kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

কারাগারে কাজ করতে অনীহা চিকিৎসকদের

ওমর ফারুক   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কারাগারে কাজ করতে অনীহা চিকিৎসকদের

কারা কর্তৃপক্ষ একের পর এক চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রেষণে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না। এমনকি বর্তমানে যেসব চিকিৎসক কারাগারে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরাও সেখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ওদিকে প্রচণ্ড গরমে কারাগারগুলোতে প্রতিদিনই বন্দিরা জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় শত শত বন্দি চিকিৎসা পাচ্ছে না, বেকায়দায় আছে কারা কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৭১ হাজার বন্দির চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন মাত্র ১০ জন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে আবার একজন কারা অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৬৮টি কারাগারের জন্য চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৪১টি; কিন্তু সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৯ জন। ৬৮টি কারাগারের মধ্যে বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন চিকিৎসক, চট্টগ্রামে একজন, নারায়ণগঞ্জে একজন, সিলেটে একজন, বরিশালে একজন, গাজীপুরে একজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন, কুমিল্লায় একজন ও কারা অধিদপ্তরে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য কারাগারগুলোতে কোনো চিকিৎসকই নেই। এমনকি কাশিমপুরে অবস্থিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে ৩০টির বেশি পদ থাকলেও একজন চিকিৎসকও নেই কোনো পদেই।

কারাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মূলত যথাযথ সম্মানের অভাবে চিকিৎসকরা কারাগারে দায়িত্ব পালন করতে চান না। বাইরের হাসপাতালের চেয়ে কারাগারে দায়িত্ব পালন অনেক বেশি কষ্টকর। বন্দিদের চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে কারা কর্মকর্তাদের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও তাঁদের অনেক সময় দোষের ভাগীদার হতে হয় অহেতুক।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময় কারা হাসপাতালে চিকিৎসকদের যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও তাঁরা নানা কারণ দেখিয়ে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক চিকিৎসক জানান, বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসকদের মধ্যে কারাগারে পোস্টিং নিয়ে রয়েছে একধরনের অস্বস্তি আর অনীহা।  

জানা গেছে, মে মাসের এই গরমে কারাগারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি ছড়াচ্ছে বন্দিদের মধ্যে। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১১ হাজারের মতো বন্দি রয়েছে। নবনির্মিত এ কারাগারে কোনো গাছগাছালি না থাকায় প্রচণ্ড গরম থাকে সারাক্ষণ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কারাগারে দায়িত্ব পালনকারীরাই হাঁপিয়ে উঠছেন। বন্দিদের অবস্থা আরো নাজুক। এর মধ্যে দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে বন্দিদের অবস্থা হয় গুরুতর। এ কারাগারে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী দেখছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক। কোনো হাসপাতাল নেই। তবে চারতলা একটি ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন নার্স আর একজন প্যারামেডিক আছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে বন্দিদের বুকে ব্যথা শুরু হলে চিকিৎসক ও কারা কর্মকর্তারা টেনশনে পড়ে যান। বন্দিরা হৃদেরাগে মারা গেলে সেটিরও জবাবদিহি করতে হয়। অন্যদিকে অসুস্থ বন্দির হৃদেরাগ হয়েছে কি না, তা জানার জন্য ইসিজি মেশিন থাকলেও সেটি দুই মাসের বেশি সময় ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গরমের কারণে বন্দিদের মধ্যে জ্বর, ঠাণ্ডার সংক্রমণই বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করে যাচ্ছি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তুলতে।’

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ কারাগারে এক হাজার ৮০০-এর বেশি বন্দি রয়েছে। সেই কারাগারে একটি হাসপাতালও আছে। তাতে কাজ করছেন মাত্র একজন চিকিৎসক। নারায়ণগঞ্জ কারাগারের জেলার শেখ রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গরমের কারণে বন্দিদের রোগ বেশি হচ্ছে।’

এক কারা চিকিৎসক জানান, তাঁরা বিসিএস পাস করা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। কারাগারে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কথায় চলতে হয়। তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মীও তাঁদের কমান্ড করেন। বিষয়টি চিকিৎসকদের মানসিকভাবে আঘাত করে। এ ছাড়া কারা কর্মকর্তারা প্রায়ই চাপে ফেলে চিকিৎসকদের দিয়ে কারাগারের বাইরের হাসপাতালে বন্দি-রোগী রেফার করিয়ে থাকেন। পরে এ নিয়ে জটিলতা হলে তার দোষও চাপে চিকিৎসকদের ওপরই।

এ বিষয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারা হাসপাতালে কাজ করা কঠিন। প্রচুর চাপে থাকতে হয়।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ : এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক সমন্বয়ে আলাদা মেডিক্যাল ইউনিট গড়ার। এ বিষয়ে কাজও শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে চিকিৎসকরা কারা কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করছেন। আলাদা মেডিক্যাল ইউনিট হলে তা পরিচালিত হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। গত ৩১ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ওই মেডিক্যাল ইউনিট গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি প্রিজনস) আবদুল্লা আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, কারাগারের জন্য মেডিক্যাল ইউনিট গঠনের কার্যক্রম চলছে। তিনি আরো বলেন, ‘কারাগারে ১৪১ পদের বিপরীতে বর্তমানে ১০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। শূন্যপদগুলো পূরণ হলে বন্দিদের জন্য বেশ উপকার হয়।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা