kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

মেয়েদের সাথে সকার খেলে ৪-১ গোলে হারলাম

সোহেল রানা   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ১৫:১৩ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মেয়েদের সাথে সকার খেলে ৪-১ গোলে হারলাম

এক গবেষণার কাজে আমি আর আমার কো-রিসার্চার স্থানীয় এক লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম দু'দিন আগে।  আমার কো রিসার্চার একজন ব্রিটিশ তরুণী। সেই তরুণী ড্রাইভ করে আমাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের এক বৃদ্ধা নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা। যিনি সাক্ষাৎকার দেবেন তার বয়স ৭৪ বছর। 

আমরা দুজন অপেক্ষা করছিলাম সেই বৃদ্ধার আসার জন্য। সকাল ১১ টার দিকে তিনি এলেন। উনাকে দেখে তো আমার চক্ষু কপালে। ঠিকমতো হাঁটতেই পারছেন না। হাতে এক অদ্ভুতাকার স্ক্র‍্যাচ, হাঁটছেন খুব ধীরে। লাইব্রেরিতে বসার পর জানতে পারলাম উনি মাল্টিপল  স্কেলেরোসিস রোগে আক্রান্ত। এই রোগ আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল বা ডিজএবল করে দেয়। ফলে,  আপনি দৃষ্টিশক্তি, ভারসাম্য,  শরীরের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। 

আমি অবাক হলাম কারণ, এরকম কঠিন একটা রোগ নিয়ে প্রায় পঙ্গু একজন নারী এসেছেন সাক্ষাৎকার দিতে। আরো মজার ব্যাপার হলো উনি এসেছেন নিজে ড্রাইভ করে। 

মিনেসোটার পথে প্রান্তরে যেখানেই আমি একটা বিষয় আমি খেয়াল করেছি।  এখানকার মেয়েরা ছেলেরা প্রকৃত অর্থেই সমান সমান ও স্বাধীন। আপনার হয়তো বিশ্বাস হবে না, এখানে প্রায় সব ধরণের খেলাধুলায় মেয়ে ছেলে একসাথে অংশ নেয়। খেলাধূলা আমাদের দেশে একটা জেন্ডারড ফেনোমেনোন। এট বেস্ট আমাদের দেশে মহিলা দল আছে। কিন্তু একটি দল যে ছেলে ও মেয়ে উভয় নিয়েই গঠিত হতে পারে সেটি বোধহয় আমরা চিন্তাও করতে পারি না।  

প্রথম যেদিন এদের সকার লিগ খেলতে গেলাম আমি দেখলাম আমার দলে মেয়েরাও খেলছে; প্রতিপক্ষ দলেরও বেশিরভাগ মেয়ে৷ আমি ভেবেছিলাম, যাক ম্যাচ জেতাটা তাহলে সহজ হয়ে গেল। নিশ্চয় একটা ফানি গেম হবে। আমরা সেই ম্যাচ ৪-১ গোলে হেরেছিলাম যার ৩ গোলই প্রতিপক্ষের মেয়ে স্ট্রাইকারদের দেওয়া। পরে বুঝেছি আমেরিকার নারী ফুটবল দল কেন বিশ্বসেরা! 

এমনকি, বাস্কেটবল কোর্টে আমি একই দলে ছেলে ও মেয়েকে একসাথে খেলতে দেখেছি এবং কোনও ফান গেম না, প্রতিযোগিতামূলক বাস্কেটবল। এখানকার যেকোন মাঠে যেকোনও খেলায় আপনি এই বিষয়টা দেখবেন। 

আমি প্রথম যেবার গ্রে হাউন্ড বাসে করে মিনিয়াপোলিস থেকে শিকাগো গেলাম সেদিন বাসের সময় ছিলো রাত ১১ টা। আমি বাসে উঠেই এক ধাক্কা খেলাম। বাস চালাবেন এক কৃষাঙ্গ নারী, তিনিই বাস চালক। আমার মনে হচ্ছিল এটা আমার মরহুম দাদাজান দেখলে নাউজুবিল্লাহ মিন জালেক বলে বাস থেকে নেমে যেতেন। আমি এক প্রকার মুগ্ধই হয়েছিলাম সেদিন। 

এগুলোর কোনটাই হয়তোবা অবাক হওয়াত মতো বিষয় না অনেকের কাছেই। কিন্তু আমি তো আমেরিকা আমার ৩০ বছরের যাপনকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। সেখানে যেসব সংস্কার, বিশ্বাস ও দর্শনগুলো জমে আছে তা ধাক্কার মতো খেয়েছে মিনেসোটার নারী স্বাধীনতা দেখে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সবকিছুতেই নারীরাই এগিয়ে। অনেকেই শালীন অশালীন লেন্সে বিষয়টা দেখবেন। কিন্তু তাতে কি এদের কিছু যায় আসে? এরা রাতে বাস চালায়, ছেলেদের চেয়ে ভালো ফুটবল খেলে, প্রায় সব কিছুতেই এরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। 

আমার নারী স্বাধীনতার ও নারীর ক্ষমতায়নের এই বিষয়টি ভয়ংকর ভালো লেগেছে। একজন মাল্টিপল স্কেলেরোসিস আক্রান্ত ৭৪ বছরের বৃদ্ধা নারী যখন নিজে ড্রাইভ করে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন তখন শ্রদ্ধায় আমার সকল বিশ্বাস, সংস্কার নুয়ে যায়। একবারের জন্যেও আমার কাছে একটুও অশালীন মনে হয়নি। বরং, বেশ গর্বই লেগেছে। এভাবেই নারীরা এগিয়ে যাক পৃথিবীর সব দেশেই.....

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা