kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

১৪ কেজি সোনা চোরাচালান মামলা

ঘটনা সত্য কিন্তু অব্যাহতি চাওয়া হলো আসামিদের

আশরাফ-উল-আলম   

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোনা চোরাচালানের সঙ্গে আসামিরা জড়িত—এ কথা এজাহারে উল্লেখ আছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তদন্তেও প্রমাণিত হয় আসামিরা এ কাজ করেছেন। এর পরও ১৪ কেজি সোনা চোরাচালান মামলার আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রার্থনা জানিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় করা এ মামলার (নম্বর ২৮, তারিখ ১৫-০১-২০১৫) চূড়ান্ত প্রতিবেদন গত ৩১ জানুয়ারি দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড স্মাগলিং টিম, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ, কাউন্টার টেররিজমে কর্মরত ডিএমপির পরিদর্শক মো. সরওয়ার হোসেন।

২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি দুপুর সোয়া ১২টার দিকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট অবতরণ করে। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর বিমানবন্দরে কর্মরত শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেলের কর্মকর্তারা দুপুর ১টার দিকে বিমানের ভেতরে প্রবেশ করে টয়লেটের নিচ বরাবর কার্গো হোল সংলগ্ন বিমানের বডির সঙ্গে থাকা একটি প্লাস্টিক প্যানেলের ভেতর থেকে দুটি কালো কাপড়ের ব্যাগ উদ্ধার করেন। দুটি ব্যাগ থেকে ১২০টি সোনার বার অর্থাৎ প্রায় ১৪ কেজি সোনা জব্দ করা হয়।

ঘটনার পরদিন শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেলের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি-এর ১(বি)/২৫ডি ধারায় মামলা করেন। বিমানবন্দর থানার এসআই গোলাম কিবরিয়া হাসান প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন। পরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান তদন্ত করেন। তিনি তদন্ত চলাকালে অন্যত্র বদলি হওয়ায় তদন্তভার পড়ে মো. সরওয়ার হোসেনের ওপর, যিনি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে সোনা চোরাচালানের এই মামলা তদন্ত করেছেন তিন কর্মকর্তা। আসামি গ্রেপ্তার হন ছয়জন। একজন পলাতক ছিলেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সব আসামিকেই অব্যাহতি দেওয়ার প্রার্থনা জানানো হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, সোনা জব্দ করার পর পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় এটা সুস্পষ্ট হয় যে বিদেশ থেকে এয়ারক্রাফট ঢাকায় অবতরণের পর যেখানে সোনার বারগুলো পাওয়া গেছে, সেখান থেকে সবার সামনে সেগুলো নিয়ে সটকে পড়া সম্ভব নয়। বিমানটি ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাঙ্গারে নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের সহায়তায় শুল্ক দপ্তরের তল্লাশি ছাড়া ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিশেষ কৌশলে এই সোনা দেশের অভ্যন্তরে পাচার করার উদ্দেশ্য ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে এজাহারে আরো বলা হয়, সোনার বারগুলো সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের সক্রিয় সদস্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার মেকানিক মো. ইমরানুল ইসলাম, কর্মচারী ওসমান গনি ও তাঁদের অজ্ঞাতপরিচয় সহযোগীরা পাচার করার পরিকল্পনায় ছিল। এই দুজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়।

মামলার এজাহার থানায় রুজু হওয়ার পর ইমরানুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বিমানের মেকানিক মো. আবু সালেহ ও আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। কর্মচারী ওসমান গনিকে আর গ্রেপ্তার করা হয়নি। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে মো. আব্বাস আলী, নুরুন্নবী ও ইউনুস আলী নামের আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এ ছয়জনকেই অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে : তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামিদের বক্তব্য ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে সোনার বার বিমানের বডির বিভিন্ন অংশে গোপনভাবে রাখা ও পুনরায় গ্রহণ করার কাজটি বিমানের সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কাজ ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার যেসব টেকনিশিয়ান থাকেন তাঁদের পক্ষে সম্ভব। চোরাচালানিরা যাত্রীবেশে বিমানে অবস্থান করে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। পরে সুযোগমতো সোনার বার বুঝে নেয় এবং নিরাপদে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পাচার করে। তাই এই মামলায় দুজন টেকনিশিয়ানের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করা হয়। তাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বলা হয়।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিমানের মেকানিক ইমরানুল ইসলাম গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বিমানবন্দর এলাকার বেশ কিছু সোনা চোরাচালানির নাম প্রকাশ করেন। তাঁর স্বীকারোক্তি মতেই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এরপর বলা হয়, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁরা কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা প্রযুক্তিগত কোনো প্রমাণ ছাড়া শুধু ধারণার বশবর্তী হয়ে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ অনুসরণ করে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেও আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানের ভেতর থেকে উদ্ধার করা ১৪ কেজি সোনাকে পরিত্যক্ত সোনা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, এগুলোর মালিক কে বা কারা অথবা কারা এই সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটন করা যায়নি।

মন্তব্য