kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

শিক্ষায় দুর্নীতির নিকৃষ্টতম উদারহণ বরগুনার নুরিয়া স. প্রাথমিক বিদ্যালয়!

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিক্ষায় দুর্নীতির নিকৃষ্টতম উদারহণ বরগুনার নুরিয়া স. প্রাথমিক বিদ্যালয়!

মোটে চারটি কক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ বলে একটি কক্ষ সারা বছরই থাকে তালাবদ্ধ। আরেকটি কক্ষ দিন-রাত সব সময়ই খোলা। কারণ তাতে দরজাই নেই। নেই চেয়ার-টেবিলও। চার হাত প্রস্থ আর আট হাত দৈর্ঘ্যের অন্য একটি কক্ষে আছে জরুরি কিছু কাগজপত্র। বাকি থাকে একটি কক্ষ। পলেস্তারা খসে যাওয়া, নড়বড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই একটি কক্ষে চলে পাঠদান। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ বলতে এই একটিই। আর এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে বরগুনা সদর উপজেলার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের সাহেবের হাওলা গ্রামের ১৪ নম্বর পূর্ব গুদিঘাটা নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

অন্যদিকে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতারও রেকর্ড পরিমাণ তথ্য পাওয়া গেছে বিদ্যালয়টিকে ঘিরে। জানা গেছে, আশপাশের স্কুল-কলেজ এমনকি মাদরাসার বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের এই স্কুলের শিক্ষার্থী দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উপবৃত্তির নামে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তাঁর সহযোগীরা। আর এসবই করা হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বসে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ।

বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন চারজন। সবাই ব্যস্ত যাঁর যাঁর কাজে। মন চাইলে স্কুলে আসেন, নইলে না। স্কুল চলে একজন মাত্র শিক্ষকের হাতে। তা-ও আবার ‘বদলি’ শিক্ষক। চার শিক্ষকের একজন সারা বছর করেন রাজনীতি। গেল বছর ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনায় মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে যেন শিক্ষা খাতের দুর্নীতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ এই বিদ্যালয়!

ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেশির ভাগ সময় থাকেন অনুপস্থিত। বরগুনার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা। সারা মাসের বেশির ভাগ দিনই থাকেন তিনি বরগুনা সদরে। তাঁর পক্ষে ‘বদলি’ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন ২০ বছরের স্থানীয় এক যুবক। সুযোগ পেয়ে অন্য দুই শিক্ষকও স্কুলে আসেন নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো। সম্প্রতি গত ১৬ আগস্ট বুধবার বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই একটি কক্ষেই তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির মোট ১৬ জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা নিচ্ছেন ইব্রাহীম হোসেন সুমন নামের একজন শিক্ষক। সুমনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিক্ষার্থী কম, কক্ষও একটিই। তাই এক কক্ষেই সব শ্রেণির পরীক্ষা নিতে হয়।

‘বদলি শিক্ষক সুমনের এক পা নেই। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ছোটবেলায় পাওয়ার টিলার দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। বরগুনা সরকারি কলেজে অনার্স পড়ছেন তিনি। বাড়িতে যে ১০-১৫ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ান তাদের সবাই এই স্কুলের শিক্ষার্থী। অনেকটা দায়বোধ থেকেই এই স্কুলে বদলি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন অভাবী পরিবারের ভাগ্যবিড়ম্বিত যুবক সুমন।

স্কুলের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাহলে কোথায়? কেন তাঁরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে সুমন জানান, ‘শামীমা নাসরিন নামের এক শিক্ষিকার ছেলে অসুস্থ তাই তিনি আসেননি। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেনও অনুপস্থিত। মোশারেফ হোসেন নামের এক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে আছেন। তাই স্কুলেই আসেন না তিনি। শিরীন নামের এক শিক্ষিকাও ব্যস্ত পারিবারিক জরুরি কাজে।

এদিকে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, আশপাশের স্কুল-কলেজ এমনকি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের নাম দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উপবৃত্তির টাকা তুলে তা আত্মসাৎ করে আসছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা। বিদ্যালয়টির উপবৃত্তি নেওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, পূর্ব ঘটবাড়িয়া গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে নাঈমুর রহমান প্রান্ত ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ২ নম্বর পূর্ব ঘটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ২০১৬ সালে সে ছিল ঘটবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। অথচ ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাকে নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেখিয়ে তার নামে উপবৃত্তির টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সাহেবের হাওলা গ্রামের মো. আলাউদ্দিন মিয়ার ছেলে মো. তারেক। ২০১৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বর্তমানে তিনি বরগুনা সরকারি কলেজের বিবিএস তৃতীয় বর্ষের (রোল ১৩১০৪০৪৮৭১৬) শিক্ষার্থী। অথচ ২০১৩ সালেই তাকে নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী (অ্যাকাউন্ট নম্বর ১৪৪০/২০১৩) দেখিয়ে তার নামে তোলা হয়েছে উপবৃত্তির টাকা। একই প্রক্রিয়ায় পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসা এমনকি কলেজের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর নাম ব্যবহার করে কৌশলে ব্যাংক হিসাব খুলে বছরের পর বছর ধরে উপবৃত্তির নামে সরকারের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া একই শিক্ষার্থীর নাম একাধিক শ্রেণিতে দেখিয়েও উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্কুল মেরামতের নামে সরকারিভাবে বছর বছর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কোনো কাজ না করেই তার সবটা চলে গেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তাঁর সহযোগীদের পকেটে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আমীর হোসেন নামের স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা। পর পর দুইবারের বেশি সভাপতি থাকা যাবে না—এমন নিয়মের কারণে এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বের জেরে বর্তমানে নির্বাচিত কোনো ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই। তবে স্কুল ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মো. মনির হোসেনের নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি রয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন অভিভাবক জানান, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার বর্তমান (অ্যাডহক) কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মো. মনির হোসেনের সঙ্গে যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন। স্থানীয় এক গ্রামবাসী মো. বেলাল হোসেন (৩০) জানান, স্কুলটির চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারাই কথা বলেছে তাদের সবাইকে মিথ্যা মামলার আসামি হতে হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্কুলের কাজে তাঁকে বিভিন্ন সময় বরগুনা সদরের শিক্ষা অফিসে থাকতে হয়, তাই সুমন নামের একজন যুবককে তিনি অর্থের বিনিময়ে স্কুল পরিচালনার জন্য রেখেছেন।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা (অ্যাডহক) কমিটির সভাপতি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বাইরে থেকে অনেকেই অনেক কথা বলে। সব সত্য নয়।’ ঠিকঠাকমতো স্কুলটি চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মানুষ তো কত কথাই বলে!’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ফুলঝুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. গোলাম কিবরিয়া জানান, নুরিয়া স্কুলের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তিনি অবগত। ওই স্কুলের একজন শিক্ষক মোশারেফ হোসেন নিয়মিত স্কুল না করার কারণে বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আ. মজিদ বলেন, এসব বিষয়ে স্থানীয় এক অধিবাসীর দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৪০ সালে স্থাপিত হয় ১৪ নম্বর পূর্ব গুদিঘাটা নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৯৫ সালে সরকারিভাবে একটি পাকা ভবন নির্মাণ করা হয় স্কুলটির জন্য। এখন থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০১৩ সালে তা সরকারীকরণ করা হয়। মাত্র ২২ বছর আগে ১৯৯৫ সালে নির্মিত হয়েছে ভবনটি। স্থানীয়রা জানায়, নিম্নমানের উপকরণ আর ঠিকাদারের অতি লাভের পরিণতি হিসেবে ২০ বছরেই ভেঙেচুরে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এখন ভবনটি।

মন্তব্য