kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

মানিকগঞ্জের মেয়ে দোলন ব্রিটেনের সেরা কাউন্সিলর

আনিসুর বুলবুল   

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানিকগঞ্জের মেয়ে দোলন ব্রিটেনের সেরা কাউন্সিলর

রৌশন আরা দোলন। মানিকগঞ্জের সিংগাইরের ইরতা কাশিমপুর গ্রামের মেয়ে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের রামসগেট শহরের মেয়র। সম্প্রতি তিনি ব্রিটেনের সেরা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। রামসগেট শহরের এশীয় বংশোদ্ভূত প্রথম মেয়র তিনি।

দোলন স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বাবা প্রকৌশলী রজ্জব আলীর সঙ্গে পাড়ি দেন যুক্তরাজ্যে। সেখানেই তিনি স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার করে কেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ল-তে পড়েছেন। প্রবাসে জীবন যাপন করলেও নিজের জন্মভূমির টানে প্রায় প্রতিবছরই ছুটে আসেন বাংলাদেশে।

ব্রিটেনের সেরা কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে রৌশন আরা দোলন টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, যখন আমার নাম ডাকা হয়েছিল তখন আমি অবাক হয়েছিলাম। এ পুরস্কার একটি সম্মানের বিষয়। তবে আমার স্বামী এবং সমর্থকদের সহায়তা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। এই পুরস্কারটি কেবল আমার একার নয়, এটি সকল সমর্থকদেরও।

এলাকায় দানবীর হিসেবে খ্যাত দোলনের বাবা রজ্জব আলী ছিলেন বুয়েটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তিনি ১৯৬৩ সালে দোলন এর জন্মের আগেই সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান। এলাকায় তিনি নিজের জমিতে মসজিদ, ঈদগাহ, রাস্তা এবং বেশকিছু ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। সব সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এ বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে এলাকায় বেড়াতে এসে অসুস্থ হন তিনি। তারপর মার্চ মাসে নিজের প্রিয় জন্মভূমিতেই মারা যান।

দোলন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি তালেবপুর হাই স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। এরপর বাবার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে আসি। এখানে লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ি। এখনো আমাদের 'তন্দুরি' নামের একটি রেস্টুরেন্ট আছে।

আপনি রাজনীতিতে কেন গেলেন? প্রশ্ন করতেই দোলন বলেন, আমি যাইনি। পার্টিই আমাকে টেনে নিয়েছে। এখানে নিজে থেকেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতাম। মানুষের পাশে দাঁড়াতাম। লেবার পার্টি থেকে যখন অফার পাই তখন ভাবলাম, আরো বড় পরিসরে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যাবে। 

প্রায় ৫০ হাজার লোকের শহর রামসগেটের মেয়র দোলন কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। লেবার পার্টি আমার প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস রেখেছিল। এ জন্যই আমাকে মনোনয়ন দেয়। শহরের মেয়র নির্বাচিত হতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। এটা খুবই সম্মানের। 

যুক্তরাজ্যের রামসগেট শহরে শত ব্যস্ত থাকলেও দোলন জন্মভূমির কথা ভোলেননি। বাবার মতো দোলনও এলাকার দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজ গ্রামে এলাকার মানুষের জন্য গড়ে তুলেছেন রামসগেট শহরের নামে রামস-বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। প্রবাসে থেকেও প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি নানাভাবে এলাকার মানুষকে সহায়তা করছেন।

রৌশন আরা কালের কণ্ঠকে বলেন, নিজের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা প্রত্যেকটি মানুষের জন্য খুবই জরুরি। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমি সব সময় আমার দেশ এবং জন্মস্থানকে স্মরণ করি। এ জন্যই সুযোগ পেলেই দেশে ফিরে যাই। গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমারও ভালো লাগে।

শেষ কবে এসেছিলেন সিংগাইরে? প্রশ্ন করতেই কিছুটা চুপ হয়ে যান তিনি। বলেন, গত মার্চে গিয়েছিলাম। এলাকাতেই আব্বা মারা যান। তার দাফন এলাকাতেই করা হয়েছে। ১০ দিন ছিলাম দেশে।

রামস-বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার ম্যানেজার ও রৌশন আরার ভাতিজা মোতালেব হোসেন জানান, সংস্থার মাধ্যমে তিনি দেশে প্রতিবছর বন্যার সময় ত্রাণ, শীতার্তদের মাঝে কম্বল ও ফ্রি-মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত খরচে এলাকার অনেক মানুষের চোখের অপারেশন করিয়েছেন রৌশন আরা।

মোতালেব জানান, রৌশন আরা যুক্তরাজ্যে সক্রিয় রাজনীতি ও ব্যবসায় ব্যস্ত থাকলেও প্রতিবছরই দেশে আসেন। সময় কাটান নিজ গ্রামে। মানবিক কাজের কারণে এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসেন।

রৌশন আরা দোলনের স্বামী পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ছেলে রেজাউর রহমানও হোটেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেশের ঐহিত্য তুলে ধরতে একবার এলাকা থেকে একটি রিকশা নিয়ে গিয়ে লন্ডনে তো হইচই ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। সে সময় বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছিল। বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে এটি প্রচারিত হয়েছিল। দোলন-রেজাউর দম্পতির দুই ছেলে, ছোট ছেলেটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। 

২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন দোলন। সামান্য ভোটে সেসময় পরাজিত হন তিনি। এর আগে লেবার পার্টি থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। সব শেষ চলতি বছরের ১৪ মে’র নির্বাচনে বিপুল ভোটে যুক্তরাজ্যের রামসগেট-এর মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

রৌশন আরা দোলন রামসগেটের মেয়র ও ব্রিটেনের সেরা কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ায় উৎফুল্ল ও উচ্ছ্বসিত জন্মস্থান মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মানুষ।

কালের কণ্ঠকে রৌশন আরা দোলন জানান, ভবিষ্যতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন আরো উন্নত করা যায় সে জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা