kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন : দুঃশ্চিন্তায় অভিবাসন প্রত্যাশীরা

শামীম আল আমিন, নিউইয়র্ক থেকে   

১৫ অক্টোবর, ২০২০ ১৭:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন : দুঃশ্চিন্তায় অভিবাসন প্রত্যাশীরা

ছবি : সংগৃহীত

শফিক হাওলাদার (ছদ্মনাম) নিউইয়র্কের অ্যালমহার্স্ট এলাকায় বসবাস করেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে। ভ্রমণ ভিসা বি ওয়ান/বি টু তে যুক্তরাষ্ট্রে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভের আশায় আবেদন করেছিলেন ছয় মাসের মাথায়। কিন্তু সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও, তাকে এমনকি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য এখনো ডাকা হয়নি। ফলে বৈধভাবে এদেশে থাকার ক্ষেত্রে তার আদৌ কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়।

এমন অনেক শফিক হাওলাদার অভিবাসনের জন্যে আবেদন করে ঝুলে আছেন বছরের পর বছর। আর যারা অবৈধ উপায়ে এসেছেন তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়টায় অভিবাসন ব্যবস্থা এগুচ্ছে ধীর গতিতে। টেনেসিতে বসবাসকারী এটর্নি রাজু মহাজন কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, 'অভিবাসন ট্রাম্প সরকারের অগ্রাধিকারের কোনো বিষয় নয়।'   

একদিকে করোনা মহামারী, তার মধ্যে নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রত্যাশীরা রয়েছেন গভীর শঙ্কা ও দুঃশ্চিন্তায়। তাদের মধ্যে প্রশ্ন কি হতে যাচ্ছে? করোনায় প্রায় স্থবির অভিবাসন ব্যবস্থা কি নির্বাচনের পর গতি পাবে, নাকি অবস্থা হবে আরো খারাপ হবে? এমন অনেক প্রশ্নের কোনো উত্তর পাচ্ছেন না অভিবাসন প্রত্যাশীরা। এই অবস্থা কেবল বাংলাদেশি নয়, সবার জন্যেই প্রযোজ্য।

বিশিষ্ট আইনজীবী এটর্নি রাজু মহাজন পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন নিজের মতো করে। তিনি বলেন, 'নির্বাচনে যদি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন বিজয়ী হন, তাহলে বর্তমানের অনেক ইমিগ্রেশন নীতিতে পরিবর্তন আসবে। খুব সহজ করে বললে, বারাক ওবামার আমলে যে অভিবাসন নীতি ছিল, আমরা সেই অবস্থায় ফিরে যাবো। অর্থাৎ মানবিক অনেক ক্ষেত্র, যেমন অ্যাসাইলাম, উদ্বাস্তু সংকট দ্রুততার সাথে সমাধান হবে। যেগুলো কার্যত অনেকটা বন্ধ রয়েছে, সেগুলো চালু হবে। অভিভাসনের বিষয়গুলো সহজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।'

রাজু মহাজন আরো বলেন, 'জো বাইডেন বিজয়ী হলে অভিবাসনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাবে।  ইমিগ্রেশন বিচারপতির সংখ্যা বাড়বে। সিদ্ধান্ত দ্রুত আসবে।' কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি আবারো বিজয়ী হন, তাহলে কি হবে? এমন প্রশ্নে এটর্নি রাজু বলেন, 'বর্তমান যে অবস্থা রয়েছে, এটাই বজায় থাকবে। অথবা এর চেয়ে আরেকটু খারাপও হতে পারে। আশ্রয়প্রার্থী এবং উদ্বাস্তুদের কেসগুলো আগের মতোই ঝুলে থাকবে।' এমনকি বিষয়গুলো আরো কঠিন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।  

এটর্নি রাজু মহাজন বলেন, 'একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, মেধাভিক্তিক অভিবাসন চালু হবে। দেখুন মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা এমনিতেই এখানে চালু রয়েছে। এই যে ইবি ক্যাটাগরি এটিতো মেধাভিত্তিকই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিজয়ী হলেও অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।' 
তিনি মনে করেন, চেইন ইমিগ্রেশন বা পারিবারিকভাবে যারা এদেশে আসেন সেই ব্যবস্থা বন্ধ হবে না। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি মেধাভিত্তিক হয়ে যাবে, এমনটাও মনে করেন না রাজু মহাজন। 

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এদেশে কারো জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে যে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, সেটা সাংবিধানিক একটি অধিকার। ফলে এটা পরিবর্তন করা অনেক বেশি কঠিন।

ডেমোক্রেটিক দল যারা সমর্থন করেন, তারা মনে করেন এই দলটি অভিবাসীদের জন্যে ভালো। নিবন্ধিত ডেমোক্রেট ও শিক্ষাবিদ শেখ আল মামুন বলছিলেন, 'ডেমোক্রেট মানেই অভিবাসী বান্ধব। এটি তাদের কাছে অগ্রাধিকারের একটি বিষয়। কেননা এই দেশটি গড়ে তুলেছে অভিবাসীরা।' ডাকা কর্মসূচির কথা তুলে ধরে মামুন বলছিলেন, 'প্রেসিডেন্ট ওবামাই এই ব্যবস্থাটি চালু করেছিলেন।'

জানা যায়, ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভাল বা ডাকা নামে একটি কর্মসূচির অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যেটিকে ড্রিম অ্যাক্ট বলা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুন সই করা ওই আদেশে যারা শৈশবে বাবা মায়ের হাত ধরে অবৈধ উপায় এদেশে এসেছিলেন কিন্তু কার্যত কোনো কাগজপত্র নেই, তাদের এদেশে থাকার এক ধরণের বৈধতা দেওয়া হয়। প্রতি দুই বছর পর পর সেটি নবায়ত করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে একজন আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ও কাজ করার অনুমতি পান। তবে শর্ত হিসেবে তিনি কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারবেন না। এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় আট লাখ মানুষ নিবন্ধিত রয়েছেন।

তবে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকরা মনে করেন না যে তাদের দল অভিবাসিবান্ধব নয়। বাংলাদেশি আমেরিকান রিপাবলিকান ককাসের চেয়ারম্যান ওয়াসি চৌধুরী বলেন, অনেকেই ভুলে যান, রিপাবলিকানদের কারণেই তারা এই দেশে আসতে পেরেছেন।' তিনি উল্লেখ করেন, '১৯৮৬ এর এমিনেস্টি দিয়েছিল রিপাবলিকানরাই। ওপি ওয়ান এবং ডিভি বা ডাইভারসিটি লটারির মাধ্যমে অনেকে এদেশে এসেছেন, সেটাও দিয়েছে রিপাবলিকানরাই।'

ওয়াসি চৌধুরী মনে করেন, রিপাবলিকানরা আনডকুমেন্টেড অভিবাসীদের ক্ষেত্রেই কেবল একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অপরাধীদেরকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পক্ষে। তিনি সীমান্তে দেয়াল দিতে চান, দিচ্ছেন। দেশকে সুরক্ষিত করতে চান তিনি।'

এই রিপাবলিকান সমর্থক অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে ডিপোর্ট বা অবৈধদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।

জানা গেছে, ওপি ওয়ান চালু করেছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ১৯৮৯ সালের দিকে। রিপাবলিকান এই প্রেসিইডেন্ট যিনি সিনিয়র বুশ নামে পরিচিত, তিনি 'ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট অব ১৯৯০' সই করেছিলেন।

ডেমোক্রেটদের সমর্থন নিয়েই ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর এই কার্যক্রমে সই করার মধ্য দিয়ে চালু হয় ডিভি লটারি বা ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্যে লটারির মাধ্যমে বছরে ৫৫ হাজার অভিবাসী ভিসা ইস্যু করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা