kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

অভিযানে মুছে যাচ্ছে দখলের চিহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অভিযানে মুছে যাচ্ছে দখলের চিহ্ন

দখল-দূষণে মরণাপন্ন বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে প্রাণ ফেরাতে চলছে নানা উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানে দীর্ঘদিনের দখলের চিহ্ন প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে।

উচ্ছেদের পর নদীর দুই পাশে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু না হলেও প্রস্তুতি চূড়ান্ত। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে এমন স্থাপনা ও দখলি অংশ কার্যত এখন আর নেই। অবশ্য তীরসংলগ্ন মসজিদসহ কিছু স্থাপনা রয়ে গেছে আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনার কারণে। এ বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে নদীর তীর ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুটা বিরতি দিয়ে ৩০ কর্মদিবস উচ্ছেদ অভিযান চলেছে। অভিযানে কয়েক হাজার স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নদীর কিছু অংশে খননের কাজও শুরু হয়েছে। কেউ কেউ অভিযানে বাধাদান এবং উচ্ছেদ করা জমি পুনর্দখলের চেষ্টা চালিয়েও সফল হয়নি। বুড়িগঙ্গার কয়েকটি স্থানে টিন ও বাঁশের ঘর তৈরির চেষ্টা দৃষ্টিগোচর হতেই সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পুনর্দখল চেষ্টার পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে হুঁশিয়ারও করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযানে মুক্ত স্থান রক্ষায় পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নদীর প্রাণ ফেরাতে উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি খননের কাজও চলছে।

সরেজমিন ঘুরে বুড়িগঙ্গাসংলগ্ন লালবাগ কেল্লার মোড়, ইসলামবাগ, শহীদনগর, মোহাম্মদপুর বসিলা এলাকা থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে আশুলিয়া এলাকা পর্যন্ত দেখা যায় নদীর তীর দখলের চিহ্ন প্রায় মুছে গেছে। কিছু স্থানে ভাঙা স্থাপনাসহ মালামাল পড়ে থাকতে দেখা গেলেও তা সরিয়ে নিতে তৎপর স্থানীয়রা।

বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীর তীরের জমি উদ্ধারে অভিযান চলছে। যেসব স্থানে স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে তা পুনর্দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। দুটি স্থানে খোলা জায়গায় রিকশা গ্যারেজ করার চেষ্টা হয়েছিল। এটিকে দখল বলা যায় না। আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি। কয়েকজনকে পুলিশে দিয়েছি। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনেক কষ্টে নদী সচলের চেষ্টা চলছে। তীর দখলের ফের চেষ্টা হলে তাদের পরিণতি অনেক খারাপ হবে। কোনো তদবির, বাধা আমলে নেওয়া হবে না।’

তুরাগে ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন স্থানে বসবাস করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, কয়েকজন মিলে দুই দফায় ছয় কাঠা জমি কিনেছিলেন। একটি প্লটের আংশিক নদীর তীরে পড়ায় উচ্ছেদ অভিযানে বারান্দাসহ ঘর ভাঙা পড়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে বৈধ অংশে দেয়াল দিয়ে আবার বসবাস করছেন।

একটু দূরেই বেড়িবাঁধের কোল ঘেঁষে গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আব্দুল জলিল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে নদীর ধারে ঘর ছিল। তা ভাঙা পড়েছে গত মাসে। এখন দূরে আরেকটি ঘর ভাড়া নিয়ে উঠেছি। এখন গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেলের উদ্ধার হওয়া জায়গা ফের বেদখল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমে বিষয়টি দেখে দুই দফা অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ। লালবাগ কেল্লার মোড় এলাকায় যে রিকশা গ্যারেজ করা হয়েছিল তা আর গতকাল বৃহস্পতিবার দেখা যায়নি।

লালবাগ কেল্লার মোড়ের বাসিন্দা শওকত আলী কালের কণ্ঠকে জানান, কয়েকজন নদীতীরের খালি জায়গায় রিকশা গ্যারেজ তৈরির চেষ্টা করেছিল। দিনের বেলায় সেখানে রিকশা-ভ্যান কিছু না থাকায় বোঝা যেত না। তবে রাতে অর্ধশত রিকশা-ভ্যান রাখা হতো। সেখানে কয়েক যুবক ভাড়া আদায় করছিল। অভিযোগ পেয়ে পুলিশসহ বিআইডাব্লিউটিএ সবাইকে হটিয়ে দিয়েছে।

নদীরক্ষা ও তীরের জমি উদ্ধারের ঘটনায় প্রশংসা করেন ইসলামবাগের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা যদি ফের প্রবহমান হয় তবে সকলের জন্য ভালো। তুরাগসহ অন্য নদীগুলো সচল হলে আমাদের জলবায়ুর পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা হবে। সরকার কঠোর হলে এবার নদী সচলের উদ্যোগ সফল হবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) বুলডোজার, ক্রেন নিয়ে সপ্তাহে তিন দিন পরিষ্কার করছে নদীতীর। কোথাও বহুতল ভবন, কোথাও কারখানা, বালুর গদি, কোথাও বা টিনশেড ঘর উচ্ছেদ করে এগিয়ে চলছে কার্যক্রম। কয়েক দফায় বাধা মাড়িয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন। বুড়িগঙ্গার একটি চ্যানেল পুরোপুরি দখল করে গড়ে ওঠা আমিন মোমিন হাউজিংয়ে উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি চলছে নদী খননের কাজ। গতকালও সেখানে ড্রেজিংয়ের দৃশ্য চোখে পড়ে। এ স্থানটি ছাড়াও সাভার কাউন্দিয়া ও কেরানীগঞ্জের জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বাহাস করলেও উচ্ছেদ থামাতে পারেননি। সব বিতর্কের পর চলমান অভিযানে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দুই পার প্রায় পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। রোজার আগেই অভিযান শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য