kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

হরতাল-অবরোধে ধুঁকছে কৃষি

সবুজ ক্ষেত বিষে নীল

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সবুজ ক্ষেত বিষে নীল

টানা অবরোধের কারণে দাম কমে যাওয়ায় ক্ষেতে আলু দীর্ঘসময় রাখার ভিন্ন কৌশল নিয়েছে চাষিরা। তাই রোগবালাই দমনে জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের আলু ক্ষেতে এভাবেই ছিটানো হচ্ছে কীটনাশক। ছবি : কালের কণ্ঠ

টানা অবরোধে আলুবাজারে ধস নামায় জমিতে আলু রেখে সময়ক্ষেপণের ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন জয়পুরহাটের চাষিরা। কিন্তু ক্ষেতে মড়ক লেগে সেই আলু যেন আবার নষ্ট না হয় সে জন্য ছত্রাকনাশক প্রয়োগের অপকৌশলেও নেমেছেন তাঁরা। প্রতিকূল আবহাওয়ায় আলু ক্ষেতের রোগ-বালাই রোধে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন আলু চাষিরা। প্রতিদিন ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও শঙ্কা কাটছে না তাঁদের। এরই মধ্যে অনেক চাষি এক বিঘা আলুতে ছত্রাকনাশক ছিটিয়েছেন চারবার। কেউ কেউ আবার এর মাত্রা বাড়িয়েছেন আরো বেশি। মাঠে গেলে সহজেই চোখে পড়বে চারদিকে শুধু ছত্রাকনাশক ছিটানোর ছবি। এমনিতেই দাম নেই তার ওপর ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে ক্ষেত বাঁচাতে বিঘাপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি খরচে এবার আলু নিয়ে মহা ফ্যাসাদে পড়েছেন জয়পুরহাটের চাষিরা।

গত বছর মৌসুমের শুরুতে দাম না পেলেও পরবর্তীতে আলুর আশানুরূপ দাম পেয়ে আশান্বিত হয় কৃষককুল। ফলে এবারও লাভের আশায় বড় পরিসরে আলু চাষে মনোযোগী হন তাঁরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে, এবার জয়পুরহাটে আলু চাষ হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে ৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে আগাম জাতের আলু। আলু রোপণের পর মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া মোটামুটি ভালো থাকায় এক মাস আগেও প্রতি মণ আলু বিক্রি হয় ৬০০ টাকায়। এতে এক বিঘা আলু বিক্রি করে কৃষকের লাভ হয় প্রায় আট হাজার টাকা। কিন্তু অবরোধ শুরুর পর থেকে বাজারে আলুর চাহিদা ও দাম দুটিই কমতে থাকে। বর্তমানে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা মণ দরে। তাও আবার বাকিতে। এ অবস্থায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘা আলু বিক্রি করে কৃষকের লোকসান দাঁড়ায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর এই লোকসান পোষাতে সময় ক্ষেপণের জন্য কৃষকরা ক্ষেত থেকে আলু না তুলে ক্ষেতেই পরিচর্যার সিদ্ধান্ত নেন। কৃষকদের দাবি, এক বিঘা জমিতে তাঁদের আলু রোপণে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু দফায় দফায় শৈত্যপ্রবাহ আর হিমেল বাতাসের কারণে আলুক্ষেত নিয়ে বিপদে আছেন তাঁরা। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রোগ-বালাই দমনে তাঁরা ক্ষেতে ছিটানো শুরু করেন ছত্রাকনাশক প্রতিষেধক।

জয়পুরহাটের হিচমি গ্রামের কৃষক মোজাহার আলী জানান, তাঁর চার বিঘা জমির আলু ওঠানোর বয়স হলেও বাজারে আলুর দাম না থাকায় তিনি ক্ষেত থেকে এখনো আলু ঘরে তুলছেন না। অবরোধ না উঠলেও হিমাগারগুলোতে আলু সংগ্রহ শুরু হলেই দাম বাড়তে পারে এই আশায় তিনি ক্ষেত পরিচর্যা করছেন। কিন্তু ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসের পাশাপাশি অসময়ে বৃষ্টির কারণে ক্ষেতে রোগের আক্রমণ ঘটতে পারে এ শঙ্কায় সাত দিন পর পর ছিটাচ্ছেন ছত্রাকনাশক। এরই মধ্যে চারবার ওষুধ দিতে তাঁর খরচ পড়েছে চার হাজার টাকা। ক্ষেতলাল উপজেলার শিশি নাজিরপাড়া গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান, দুই বিঘা গ্যানোলা ও দুই বিঘা অ্যাস্টেরিক জাতের আলুর জমিতে এ পর্যন্ত চারবার ছত্রাকনাশক ছিটিয়েছেন। যার জন্য আলুর গাছ ভালো আছে। বেলগাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম জানান, চারবার ছত্রাকনাশক ছিটানোর পরও তাঁর ক্ষেতের কিছু গাছের পাতা মরে গেছে। একই কথা জানালেন সাগরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক, মুন্দাইল গ্রামের আব্দুল মান্নান, দুলাল আহম্মেদ, ভাশিলা গ্রামের আহম্মেদ আলী, তেলাল গ্রামের হাসান আলীসহ এলাকার শতাধিক কৃষক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের কয়েকজন মাঠকর্মী জানান, অবরোধে আলুর দাম না থাকায় অনেক কৃষকই জমির ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন না। তাঁরা বলেন, আলু পরিপক্ব হয়ে ক্ষেতে গাছ মরে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতেও কৃষকরা আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন। তবে অবরোধ শেষ না হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই হিমাগারে আলু সংগ্রহ শুরু হলে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে বলেও তাঁরা মত দেন।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ জেড এম সাব্বির ইবনে জাহান জানান, এবার জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আলু ক্ষেতে ছত্রাকনাশকের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্ষেত ভালো থাকলেও কৃষকরা আতঙ্কে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করছেন। কৃষি বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা