kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়ি বিক্রির তৎপরতা!

সম্ভাব্য ক্রেতা জেলা আ. লীগের এক শীর্ষ নেতা

লিমন বাসার, বগুড়া   

২২ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়ি বিক্রির তৎপরতা!

বগুড়ার নবাববাড়ির মূল ভবন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিশাল এলাকাজুড়ে সোয়া তিন শ বছরের পুরনো প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর বাড়িটি নবাবদের। এর নাম বগুড়া নবাব প্যালেস, যা নবাববাড়ি নামেই পরিচিত। প্রাসাদের আশপাশে নবাবদের ব্যক্তিগত কর্মচারীদের আবাসস্থল। এত দিন এটি ছিল সাধারণ মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান। তবে এই দর্শনীয় স্থানটি আর থাকছে না। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ও তাঁর পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত বগুড়া নবাব প্যালেসের পুরোটাই বিক্রি করার তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে শোনা যাচ্ছে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার নাম। ওয়াক্ফ সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও আগেই পর্যায়ক্রমে নবাববাড়ির আশপাশের জায়গা বিক্রি করা হয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে।

নবাব পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্রে জানা যায়, সমপ্রতি প্যালেসের বাকি অংশটি বিক্রির জন্য যে তৎপরতা শুরু হয়েছে তার অংশ হিসেবে গত রমজানের শেষ দিকে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা নবাব প্যালেসে যান। সেখানে তাঁর কাছে প্যালেস বিক্রির বিষয়টি এক রকম চূড়ান্ত করে ফেলেন মরহুম মোহাম্মদ আলীর বড় ছেলে হাম্মাদ আলী। প্যালেসে থেকেই এ নিয়ে কথা হয় মোহাম্মদ আলীর ছোট ছেলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী হামদে আলীর সঙ্গেও। বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁকে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই এখনো বিষয়টি গোপন রেখেছে কৌশলগত কারণে।

এ বিষয়ে নবাব পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নবাব প্যালেসের ম্যানেজার যাহেদুর রহমান লজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্যালেস বিক্রির বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে গত রমজান মাসে লন্ডন থেকে হাম্মাদ আলী এসেছিলেন বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

এদিকে প্যালেসসহ নবাব এস্টেটের সম্পত্তি ওয়াক্ফভুক্ত বলে জানিয়েছেন বগুড়া ওয়াক্ফ এস্টেটের ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, রেকর্ড অনুযায়ী নবাববাড়ি ওয়াক্ফ সম্পত্তি। কাজেই এই সম্পত্তি কেনাবেচা আইনত সম্ভব নয়। কেউ এমন চেষ্টা করলে আইনগতভাবে বাধা দেওয়া হবে।

নবাববাড়ি কেনার চেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আলহাজ মমতাজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেউ বিক্রি করতে চাইলে তা কিনে নিতে দোষ কোথায়? আর এর আগেও আমার ব্যাপারে অনেক অপপ্রচারমূলক কথাবার্তা বলা হয়েছে, যার কোনো ভিত্তি নেই।'

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিক্রির অযোগ্য এই ওয়াক্ফ সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা হলেও তা মাত্র ১০-১৫ কোটি টাকায় বিক্রির ব্যবস্থা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।

প্রতিবাদ-বিক্ষোভ : ঐতিহ্যবাহী নবাব প্যালেস বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে মানুষের মুখে মুখে খবর রটে যাওয়ায় এই গোপন তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বিশিষ্ট নাগরিকরা। এ তৎপরতার প্রতিবাদে গত ১৩ আগস্ট মানববন্ধন করেছে বগুড়ার ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি। এর আগে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে এক নাগরিক প্রতিবাদ সভায় বিশিষ্টজনরা বলেন, বগুড়ার নবাববাড়ি এ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঐতিহ্য নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। পাবনায় সুচিত্রা সেনের বাড়ি সংরক্ষণে সরকার যেভাবে এগিয়ে এসেছে, বগুড়ায় ঐতিহাসিক নবাব প্যালেস রক্ষায়ও সেভাবে এগিয়ে আসা উচিত। তাঁরা আরো বলেন, বগুড়ার নবাব প্যালেস বিক্রির উদ্দেশ্য শুধু নবাব পরিবারের কিছু সদস্যের টাকা পাওয়ার উদ্দেশ্যের মধ্যেই সীমিত নেই, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। ওই প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন বগুড়ার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট আফতাব আহম্মেদ, অ্যাডভোকেট রাফী পান্না, সাংবাদিক মহসিন আলী রাজু, আব্দুর রহিম বগরা, সংস্কৃতিসেবী পলাশ খন্দকার প্রমুখ।

প্রাচীন নিদর্শন : পুরনো প্যালেসটি এখন এক বিশাল জাদুঘর। রয়েছে বিনোদনকেন্দ্র, জোড়া ঘোড়ার গাড়ি, কোচোয়ানদের হাতে চাবুক, অতীত দিনের নেপালি দারোয়ান, মালী, পালকি, বেহারা, কোচোয়ান, টমটম, সিংহ, বাঘ, কুমির, ময়ূর, রাজহাঁস, বিভিন্ন পাখির প্রতিমূর্তি। নবাব আমলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে মরহুম শিল্পী আমিনুল করিম দুলাল নবাববাড়িকে এভাবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এটিকে দর্শনীয় স্থানে রূপদানের জন্য অতিথি আপ্যায়ন, বিলিয়ার্ড খেলা, পড়ার ঘরে বই সাজানো, জলসা ঘরে জলসার দৃশ্য, নায়েবের খাজনা আদায়-এমন অনেক দৃশ্য জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেন ভাস্কর্যের মাধ্যমে। নবাববাড়ির ইতিহাস, নবাবের জীবনপ্রণালি এবং সেই আমলের সভ্যতা-কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য নির্মিত এ জাদুঘরের নাম দেওয়া হয়েছে মোহাম্মাদ আলী প্যালেস মিউজিয়াম অ্যান্ড পার্ক। এ পার্কে নবাববাড়ির ওই সময়ের পাইক-পেয়াদা, বরকন্দাজের রূপকথা মডেল করে সাজানো হয়েছে। প্যালেসের প্রবেশপথে আছে প্রায় ৩০০ বছর আগের নকশা করা বিশাল কাঠের দরজা।

টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারের জমিদার পরিবারের সন্তান সৈয়দ আবদুস সোবাহান চৌধুরী বগুড়ার মানিকপুর এলাকার জমিদার মীর সারোয়ার আলীর বোন তহুরুন নেছাকে বিয়ে করে বগুড়ায় বসবাস শুরু করেছিলেন। তহুরুন নেছা মারা গেলে আবদুস সোবাহান চৌধুরী জমিদারি পেয়ে বগুড়া অঞ্চলে শিক্ষা ও সেবামূলক নানা কাজ করেন। ১৮৮২ সালে তিনি ভিক্টোরিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করেন, যা পরে বগুড়া সেন্ট্রাল হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়। এ ছাড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি ও হাসপাতাল স্থাপন করেন তিনি। লাইব্রেরিটি আজও টিকে আছে। জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সৈয়দ আবদুস সোবাহান চৌধুরীকে ১৮৮৪ সালের ২০ মার্চ 'নওয়াব' উপাধিতে ভূষিত করেছিল ব্রিটিশ সরকার। শহরের করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে নওয়াবের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। নওয়াববাড়ি কালক্রমে নবাববাড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে। সান্তাহার-লালমনিরহাট রেলসড়ক নিজের জায়গায় বানিয়ে দিয়েছিলেন আবদুস সোবাহান চৌধুরী। তাঁর মেয়ে আলতাফুননেছাকে বিয়ে করেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী। তাঁদের একমাত্র সন্তান নওয়াব আলতাফ আলী। সৈয়দ আবদুস সোবাহান চৌধুরী মারা গেলে তাঁর এস্টেটের মোতোয়ালি হন আলতাফ আলী। আলতাফ আলীর সংসারে ১৯০৯ সালে জন্ম নেন সৈয়দ মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী। আলতাফ আলী চৌধুরী মারা গেলে মোহাম্মদ আলী সেই জমিদারির মোতোয়ালি নিযুক্ত হন। মোহাম্মদ আলীর দুই ছেলে সৈয়দ হাম্মাদ আলী ও সৈয়দ হামদে আলী। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন মোহাম্মদ আলী। বগুড়ায় যাওয়া-আসা ছিল তাঁর।

মন্তব্য