kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

চাষির 'গলায় বিঁধেছে কাঁটা'

লিমন বাসার, বগুড়া   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাষির 'গলায় বিঁধেছে কাঁটা'

চলছে বোরো চাষের ভরা মৌসুম। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে বগুড়ার গ্রামগঞ্জ ডিজেলশূন্য হয়ে পড়ায় সেচ পাম্প চলছে না অনেক এলাকায়। ফলে বিপাকে পড়েছে বগুড়ার বোরোচাষিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বোরো চাষের এই ভরা মৌসুমে একের পর এক হরতাল ও টানা অবরোধ এখন চাষিদের গলার কাঁটা। জরুরি তেলবাহী গাড়িতেও হামলা চালাচ্ছে হরতাল সমর্থকরা। এতে করে গ্রামগঞ্জে ডিজেল বিক্রির ছোট পয়েন্টগুলো হয়ে পড়েছে তেলশূন্য। যার প্রভাবে অনেক স্থানেই কালোবাজারে বাড়তি দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ভরা মৌসুমে তেল পরিবহনকে হরতালের আওতামুক্ত করা না হলে বোরো উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন মাঠের চাষিরা। তাদের তথ্যমতে, এরই মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক জমি পানির অভাবে ফেটে যাচ্ছে। সবুজ রঙের চারা বিবর্ণ হতে শুরু করেছে। ঝুঁকি নিয়ে কৃষক তাঁদের প্রয়োজনীয় তেলও সংগ্রহ করতে পারছেন না।

রাজশাহী বিভাগীয় জ্বালানি তেল পরিবেশক মালিক সমিতির সভাপতি এম এ মোমিন দুলাল জানান, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হরতালের মেয়াদ বাড়ছে। সাধারণত ছোট ডিলার এজেন্টরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে তেলের খুব বেশি মজুদ রাখেন না। এ কারণে টানা হরতাল পড়লে সংকট দেখা দেয়। তিনি জানান, আগে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় চার শতাধিক তেলবাহী গাড়ি চলাচল করত। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। তাও বাঘাবাড়ি থেকে বগুড়া পর্যন্ত পুলিশ পাহারা মিলছে। এরপর বিভিন্ন জেলার গাড়িগুলো যাচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের ব্যবস্থাপনায়। এর আগে বগুড়ার বাইরের জেলাগুলোতে তেলবাহী গাড়ি পিকেটারদের হামলার শিকার হয়েছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে কৃষকের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। লোডশেডিং, চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া ও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের পানির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে কৃষককে।

বগুড়ার নয়মাইল এলাকার কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, 'হামরা যুদ্ধু কর‌্যা আবাদ করি। ইরি আবাদ (বোরো) কর‌্যা লস হয়। হাটোত যে দাম তারচেয়ে খরচই বেশি। তর পরেও নিজেকের খাওয়ার চিন্তা করে আবাদ করা লাগে। একুন এই জমি লাগানের সময় হরতাল-অবরোধে হামাকের মাতাত বাড়ি দিছে। বাঁচার কুনু উপাই নাই। জানের ভয়ে তেল আনার যাওয়ার পারি না।'

গাবতলীর সুখানপুকুর গ্রামের কৃষক আফজাল জানান, '৬৮ ট্যাকা ১৫ পয়সার ডিজেল ৭৫ থেকে ৮০ ট্যাকা দাম চাচ্চে। তাও দিব্যার পারিচ্চে না। ঘনঘন হরতাল হামাকেরেক ম্যারা ফ্যালান ছাড়া আর কিছু লয়। এখন জমিত চারা মরে যাচ্ছে। পানি দিবার পারিচ্চি না।' পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কন্ট্রোলরুম সূত্র জানায়, তাদের তালিকাভুক্ত তিন কম্পানি (পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা) মিলে ডিলার ও এজেন্ট রয়েছে ৭২৬ জন, আর ফিলিং স্টেশন রয়েছে ৪১৬টি। তাদের কাছে তেলের মজুদ ঠিকই আছে। কিন্তু কেউ নিতে না পারলে তাদের করার কিছু নেই।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের উত্তরাঞ্চলীয় ১৬ জেলার (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, বোরো মৌসুম হিসেবে ডিসেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ধরা হয়। বাঘাবাড়ী ডিপোতে সোমবার পর্যন্ত ৫০ হাজার ৩৫৩ মেট্রিকটন ডিজেল মজুদ ছিল। আর দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে মজুদ ছিল ছয় হাজার ৮৮৬ মেট্রিকটন ডিজেল। এই পরিমাণ ডিজেল ঠিকমতো সরবরাহ করা গেলে কোথাও কোনো সংকট দেখা দেবে না। তিনি জানান, গত ১ ফেব্রুয়ারিও এই দুই ডিপো থেকে প্রায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিকটন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। পুলিশ পাহারায় ডিপো থেকে তেলের গাড়ি বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পরিচালক বজলুর রশিদ জানান, এবার শুধু বগুড়ায় এক লাখ ৯২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এই পরিমাণ জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য তাদের তালিকা অনুসারে শুধু ডিজেলচালিত ডিপ মেশিন ও শ্যালো মেশিনের সংখ্যা এক লাখ ৮৩ হাজার। আর লো-লিফট পাম্পের সংখ্যা এক হাজার ৭৮১টি। আর বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা জমির পরিমাণ চার লাখ ৫৯ হাজার ৬০৭ হেক্টর।

নলকূপ মালিক (ভাড়ায় পানি বিক্রি করেন) আবু হানিফ মীর কাশেম জানান, সম্পূর্ণ সেচনির্ভর বোরো আবাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক জমিতেই ২০-২৫ বার সেচ দিতে হয়। ডিজেলের দাম যখন লিটারপ্রতি ৬১ টাকা ছিল, তখন প্রতি বিঘা জমি সেচ দিতে শুধু জ্বালানি বাবদ গভীর নলকূপে কমবেশি দুই হাজার ৫০০ টাকা ও অগভীর নলকূপের ক্ষেত্রে আরো ২০০ টাকা বেশি খরচ হতো। এর সঙ্গে নলকূপ ব্যবস্থাপনা খরচ ও সেচকর্মীদের মজুরিসহ আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে আরো ১৫০-২০০ টাকা যোগ হতো। এখন প্রতি লিটারে ডিজেল তাদের গ্রামে কিনতে হচ্ছে ৭৫ টাকায়। হরতালের অজুহাতে সেই তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে। আবার গাড়ি সমস্যার কারণে তেল পাওয়াও যাচ্ছে না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা