kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

দণ্ড দিয়ে 'নিজস্ব কারাগারে' পোরেন চেয়ারম্যান

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

২২ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মারামারি করায় দুপুরে সালিস বৈঠকে এক যুবককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ইউপি চেয়ারম্যান। সালিসেই সেই টাকা না দিতে পারায় চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদে তাঁর কক্ষে ওই যুবককে সাত দিন কারাবাসের দণ্ড দেন। সঙ্গে সঙ্গে দণ্ড কার্যকর করতে ওই যুবককে মারধর করে ওই কক্ষে ঢুকিয়ে দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়। পাহারায় বসানো হয় চার চৌকিদারকে। আর সেই কক্ষের তালার চাবি নিয়ে সন্ধ্যায়ই ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় চলে যান চেয়ারম্যান। খবর পেয়ে পুলিশ এলেও চেয়ারম্যানের লোকদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি। তালাবদ্ধ অবস্থায় 'চেয়ারম্যানের কারাগারে' রাত কাটে সেই যুবকের। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কান পর্যন্ত পৌঁছালে তাঁর নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকালে ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু তিনি পৌঁছার আগেই ওই কক্ষের তালা ভেঙে যুবককে মুক্ত করেন ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য। ঘটনাটি ঘটেছে ঝালকাঠি উপজেলার নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়ন পরিষদে।

আলোচিত সেই ইউপি চেয়ারম্যানের নাম আবদুস সালাম। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মুক্তি পেলেও 'দণ্ডপ্রাপ্ত' সেই যুবক জহিরুল হক মোল্লা (৩২) ইউপি চেয়ারম্যানের ভয়ে আছেন বলে জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সালিসে জরিমানা করতে পারলেও কাউকে সাজা দেওয়ার এখতিয়ার চেয়ারম্যানের নেই। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

জানা গেছে, নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামে নূরু মোল্লার সঙ্গে প্রতিবেশী সুফিয়া বেগমের দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। এর জের ধরে গত ১৯ আগস্ট নূরু মোল্লার ছেলে জহিরুলের সঙ্গে সুফিয়ার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে জহিরুল সুফিয়াকে মারধর করেন। বিষয়টি নিয়ে সুফিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালামের কাছে অভিযোগ করেন। গত বৃহস্পতিবার চেয়ারম্যান তিন চৌকিদার পাঠিয়ে জহিরুলকে পরিষদে ধরে আনেন। সেখানে সালিস বৈঠকে জহিরুলকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে টাকা না দিতে পারায় তাঁকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন চেয়ারম্যান। পরে তাঁকে পরিষদের কক্ষের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেওয়া হয়। যাতে তিনি পালিয়ে যেতে না পারেন সে জন্য পরিষদের চৌকিদার সাহার আলী, নজরুল ইসলাম, আবদুল জলিল ও ফারুক হোসেনকে পাহারায় রাখা হয়।

ওই রাতেই জহিরুলের বড় ভাই আমানুর মোল্লা নলছিটি থানায় গিয়ে ওসি এস এম মাকসুদুর রহমানকে বিষয়টি জানান। ওসি রাতেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠান। কিন্তু চেয়ারম্যানের লোকজন পুলিশকে সেই কক্ষের তালা ভাঙলে মামলা করার হুমকি দেয়। রাতভর পুলিশও সেখানে অবস্থান করে। সকালে বিষয়টি জেলা প্রশাসক রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়ার কানে যায়। তিনি নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নমিতা দেকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। সকাল ১০টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যাওয়ার খবর শুনে কক্ষের তালা ভেঙে জহিরুলকে মুক্ত করেন ইউপি সদস্য রিজিয়া বেগম।

এ প্রসঙ্গে জহিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমি বলেছিলাম কয়েক দিন পরে জরিমানার টাকা দিয়ে দেব। কিন্তু চেয়ারম্যান আমাকে মারধর করে তাঁর কক্ষে আটকে রাখেন। রাতে আমাকে খাবার খেতেও দেওয়া হয়নি। আমার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে।' এ জন্য মামলা করবেন কি না-এ প্রশ্নের জবাবে জহিরুল বলেন, 'ভয়ে আছি। কী করব, এখনো বুঝতে পারছি না।'

নলছিটি থানার ওসি এস এম মাকসুদুর রহমান বলেন, 'খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান মোবাইল ফোনে ও তাঁর লোকজন চেয়ারম্যানের কক্ষের তালা ভাঙতে পুলিশকে নিষেধ করে।'

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নমিতা দে বলেন, 'জেলা প্রশাসক আমাকে তালা ভেঙে যুবককে মুক্ত করার নির্দেশ দিলে আমি শুক্রবার সকালে ইউনিয়ন পরিষদে যাই। এর আগেই তালা ভেঙে যুবককে মুক্ত করা হয়। এ ব্যাপারে পরে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম বলেন, 'সালিসে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করি। আমি বলেছিলাম পাঁচ হাজার টাকা দাও, পরে বাকিটা দিও। কিন্তু ওরা তাও দিতে পারেনি। ইচ্ছা করেই তারা বিলম্ব করে টাকা পরিশোধ না করার ষড়যন্ত্র করছিল। তাই আমি জহিরুলকে কক্ষে আটকে রেখেছিলাম।'

মন্তব্য