kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যৌক্তিক রাজনীতি অপরিহার্য

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   

২৩ নভেম্বর, ২০২২ ০৪:২৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যৌক্তিক রাজনীতি অপরিহার্য

বর্তমান বিশ্ব সংকট বহুমাত্রিক গতি-প্রকৃতিতে বেড়ে উঠছে। এতে অর্থনৈতিক সংকট দৃশ্যত বিশ্বব্যাপী ঘনীভূত হচ্ছে। ফলে সারা বিশ্বে ক্ষুধা, মন্দা, বেকারত্ব, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে টান পড়তে যাচ্ছে। এসবের অভিঘাতে সবচেয়ে সংকটে পড়তে যাচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং পিছিয়ে থাকা দেশগুলোও।

বিজ্ঞাপন

উন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক এই সংকটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার দৌড়ে নেমেছে। উদ্দেশ্য নিজেদের প্রভাববলয় বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করা, নিজেদের অর্থনৈতিক স্ফীতি ও অস্ত্র বিক্রির বাজার ধরে রাখা। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের কবজায় ধরে রাখা।  

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বিষয়টি এখন বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে সর্বত্র আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে। ইউরোপের বেশ কিছু উন্নত রাষ্ট্র এরই মধ্যে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছে। বিশ্ব বলতে গেলে নতুনভাবে মেরুকরণ সৃষ্টির এক অশুভ প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়ে গেছে। এই অবস্থায় সম্পদশালী বেশ কিছু রাষ্ট্র নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখার জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক নানা উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। ফলে এক মেরুর বিশ্বের ধারণা ও বাস্তবতা ভেঙে যেতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন এসব মেরুকরণ বাস্তবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে—সেটি বলা খুবই কঠিন।

আগের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো উদীয়মান শক্তিগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর যোগাযোগ, সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করার বিষয়গুলোকে কতটা সহজে নেবে সেটি আরেক অজানা বিষয়। এককথায় করোনা, করোনা-উত্তর এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অর্থনৈতিক সংকট সবার জন্য ভয়াবহ এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তার ফলে বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলোর পা ফেলা খুবই হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকট অনেক দেশেরই অর্থনৈতিক ভিতকে ভেঙে তছনছ করে দিতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর গুরুত্ব আগের চেয়ে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি তেল, গ্যাস, ভোজ্য তেল, খাদ্যপণ্য, উত্পাদনে ব্যবহূত নানা ধরনের কাঁচা পণ্য আমদানি-রপ্তানি নিয়ে এক ভয়াবহ জটিল আন্তর্জাতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সেখানে নতুন নতুন জোট ও মেরুকরণকৃত শক্তির নানা সমীকরণের হিসাব-নিকাশ চলছে। পৃথিবী এখন ভয়ানক এক আন্তর্জাতিক জটিল সম্পর্কের আলো-আঁধারি গহ্বরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে কোনটা কার জন্য কতটা আলো ছড়াবে, আবার কোনটা গভীর অন্ধকারে কখন ফেলে দেবে তা বলা মুশকিল হয়ে উঠছে। আমাদের মতো দেশগুলো এই জটিল কূটনীতির কূটকৌশলের কাছে অনেকেই ধরাশায়ী হতে যাচ্ছে। নিজেদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংকটকে গভীরতর করে তুলছে।

নিকট অতীতে পৃথিবী এতটা বিভাজিত ছিল না যতটা এখন বাধ্য হয়েই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিল এই পরিস্থিতিকে মোকাবেলা ও টিকে থাকার এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করা, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিজেদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজেদের আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার নীতি, কৌশল, পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নিকট অতীতের ধ্যান-ধারণা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার অনেক কিছুই এখন অচল হয়ে পড়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে বর্তমানে যেসব অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সমস্যা ও সংকট নানা গতি-প্রকৃতি নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে, সেগুলোকে গভীর পর্যবেক্ষণে নেওয়া এবং নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখার মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন ব্যতীত ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির পেছনে রয়েছে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের সমীকরণ। তা থেকেই আমাদের মতো দেশগুলোকে গভীর সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার নীতি-কৌশল আস্থার সঙ্গে নিতে হবে। নতুবা চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক এ সংকটে অনেক রাষ্ট্রই ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

ইউএনডিপি সম্প্রতি ৫৪টি রাষ্ট্র চরম খাদ্য ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। এ ধরনের আশঙ্কার পেছনে বিশ্বের মোড়ল শক্তিদের নানা হিসাব-নিকাশ গভীরে নিহিত থাকে। সব ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা অনেক সময়ই থাকে না। কিন্তু উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার যে প্রকাশটি ঘটানো হয় তাতেই অনেক দেশের জনমানসে এক ধরনের হতাশা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে বাধ্য। ইউএনডিপির প্রকাশিত তালিকা আরো যদি বৃদ্ধি পায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এই তালিকায় বেশির ভাগই আফ্রিকার খরা এবং দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। উপমহাদেশের পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কাও এই তালিকায় রয়েছে। কিন্তু এসব সংকটগ্রস্ত দেশকে উদার হস্তে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে ঋণদানকারী সংস্থাগুলো কতটা উদার, কতটা নানা শর্তের বেড়াজালে দেশগুলোকে আবদ্ধ করতে চাচ্ছে—সেটি মোটেও লুকানো বিষয় নয়। অথচ বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে বৃহত্ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ বজায় রাখার দ্বন্দ্ব্ব। এটি মোটামুটি তাদেরই সৃষ্ট এক অর্থনৈতিক সংকট, যার অভিঘাতে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। করোনা সংক্রমণে দুই বছর বিশ্ব নানা সংকটে অতিবাহিত করেছে। সেই সংকট মোকাবেলা করা যখন সময়ের দাবি ছিল, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। লক্ষ্য ছিল করোনার বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিজেদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। তাতে অস্ত্র ব্যবসা, ভূ-রাজনীতির প্রভাববলয় বৃদ্ধি ইত্যাদি যুক্ত হয়। সেটিকে অবলম্বন করেই শক্তিধর রাষ্ট্র এবং জোট ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়। যেটিকে এককথায় New World বলা হচ্ছে। কিন্তু এই New World -কে চেনা, জানা, বোঝা এবং এতে টিকে থাকা অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

নতুন এই বিশ্বে আমরা এখন যতই দিন অতিবাহিত করছি, ততই নতুন নতুন সংকট আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখতে পাচ্ছি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট চাঙ্গা ছিল। ফলে ২০২০-২১ সালে করোনা সংক্রমণ আমাদের মোটেও কাবু করতে পারেনি। আমাদের কৃষি অর্থনীতি ১৬ কোটি মানুষের মুখে আহার জুগিয়েছে, আমাদের প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ এবং গার্মেন্ট মালিক ও শ্রমিকদের উত্পাদিত পণ্য রপ্তানি আয় আমাদের অর্থনীতির গতিকে অনেকটাই সচল রেখেছে। আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলো মোটেও কাটছাঁট করতে হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের ১৬ শতাংশের বেশি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় খাতে। আমাদের রিজার্ভও ছিল যথেষ্ট সন্তোষজনক। কিন্তু জ্বালানি তেল, গ্যাস, খাদ্যদ্রব্য এবং কাঁচামালগুলোর আমদানি ব্যয় রাতারাতি বেড়ে যেতে থাকে। রিজার্ভের ওপর চাপও বৃদ্ধি পায়। ডলারের মূল্যমান বেড়ে যেতে থাকে। ফলে আমাদের অর্থনীতি যে গতিতে মার্চ-এপ্রিল মাসেও গতি পেয়েছিল, সেটি আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ কয়েকটি পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যে এসব প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর চাপ পড়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। সেখানেও কারসাজি, মজুদদারি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীর ভূমিকা অনেকটাই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিষয়গুলো আমরা সবাই জানি। এ অবস্থায় Crisis Management তথা সংকট ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সেটি গত জুলাই মাসের পর থেকে সরকার নিতেও শুরু করেছে। এর কোনো বিকল্প নেই।

২০০৮-০৯ সালেও বিশ্বে ভয়ানক অর্থনৈতিক সংকট ছিল, আমাদেরও ছিল। সেই সংকট অতিক্রম করেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে বিদ্যুত্, খাদ্য, শিল্পায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য বিমোচন তথা সামাজিক নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টির মতো বেশ বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা হাতে নিয়েছিল এবং এর সুফলও আমরা কমবেশি পেতে শুরু করেছি। বিশেষত করোনা সংক্রমণকালে Crisis Management-এ আমরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছি। এই মুহূর্তেও উপমহাদেশে আমাদের অবস্থান অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভালো বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আমাদের খাদ্যশস্য উত্পাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। এখন আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক রাখা, রিজার্ভ ঠিক রাখা, জ্বালানি সংকট সমাধান করা, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করার উদ্যোগ সংকট মোকাবেলার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে। এক যুগ ধরে দেশ যেভাবে নানা সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার পরও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হয়েছে, সেটি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের যৌথ ভূমিকারই ফসল। স্বীকার করতেই হবে, শেখ হাসিনা Crisis Management-এ তাঁর দক্ষতা এ পর্যন্ত যথেষ্ট দেখাতে পেরেছেন। বর্তমান বিশ্ব জটিল পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় তিনি এখনো পর্যন্ত বিকল্পহীন অবস্থানে রয়েছেন।

কিন্তু আমাদের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে রাজনীতি তথা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা। বড়-ছোট সব দলই জাতীয় জীবনের ছোট-বড় নানা সংকটে যেভাবে জনগণের পাশে প্রত্যাশা মানুষ করে থাকে সেটির যথেষ্ট অনুপস্থিতি তাদের মধ্যে রয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এরই মধ্যে দলগুলোকে নির্বাচন নিয়ে মাঠে ‘খেলা হবে’, ‘পতন হবে’, ‘তাড়িয়ে দেওয়া হবে’ ইত্যাদি ব্যবহারে ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে, তা গতানুগতিক রাজনীতির অপসংস্কৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এসব নিয়ে ব্যস্ত, শক্তিও ক্ষয় করছে, অর্থেরও অপচয় ঘটাচ্ছে। কিন্তু সময়টি এখন সভ্যতার সবচেয়ে সংকটময় কাল বললেও কম বলা হবে। এখন প্রয়োজন মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের রাজনীতি। তবে নেতৃত্বকে অবশ্যই হতে হবে ভীষণভাবে প্রজ্ঞাবান। তাহলেই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় দেশ হিসেবে আমরা টিকে থাকাই শুধু নয়, উন্নত হতেও সক্ষম হব।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা