kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছে

সোহেল রানা    

৫ নভেম্বর, ২০১৯ ১৫:৫৬ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছে

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিও বাংলাদেশের উন্নয়নে একপ্রকার বাধা। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে বাস করে যেটির ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে চীনের প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে এই সমীকরণটি দুর্বোধ্য হয়েছে। চীনের প্রভাব বৃদ্ধির আগে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ছিলো সরলঃ এক বাঘ নিয়ন্ত্রিত। একদিকে চীন-পাকিস্তান-মার্কিনিরা একজোট; অপরদিকে ভারত ছিল মোটামুটি নিরপেক্ষ। ১৯৭১ এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারত বাধ্য হয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর থেকে রাশিয়া বিশ্বে এক নিঃসংগ শক্তিতে পরিণত হয়৷ এরপর থেকেই মূলত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে মার্কিন জোটের সমীকরণ মানেই চীন-পাকিস্তান-মার্কিনিরা। আর ভারত এই জোটে আসা যাওয়ার মাঝে ছিলো। 

অনেকেই যেটা বুঝতে পারেন না তা হলো, সেই পুরনো সমীকরণ গত প্রায় ১০ বছরে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। আগে দুর্বল হলেও, বিশ্বে আধিপত্যে এখন চীন আমেরিকার শক্ত প্রতিপক্ষ। যেহেতু চীন পাকিস্তানের বন্ধুত্ব ভারত বিরোধিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত তাই চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক মার্কিনিরা চাইলেই ছোটাতে পারবে না। এ কারণেই চীনের সাথে আধিপত্যের যুদ্ধে মার্কিনিরা পাকিস্তানকে পাশে পাবে না। খেয়াল করবেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই মার্কিনিদের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেশ শীতল। অনেকেই ভাবেন, পাকিস্তানের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এর পিছনে দায়ী। ঝুট, এগুলো আই ওয়াশ! মার্কিনিরা সুবিধাকে সব কিছুর উপরে রাখে।মূল কারণ হলো, মার্কিনিদের প্রতিপক্ষ চীনের সাথে পাকিস্তানের দহরম মহরম। চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই মার্কিনিদের হাতে এখন একটাই চয়েস। সেটা হলো ভারত। 

লক্ষ্য করবেন, ট্রাম্প-মোদির সম্পর্ক শেষ কয়েক বছরে বেশ উষ্ণ হয়েছে। ভারতীয়দের আমেরিকায় গ্রিন কার্ডের সুবিধা বাড়াতে, ভারতের আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক ব্যবসার সুবিধা বাড়াতে  মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। প্রতিদান হিসেবে মোদির ভারতও চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সিল্ক রোড এর বিরোধিতা করে আসছেন গোড়া থেকেই। এসব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতিটা এখন এরকমঃ 
একদিকে চীন-পাকিস্তান-মায়ানমার আর  অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত। ফলে এক বোনে এখন দুই বাঘের জোট। 

বাংলাদেশের তাতে কি আসে যায়? আমাদের ব্যক্তি জীবনের অনেক কিছুই যেমন আমাদের চারপাশ দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, তেমনি একটি দেশের অনেক সিদ্ধান্তই চারপাশের ভূ-রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি মার্কেট দক্ষ ও কমপিটিটিভ হতো তবে, অস্ত্রক্রয়, ক্যাপিটাল প্রজেক্টগুলো যেমন পদ্মাসেতু ইত্যাদির কনট্রাক্ট, অন্যান্য পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় আমরা আমাদের ইচ্ছামতো করতে পারতাম। যেখানে কম দামে ভালো পণ্য বা সেবা পেতাম সেখানেই যেতে পারতাম। ফাইনান্সিয়াল কস্ট-বেনিফিট আমাদের সিদ্ধান্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত।

কিন্তু বাজার দক্ষও না আবার মুক্তও না।  মার্কেটে অনেক ধরণের ম্যানিপুলেশন আছে। আমাদের দুই বাঘের সাথে সমঝোতা করে চলতে হচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক কস্ট-বেনিফিট হিসেব করতে হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্তে  আমরা মূলত ইকোনমিক কস্ট-বেনিফিট হিসেব করি। ইকোনমিক কস্ট-বেনিফিট বেশ জটিল। এখানে পলিটিক্যাল কস্ট-বেনিফিট বেশ গুরত্বপূর্ণ অংশ।  
এসব কারণেই, বাংলাদেশ চাইলেই অনেক সিদ্ধান্ত নিজের মতো নিতে পারে না। চীন বাণিজ্যে সুবিধার প্রমিজ দেখালেও, চীনের সাথে বেশি মাখামাখি করলে মার্কিন-ভারত জোটকে নাখোশ হবে। ছোট দেশ হিসবে আমাদের সবমসয় এসব সমীকরণ মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। ভূ-রাজনীতি জটিল হওয়ায় সাথে সাথে এই দুর্ভাগ্য বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের সুবিধার চাইতে অসুবিধাই বেশি হয়েছে।

লেখক

সহকারী সচিব

গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিসটেন্ট
ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা