kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বৌদ্ধ নগরীর খোঁজে নাটেশ্বরে খনন শুরু

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ, বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। ওই অঞ্চলের অংশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামে ধারাবাহিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক তাত্পর্যপূর্ণ স্থাপত্যিক নিদর্শন। বৌদ্ধ মন্দিরের অষ্টকোনাকৃতি স্তূপ, চারটি অনন্য স্তূপ হলঘর, ইট নির্মিত রাস্তা, কক্ষ, দেয়াল, মেঝে, ইট নির্মিত নালার সন্ধান পাওয়ার পর এবার শুরু হলো বৌদ্ধ নগরীর খননকাজ।

গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টায় নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির প্রত্নস্থানে খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে দেশবরণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সফিক আহমেদ সিদ্দিক খননকাজের উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্তি সচিব) আলতাফ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহা. হারুন-অর-রশিদ, চীন থেকে আসা প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চাই হুয়ান হো, খনন প্রকল্পটির নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার, অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হাসান, অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা, আমিরুল ইসলাম, সাংবাদিক মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ জামাতা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন। এই বাংলায় রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্য। যে জাতি ইতিহাস-ঐতিহ্য জানে না তারা অর্থহীন জাতি। আমাদের এই বাংলায় অনেক ঐতিহ্য এবং প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে গর্ব করার মতো।’

বিক্রমপুরের পাশাপাশি মহাস্থানগড়সহ দেশের নানা স্থানের ঐতিহ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ঐতিহ্যসহ ক্রমেই বাংলার সমৃদ্ধি বাড়ছে। জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর এই বিক্রমপুরে জন্মলাভ করেছেন; কিন্তু তিনি কিভাবে এত পাণ্ডিত্য লাভ করলেন, কোথায় পড়াশোনা করলেন? এ প্রশ্ন সবার মাঝেই ছিল। মাটি খননের মধ্য দিয়ে এর সঠিক উত্তর বের করে দিল অগ্রসর বিক্রমপুর তথা নূহ-উল-আলম লেনিন।’

সফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বিক্রমপুরে বহু গুণী মানুষের জন্ম হয়েছে। এই জনপদ সাধারণের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ছিল। ক্রমে ক্রমে এসবই বেরিয়ে আসছে। এখানে রয়েছে বহু সম্পদ, যা খননে বেরিয়ে আসছে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘ভূগোলে বিক্রমপুরের নাম না থাকলেও ছিল ইতিহাসে। আর এখন স্বচক্ষে বিক্রমপুরের প্রাচীন কীর্তি দেখে অভিভূত।’ তিনি বিক্রমপুরের পুত্রবধূ হিসেবে গর্ববোধ করার কথা জানান।

চীন থেকে আসা প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চাই হুয়ান হো বলেন, এই খননকাজে সহযোগিতা করতে পেরে চীন গর্ববোধ করছে। নাটেশ্বরের এই পুরাকীর্তি বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যের নিদর্শন হবে বলে মনে করেন তিনি। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা জানান, প্রাচীন তাম্রলিপিতে এ এলাকাকে ‘শ্রীবিক্রমপুর সমাবাসিত-শ্রীমজ্জায় স্কন্ধাবারাৎ’ অর্থাৎ ‘বিজয় শিবির’ রাজধানী হিসেবে এবং কোনো কোনো লিপিতে ‘শ্রীবিক্রমণিপুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গাঙ্গেয় উপত্যকার পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরী-ইছামতী বিধৌত নিম্নাঞ্চল বিক্রমপুর প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চায় উপমহাদেশের একটি পীঠস্থান হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

অনেকেরই ভুল ধারণা আছে যে বিক্রমপুরের উন্নত সভ্যতায় প্রায় সব প্রত্ন নিদর্শন পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে বিক্রমপুর অঞ্চলে বিজ্ঞানসম্মত কোনো অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন না করেই এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করা হয়েছে। মজা পুকুর খনন, জমিতে হালচাষ এবং অন্যান্য কারণে মাটি কাটলেই পাওয়া যায় তাম্রশাসন, শিলালিপি, পাথর, ধাতব ও কাঠের বৌদ্ধ ও হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি ও ভাস্কর্য।

মন্তব্য