডাকে তাঁর ডাক।

 

ঢাক-ঢোলের কথা

ঢাক ও ঢোল দেশি বাদ্যযন্ত্র। এটি তৈরি হয় কাঠ আর চামড়ায়। দুই থেকে আড়াই হাতের মতো লম্বা কাঠের পিপা। দুই মুখ খোলা। এই খোলা মুখ চামড়ায় মুড়ে নিলেই হয়ে গেল ঢোল। পিপা বা খোলটা বানাতে হয় আমকাঠ দিয়ে। আস্ত একটা গুঁড়ি খোদাই করে। আর ছাউনিটা ছাগলের চামড়া পাকিয়ে। এটার জন্য কারিগর আছে আলাদা। খোলের সঙ্গে চামড়া আটকাতে হয় বাঁশ বা কাঠের রিং দিয়ে। দুই পাশের রিং আড়াআড়ি বাঁধা হয় পাকা চামড়া বা প্লাস্টিকের মজবুত রশি দিয়ে। আর প্রয়োজন মতো চামড়া টানটান করার জন্য আড়াআড়ি রশিতে দেওয়া থাকে রিং। রিং টানলেই কষে যায় বাঁধন। ঢোলের আওয়াজও হয়ে ওঠে কড়া। বিপত্তিও ঘটে। মাঝে মাঝে ছিঁড়ে যায় বাঁধন বা চামড়ার ছাউনি। ঢোলের খোলের গড়নটা একটু আলাদা। লাউয়ের মতো একদিকে মোটা, অন্যদিকটা চিকন। ঢাক আগাগোড়া সমান। আর  ঢোলের পেট একটু মোটা।

 

স্বাধীন জীবন

বাথুলি বিলেশ্বর গ্রাম। ধামরাই উপজেলার মধ্যে। সেখান থেকে বায়না এলো। ঢাকি জীবনের প্রথম ডাক সেটা (ওস্তাদের কাছ ছাড়া হওয়ার পর)। পূজার বায়না ছিল সেটা। থাকতে হবে সাত দিন। গেলেন ঢাক কাঁধে করে একা। শেষ হলো পূজা। ফেরার পথে কর্তৃপক্ষ হাতে দিলেন এক হাজার ৮০০ টাকা। সালটা মনে নেই। ভগবান মুখ তুললেন এত দিনে। সেই থেকে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, চড়কপূজা, সরস্বতী পূজার ডাক আসতে থাকে একের পর এক। ডাক পড়ে কীর্তনসহ নানা পার্বণেও। আর এ সময়ই শুরু হয় ঢাকের সঙ্গে ঢোলেও তাল ঠোকা।

 

বাদক দলে সখ্য

গাঁয়ে একটা বাদক দল আছে। জনাপাঁচেক মানুষ সে দলে। বিগ ড্রাম, সাইড ড্রাম, ট্রামপিট বা ভেঁপু আর করতাল বা খঞ্জনির মিলিত মূর্ছনা তুলে তাঁরা আসর জমান। বিয়েশাদি, মুসলমানি, মিছিল এমনকি বড় বড় দুর্গাপূজায়ও ডাক পড়ে তাঁদের। দলে একজন ঢাকি থাকলে ভালো হয় পূজা-পার্বণে। তাঁরা ডেকে নেন সুবর্ণকে ঢাকি হিসেবে। বিশ্রামে বা বিরতিতে ঢাক আর ঢোলের কাঠি নামিয়ে মাঝে মাঝে হাতে নিতেন সঙ্গীদের ট্রাম্পেট বা ভেঁপু। পিতলের পেঁচানো এই বাঁশিটাতে আছে তিনটি বোতাম। পেঁচানো নলের ভেতর বাতাস ফুঁকে শব্দ করা শক্ত কাজ। দম লাগে লম্বা। আর তার ওপর বোতাম টিপে আটকে দিতে হয় বাতাস। সুবর্ণকে ওটা তুলে নিতে দেখে সতীর্থরা মুচকি হাসেন। সুবর্ণও কম যান না। কাজটা তিনি করেই ছাড়েন। বাদক দলে তাঁর স্থান হয়ে যায় পাকা। একটু স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেন তিনি।

 

বাবা সুবর্ণ

সুবর্ণ আর রেখারানীর ঘর আলো করে প্রথম সন্তান কোলে আসে ১৪ বছর আগে। তখনো সুদিন আসেনি সংসারে। সুবর্ণ তখন শুধুই ঢাকি। এরপর মেজো আসে সাত বছর পর। সেটাও ছেলে। সাত মাস আগে জন্ম নেয় কন্যা পৌলবী। সে যেন সুদিনের আলো।

     ছবি : মাসুম সায়ীদ

মন্তব্য