kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

স্কুলছাত্রী সেতুর আত্মহত্যায় প্ররোচনা

সিরাজদিখানে তিন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

এক পুলিশ কর্মকর্তা ক্লোজড

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ ও আলতাফ হোসেন মিন্টু, কেরানীগঞ্জ   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সেতু মণ্ডলের (১৫) আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের বিচারের দাবিতে গতকাল শনিবার পৃথক তিনটি স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। মানববন্ধনে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী অংশ নেয়। সেতুকে উদ্ধারের পর তার মায়ের কাছ থেকে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার গোলামবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এক এসআইয়ের ২৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় তাঁকে গতকাল ক্লোজ করা হয়েছে। তবে তাঁর বিষয়ে এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

সেতু সিরাজদিখান উপজেলার গোয়ালখালী গ্রামের কুয়েতপ্রবাসী গোপাল মণ্ডলের মেয়ে। সে নিজ গ্রামের পাশের ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। গত বুধবার সে আত্মহত্যা করার পরদিন তার মা রেখা মণ্ডল তার মেয়েকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয় অভিযোগ জানিয়ে সোহেল মিয়ার (২৪) নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরো দুজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। সিরাজদিখান থানার ওসি ফরিদউদ্দিন জানান, ধর্ষণ, অপহরণ, অপহরণে সহযোগিতা ও আত্মহত্যার প্ররোচনাসহ চারটি ধারায় এই মামলা করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার সকালে সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসফিকুর নাহার সেতু মণ্ডলের মা রেখা মণ্ডলকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানাতে তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি ইউএনওর কাছে মেয়েকে ছাড়িয়ে আনতে পুলিশকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে নালিশ দেন। রেখা মণ্ডল ইউএনওকে জানান, ১১ এপ্রিল গোলামবাজার পুলিশ ক্যাম্পের এসআই মো. কবিরুল ইসলাম তাঁকে ফোন করে মেয়েকে আটক করার বিষয়টি জানান এবং ক্যাম্পে যেতে বলেন। তিনি সেখানে গেলে মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে এক লাখ টাকা দাবি করেন কবিরুল। নয়তো মেয়ের নামে মামলা দিয়ে হাজতে চালান দিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয়ভীতি দেখান। অনেক দেনদরবার ও হাতে-পায়ে ধরার পর ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মেয়েকে পুলিশ ক্যাম্প থেকে  ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যান।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই কবিরুল বলেন, ‘১১ এপ্রিল সন্ধ্যার পর আমার ক্যাম্পের এএসআই শফি ও কনস্টেবল রাবিক একটি মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সংবাদের ভিত্তিতে ক্যাম্পের কাছ থেকে সেতু মণ্ডল ও মনা নামের একটি ছেলেকে আটক করে। আটককৃত ওই ছেলে-মেয়ে ভাই-বোনের পরিচয় দেয়। মেয়েটির কাছ থেকে তার মায়ের ফোন নম্বর নিয়ে ফোন দিলে তিনি জানান, তাঁর মেয়েকে আগের দিন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। আধাঘণ্টার মধ্যে মেয়ের মা এসে হাজির হন। জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটি রাতে স্বামীর সঙ্গে ছিল বলে জানায়। এখন স্বামী কোথায় জিজ্ঞেস করলে ‘নাই’ বলে উত্তর নয়। এই ছেলেকে কিভাবে চেনো জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটি বলে, আমি উনাকে ভাই ডেকেছি। ছেলেটি জানায়, ‘সে একজন লেগুনা গাড়িচালক। কিছুক্ষণ আগে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ও বিপদে আছে, থাকার জায়গা নেই বলায় আমি ওকে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম।’

এসআই কবিরুল বলেন, এরপর আমি মেয়েকে তার মায়ের হাতে তুলে দিলে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। ছেলেটিকেও ছেড়ে দেই। এখানে মামলা-মোকদ্দমা নেই, কোনো অভিযোগ নেই, তাহলে আমি টাকা পয়সা নেই কি করে।’ তিনি নিজেকে একজন সৎ পুলিশ দাবি করেন। এ ব্যাপারে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। জানা থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না।’

গ্রেপ্তারকৃত আসামি সোহেল মিয়াকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ তাকে আদালতে পাঠায়। আজ রবিবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

সিরাজদিখান থানার ওসি ফরিদউদ্দিন কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে জানান, গোলামবাজার পুলিশ ক্যাম্পের এসআইয়ের বিরুদ্ধে যে টাকা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে তা নিয়ে তদন্ত করার কোনো সুযোগ মুন্সীগঞ্জ পুলিশের নেই। এটা ঢাকা বিভাগের পুলিশ সুপার করতে পারেন।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান জানান, গতকাল বিকেলে মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমানের কাছ থেকে বিষয়টি অবগত হয়ে এসআই কবিরুল ইসলামকে ক্লোজ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুম আহমেদ ভূঁইয়াকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

সেতুর আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিচার দাবিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা-নবাবগঞ্জ-দোহার সড়কের গোয়ালখালী মোড়ে সেতুর কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ে, পরে দুপুর ১টায় খারশুর উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কে ওই স্কুলের আয়োজনে ঘণ্টাব্যাপী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের নিমতলিতে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও সিরাজদিখান পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সংগঠনটির মুন্সীগঞ্জ জেলার সভাপতি অজয় চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক সুবির চক্রবর্তী, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান যুব ঐক্য পরিষদের সহসভাপতি বলরাম বাহাদুর, বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ মুন্সীগঞ্জ জেলার সভাপতি সময় ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক নবিন রায়, বাংলাদেশ ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি তাপস কুমার দাস, অভিজিৎ দাস ববি, শ্যামল রায়, সিরাজদিখান উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও সিরাজদিখান থানার ওসি প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার ‘সিরাজদিখানে অপহৃত স্কুলছাত্রীর আত্মহনন’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।

মন্তব্য